10/04/2026
শিল্পী তরুণ ঘোষকে নিয়ে লিখেছেন বেলায়াত হোসেন মামুন
বড় বৃক্ষের পতনে মাটি কেঁপে ওঠে৷ মাটির কম্পনে আশপাশ সজাগ হয়, সচকিত হয় বড় কিছু বিশাল কিছু হারানোর বেদনায়৷ শিল্পী তরুণ ঘোষের প্রয়াণে আজ তেমন জাগ্রত সচেতনতা অনুভব করছি চারপাশের ধ্বনির অনুরণনে৷
তরুণ ঘোষ আমাদের মাঝে ছিলেন চুপচাপ৷ মিতবাক, স্মিত হাসির প্রিয়জন হয়ে৷ তিনি কীর্তিমান ছিলেন৷ কিন্তু তাঁর কীর্তির উত্তাপ শোরগোল তোলেনি কখনও৷ তিনি উঠতে দেন নি৷
কাজ করে গেছেন, শুধু কাজ করে গেছেন৷ অবিরাম৷ আর মিশেছেন সব বয়সের সবার সাথে, বন্ধু হয়ে৷ তাঁর এই মেশামেশি, এই বন্ধুত্ব কমপক্ষে পাঁচ দশক ধরে বয়ে গেছে বাংলাদেশের কয়েক প্রজন্ম ধরে৷ আর তিনি হয়ে উঠেছেন সকলের, সবার প্রিয় তরুণ দা-য়৷
বড় অদ্ভুত এই সহজ মানুষের সামর্থ্য৷ কোটিতে হয়ত এমন মানুষ হয় দুই—একজন৷ কিন্তু এই দুই—একজন মানুষের এই পরিচয় থাকে গুপ্ত—এমনভাবে যেন তা চর্যার স্বান্ধ্যসঙ্গীত৷ সহজের আবরণে যেন এক ভাব-শিলা৷
তরুণদার কীর্তি এবং কাজের বিরাট পরিসর আমাদের মাঝে ছিল৷ আমাদের জ্ঞাত ছিল৷ কিন্তু তাঁর কীর্তির সমতুল্য উদযাপন আমাদের রাষ্ট্র তাঁকে দেয় নি৷ জানি রাষ্ট্রকে অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা খুব ক্লিশে৷ কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের পরিচালকদের প্রকৃত প্রতিভা চেনার ক্ষমতা কতটুকু?
রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা তরুণ ঘোষের আর কী এমন কীর্তির প্রয়োজন ছিল জীবনে? এক মুক্তিযুদ্ধই তো যথেষ্ট একজন মানুষের জীবনের সার্থকতার জন্য, কিন্তু তরুণ ঘোষ রণাঙ্গনের যুদ্ধের সমাপ্তি টানেন নি৷ তিনি নিরবে সমগ্র জীবনজুড়ে শিল্পের সাধনায় বুঁনে গেছেন মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, বাঙালিয়ানার স্বপ্ন, বিশ্ব মানুষের মুক্তির স্বপ্ন৷ আজীবন শিল্পসৃষ্টি করে গেছেন বহুমাধ্যমে৷
আজ যখন তিনি প্রয়াত হলেন, তখন আমরা খুব অবাক হয়েছি এই ভেবে যে—এমন সহজ মানুষটা এভাবে হঠাৎ কারো কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে বললেন—যাই!
হয়ত, এমন মানুষেরা এভাবেই চলে যান৷ তাই মূল্যায়ন করুন মূল্যবান মানুষদের, যখন তাঁরা থাকে আশেপাশে৷ অপেক্ষা করবেন না তাদের আশি বছরের, অথবা যথেষ্ট বুড়ো না হওয়া পর্যন্ত সম্মান জানানো কী ঠিক হবে—এই ভাবনায়৷
তরুণ ঘোষ অসাধারণ কীর্তির জীবন কাটিয়ে গেলেন৷ এমন সজাগ সৃষ্টিমুখর জীবন কোটিতে দুই একজনের হয়৷ তাই তরুণদার প্রয়াণে আমার বেদনা কম৷
আমি বরং মুক্তিযোদ্ধা এবং আমাদের সহযোদ্ধা তরুণ ঘোষকে আমার অন্তিম অভিবাদন জানাই৷
স্যালুট তরুণ-দা, জয় বাংলা 🇧🇩
১০ এপ্রিল ২০২৬