05/05/2022
একটি ব্যতিক্রমী মুসলিম লাইফটাইম এচিভমেন্ট এওয়ার্ড
——হাবীব নূহ
আজীবন সম্মাননা।লাইফটাইম এচিভমেন্ট এওয়ার্ড।পৃথিবীর সচেতন মানুষজন মাত্রই জানেন এ সম্মাননার কথা।গুণী ও যোগ্যরা এ সম্মাননা পেয়ে থাকেন তাদের মহৎ কর্মের স্বীকৃতি ও পুরস্কার স্বরূপ।
পৃথিবীর দেশে দেশে ছোট-বড় অনেক অর্গানাইজেইশন,কোম্পানি এবং প্রতিষ্টান রয়েছে যারা প্রতিভাধরদেরকে ঐসব সম্মাননা প্রদান করে গর্ববোধ করে থাকে।
এ নিবন্ধে একটি ব্যতিক্রম আজীবন সম্মাননার কথা প্রচার করছি।
ব্যতিক্রম এ আজীবন সম্মাননার জনক বিশিষ্ট নবী দাউদ আলাইহিস সালাম।প্রায় তিন হাজার বছর আগে তিনি তার চল্লিশ বছরের রাজত্ব কালের একদম শুরুর দিকে এ পদ্ধতি চালু করেছিলেন তাঁর নিজের জন্য।তখন তা সম্মাননা বা আজীবন সম্মাননার স্বীকৃতি পায়নি।
তার প্রায় ষোলশ বছর পর,শেষনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এক ঐশী নির্দেশনায়,মাদিনা শহরে সেটির স্বীকৃতি প্রদান করেন।এবং এর সাথে তিনি সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যায়ক্রমে আরো বিস্তর করে এর রূপরেখা ঘোষণা করে এটি সবার জন্য উম্মুক্ত করে দেন।
সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে চালু হওয়া এ আজীবন সম্মাননা এখন সর্বজনীন।মাত্র দুটো শর্ত পূরণ হলে যে কেউ এই সম্মাননা লাভ করতে পারবেন।
প্রথম শর্ত হল ঈমান থাকতে হবে আর দ্বিতীয় শর্ত হল সিয়াম সাধনায় পারঙ্গম সে মু’মিন-মু’মিনাতকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মে কিছু সিয়াম বা রোযা পালন করতে হবে।
এ শর্তগুলোর সমাধা হলেই তাঁরা আজীবন সম্মাননা বা সাঈমুদ দাহার খ্যাত দুর্লভ সম্মাননার অধিকারী হয়ে ইহ ও পরকালীন প্রভূত পুরস্কার লাভে ধন্য হবেন।
পৃথিবীতে এই একটি মাত্র আজীবন সম্মাননা আছে যা চিরন্তন।শাশ্বত।এবং যার কল্যাণ মানুষের মৃত্যুর সাথে শেষ হয়ে যায় না বরং এর জন্য ওপারে হয়ত বিশেষ আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান-সমূহ আয়োজিত হবে।তখন এ সম্মাননা প্রাপ্তরা তাঁদের সাফল্যের স্বীকৃতি পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হবেন।
দাহার আরবি শব্দ (الدّهْرُ) যার অর্থে আছে সময় ও কাল।কম অথবা বেশি সময়,দীর্ঘ সময়, জীবন এবং সারা জীবন ইত্যাদি সব অর্থ।তবে মোটামুটি ভাবে জীবন অর্থে শব্দটি বেশি ব্যবহার হয়।এ শব্দ বিভিন্ন অর্থে কুরআনে দুবার আর হাদীসে বেশ ক’বার উল্লেখ হয়েছে।
সাওম পালন একটি অন্যতম ও অনন্য এক ইবাদত।আখিরাতের পথযাত্রী এবং শাশ্বত কল্যাণ প্রত্যাশীদের কাছে লোভনীয় এই ইবাদতের আকর্ষণ সব সময় বেশি।
কিন্তু তারপরও ইসলাম,একজন মানুষকে,সমগ্র জীবনের প্রতিদিন সাওম পালন বা রোযা রাখতে,সংগত কারণেই নিরুৎসাহিত করে থাকে।বরং তার বদলে এমন তিনটি বিকল্প ধারা সৃষ্টি করে দিয়েছে যে,আদতে একজন মুসলিম গোটা জীবন সিয়াম পালন না করেও কিন্তু আস্ত জীবন সিয়াম পালনকারীর মর্যাদা পেতে পারবেন যদি ঐ বিকল্প ধারা তিনি অনুসরণ করেন।
বৎসরে ৩৬৫ দিন এবং চন্দ্র হিসেবে প্রায় ৩৫৫ দিবস।বছরের এসব দিনগুলোতে অর্থাৎ সারা বছর ক্রমাগত বা লাগাতার অর্থাৎ অবিরাম যদি সিয়াম পালন করা হয়,এ রোযা রাখাকে আরবিতে সারদুস সাওম (سَرْدُ الصَّومِ)বলা যেতে পারে।
তেমনি,পুরো জীবন সর্বদা সিয়াম পালনকে আরবিতে সাওমুল আবাদও (صوم الأبد) বলা হয়ে থাকে।
এ ভাবে গোটা জীবন অবিরাম রোযা রাখাকে আমাদের শারিআহ বা ইসলামে উৎসাহিত বা পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়নি।বর্ণিত আছে, নূহ আলাইহিস সালাম সাওমুল আবাদ (صوم الأبد) পালন করতেন।
আমাদের ইসলামে,বছরের মধ্যে পাঁচদিন সিয়াম পালনকে নিষেধ বা হারাম করা হয়েছে।আর তা হল: দুটো ঈদ এবং ঈদুল আদ্বহার পর তাশরীকের তিনদিন।ঐ পাঁচদিন সহ পুরো বছর সিয়াম পালন মোটেই গ্রহনীয় নয়।আবার ঐ পাঁচদিনকে বাদ দিয়েও পুরো বছর সিয়াম ধারণ সাধারণের জন্য বিভিন্ন কারণে পছন্দনীয় নয়।এর অনেকগুলো কারণের অন্যতম হল,সিয়াম পালন তখন স্বভাবজাত হয়ে যাবে এবং তাতে করে লোকটির কাছে সিয়াম বা রোযা,মাহাত্ম্য ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে।
তাই পূণ্যময় সাওমুদ দাহার বা আজীবন রোযা পালনের বিকল্প পথ হিসেবে তিনটি পন্থা বা কৌশল অবলম্বন ছাড়া উপায় নেই।
প্রথম পন্থাটি নবী দাউদ আলাইহিস সালামের সিস্টেম ছিল।তিনি একদিন সাওম পালন করতেন অতপর পরের দিন খানাপিনা করতেন।এভাবে শাতরুদ দাহার বা নিসফুদ দাহার অর্থাৎ অর্ধেক বৎসর অথবা অর্ধেক জীবন তিনি সিয়াম সাধনায় কাঠিয়েছেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সিয়ামের নামকরণ করছেন সাওমু দাউদ আলাইহিস সালাম।
তাঁর বাণীতে তিনি বলছেন, “লা সাওমা ফাওক্বা সাওমি দাউদা আলাইহিস সালাম…”(দাউদের সাওমের উপর আর কোন সাওম হয়না)।
[-বুখারীঃ ১৯৮০]
অন্য বিবরণে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রোযাকে বলেছেন, “আফদ্বালুস সিয়াম”(সর্বোত্তম সিয়াম)[-বুখারীঃ ৫০৫২]
এবং অপর বাণীতে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আ’দালুস সিয়াম”(أَعْدَلُ الصِّيَامِ) অর্থাৎ উত্তম,ভারসাম্যময়,এবং মধ্যপন্থার রোযা।একই হাদীসে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনও বলেছেন যে :
“লা আফদ্বালা মিন যালিক”
[-বুখারীঃ ৩৪১৮] অর্থাৎ এর চেয়ে উত্তম সাওম আর নেই।
অন্যত্র তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আহাব্বুস সিয়ামি ইলাল্লাহি সিয়ামু দাউদ”(দাউদের সিয়াম,সব চেয়ে পছন্দনীয় সিয়াম)।[-বুখারীঃ ১১৩১]
বিবেচ্য যে, রামাদ্বানের সিয়ামের পর অন্য এগারো মাসে,ঐ নিষেধ পাঁচদিন বাদ দিয়ে,একদিন সাওম ধরে অপর দিন সাওম ছেড়ে যখন এ সিয়াম পালন করা হবে তখন এমনিতেই অর্ধেক জীবনের চেয়ে আরো বেশি সিয়াম পালন করা হয়ে যাবে।আর আধিক্য অনেক সময় পূর্ণতার বৈশিষ্ট্য লাভ করে, তার মানে এ কারণেও সাওমু দাউদ পালনকারী মুসলিম,সমগ্র জীবন ব্যাপী সাওম পালনকারীর নামান্তর হয়ে যান।
অর্ধ বছর অথবা অর্ধ জীবন সিয়াম পালন নিশ্চয় সহজ ও মামুলি নয়,অনেক কষ্টসাধ্য এবং দুঃসাধ্য ব্যাপার।
সৌভাগ্য মুসলিমীনদের যে,এর চেয়ে সহজতর আরো দুটো পন্থা মুসলিমরা লাভ করেছেন যা কার্যত জীবনভর সিয়াম না রেখেও নাবাবী ফরমান অনুযায়ী তারা আজীবন সিয়াম পালনকারীর মর্যাদা লাভ করবেন।
এই গ্রহণসাধ্য আজীবন সিয়ামের দুটো কৌশলের ভিত হচ্ছে, আল-কুরআনের ৬ নাম্বার সূরার ১৬০ আয়াত,যেখানে রব্বানী ঘোষণা হচ্ছে, ‘একটি সৎকর্মের বিনিময়ে দশগুণ পুণ্য পাওয়া যাবে।’
সে সূত্রে,একটি সাওমে দশটি সিয়ামের এবং তিনটি সিয়ামে ত্রিশটি তথা একমাস সিয়ামের সাওয়াব অর্জন করে একজন মুসলিম আজীবন সিয়াম পালনকারীর সম্মাননা লাভ করবেন যদি তিনি এ ধারায় জীবনভর প্রতি মাসে তিনটি করে সিয়াম পালনে অভ্যস্ত হন।এটি ছিল,আজীব সিয়ামের দ্বিতীয় পন্থা।
সাউমুদ দাহারের তৃতীয় এবং সবচেয়ে সহজ পন্থাটি হচ্ছে, বছরে মাত্র ৩৬ টি সিয়াম পালন করা,তাও আবার রামাদ্বানের প্রায় ত্রিশটি সিয়াম সহ।অর্থাৎ রামাদ্বান মাস ছাড়া অতিরিক্ত মাত্র ছয়টি রোযা রাখতে হবে, চান্দ্র মাসের দশম মাসটিতে।
‘একে দশ পাওয়া যাবে’ এ সূত্রে রামাদ্বানের একমাসে দশ মাসের সমান সাওয়াব হবে।তাহলে একটি বছর পূর্ণ হতে অবশিষ্ট থাকলো দুইমাস, যার জন্য প্রায় ৬০টি সিয়ামের প্রয়োজন।
রাহমাতুললিল আ’লামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিলেন যে,রামাদ্বান শেষে, প্রতি শাওয়াল মাসে ৬টি সিয়াম পালন করলে সাঈমুদ দাহারের অন্তর্গত হয়ে যে কোন মুসলিম আজীবন সিয়াম পালনকারীর সম্মাননা লাভ করতে পারবেন।
সালাত ও সালাম জানাই- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে—এ যুগান্তকারী ঘোষণা প্রদানের জন্য এবং সাধুবাদ জানাই ঐসব মুসলিমদেরে যারা এ ব্যতিক্রম লাইফটাইম এচিভমেন্ট এওয়ার্ড লাভে ধন্য হবেন।
মোবারকবাদ।মারহাবা।