05/10/2026
মিলাদে পীর অলিদের উপর সালাম কেন?
কথাটা খুবই হার্ট টাচ কথা। ইমোশনে লাগার মত কথা। মিলাদে দরুদ পাঠ করা হয় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। অতএব প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের যেহেতু কোন দ্বিতীয় নাই সেহেতু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দেয়ার পর অন্য কাউকে দরুদ সালামে যুক্ত করার কথা বললেই ইমোশন জেগে ওঠে, রেগে উঠে। বিশেষকরে, দ্বীনের গভীর জ্ঞান রাখে না, এমন তরুণদের এবং মোটা দাগে জেনারেল শিক্ষিতদের ইমোশনের পারদ অনেক বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। অতএব কোন দায়িত্বশীল জায়গা থেকে যখন বলা হয়, 'প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিলাদের মধ্যে পীরের প্রতি সালাম কেন'— তখন এই বক্তব্যের প্রতি সমর্থনটা ঠিক পাহাড়ের উপরের পানি নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ার মতোই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
এই বক্তব্যের জনক কে, তা আমার জানা আছে। ওটা আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু না। তবে কিছু অপরিণত তরুণ এই কথাকে উদার মানসিকতার পরিচ্ছন্ন রূপ বলে ইতোমধ্যেই বিবেচনা করতে শুরু করেছে। চরম ব্যস্ততার মাঝেও তাই দুই কলম লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।
প্রথমে বলি, এই কথাটি দরুদ শরীফের মৌলিকত্বের বিপরীত। বলা চলে উপরেরটা ভালো, ভিতরটা কালো। খারেজীদের মুখের উচ্চারণ, ‘ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ’ শুনে মাওলা আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু যেমনটি বলেছিলেন— ‘কথা সুন্দর, উদ্দেশ্য খারাপ’— অনেকটা তেমনই। বাহ্যিক ইমোশনে খুবই ভালো শোনায়। অথচ এর প্রয়োগে দরুদ শরীফের মৌলিকত্বের জায়গায় আঘাত লাগে।
সংক্ষেপে একটু বুঝিয়ে বলি, দরুদ শরীফ কাকে বলে? কোরআনের ভাষায় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামের উপর দরুদ ও সালামকে একসাথে আমরা 'দরুদ' বলি।
এখন প্রশ্ন হল, দরুদ শরীফের মধ্যে কি আসলে শুধু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামকে উচ্চারণ করা হয়?
জবাব হলো, না।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি সাল্লামের শেখানো দরুদেই ‘আল ও আসহাব’ অন্তর্ভুক্ত আছেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামের বংশ ও সাহাবায়ে কেরাম আছেন এবং 'আলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'কে দরুদের অন্তর্ভুক্ত না করলে আল্লামা কাজী আয়াজ ও মুহিবুদ্দীন তাবারী (রহ.)সহ অনেক বরেণ্য আলেমগণের দৃষ্টিতে দরুদ কবুল হয় না।
বুঝা যাচ্ছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরুদে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্যদেরও অপরিহার্য প্রাসঙ্গিকতা আছে। এই হিসেবে 'নবীর মিলাদে পীর অলিদের প্রতি সালাম কেন' এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য ও বাস্তবতা কিছুটা হলেও বোঝা যায়।
আবার 'আল' এর ব্যাখ্যা নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা আছে। 'আল' এর যতগুলো তাফসির আছে, এই তাফসিরগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটা তাফসির— যা কম শক্তিশালী নয়— তা হলো, 'মুত্তাকী ঈমানদার' 'আল' এর অন্তর্ভুক্ত।
সে হিসেবে তাহলে কি দাঁড়ালো? দরুদের মধ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উচ্চারণের পর ওলী-আউলিয়া, গাউস, কুতুব, আবদাল, আওতাদ এমনকি মুত্তাকী ঈমানদারদেরও প্রাসঙ্গিকতা আছে।
মাদ্রাসার দারসি কিতাব উসলে শাশীর মধ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের পর আলাদা করে ইমাম আযম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহ এবং তাঁর অনুসারীদের উপর সালাম দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নবীর মিলাদে পীর অলিদের প্রতি সালাম কেন, এই কথার উদ্দেশ্য ও বাস্তবতা আরেকটু ভালো খোলাসা হবে আশা করি।
নামাজের তাশাহহুদে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সালামের পর আমরা কাদের সালাম দেই? সকল সালেহিন বান্দাদেরকে। বোখারী ও মুসলিমের হাদিসে আছে, নামাজের এই সালাম দেয়া হলে এটা আসমান জমিনের প্রত্যেক 'সালেহ' বান্দার কাছে চলে যায়। ইবনে আরাবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন, আসমান জমিনের সকল সালেহীন বান্দারা সেই সালামের জবাব দেন— হোক মানুষ কিংবা ফেরেশতা। যেসকল ফেরেশতারা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকার কারণে জবাব দিতে পারেন না তাদের পক্ষ থেকে নামাজির সালামের জবাব স্বয়ং আল্লাহ দিয়ে দেন। প্রমাণিত হলো, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে প্রত্যেক সালেহ বান্দাদেরকে সালাম দেওয়া অকাট্যভাবে প্রমাণিত।
এবার এই তথ্যগুলোর সাথে ‘ মিলাদের মধ্যে পীর অলীদের প্রতি সালাম কেন’, কথাটা আরো একবার মিলিয়ে নিন। তাহলে এই কথার উদ্দেশ্য ও বাস্তবতা পরিপূর্ণভাবে খোলাসা হয়ে যাবে। সে কারণেই আলা হযরত রহমাতুল্লাহি আলাইহি মোস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালামের বই বিখ্যাত ‘মনজুমায়ে সালামিয়া’ প্রণয়ন করেছেন। যাতে প্রথমে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লামের উপর সালাম দেওয়া হয়েছে। এরপর সাহাবায়ে কেরাম ও আহলে বাইতের প্রতি। কখনো নাম মেনশন করে, কখনো এজমালী ভাবে। এরপর গাউসে পাক আব্দুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রতি এবং অন্যান্য অনেক অলি আউলিয়াদের প্রতি সালাম দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হল মিলাদের মধ্যে প্রিয় নবী ﷺ কে সালাম দেয়ার পর অন্যদের মেলানো বা উচ্চারণ করা যাবে কি না। উপরের আলোচনা থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, মিলাদের মধ্যে প্রিয় নবী রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামের পর সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বাইত ও অলি আউলিয়াদেরকেও সালাম দেয়া যাবে। কোন নির্ভরযোগ্য কিতাবে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলে আমাকে জানালে খুশি হবো। আমি এখনো পাইনি। বরং 'ওয়াসতা আলে নবী কা, সদকায়ে খায়রুন নিসা কা' এরকম যে কসিদাগুলো মিলাদের মধ্যে পড়া হয়, তার বহু কসিদা এমন আছে যেগুলোতে গাউসে পাকের নামসহ অনেকের নাম বিভিন্ন জায়গায় উচ্চারিত হয়ে আসছে এবং এগুলো মিলাদের অংশ। আজ পর্যন্ত কেউ এগুলো নিয়ে আপত্তি করেনি। আপত্তিটা শুধু এখানে!
বলা হয়ে থাকে, 'ওখানে' মিলাদের কেয়ামে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের সাথে পীর অলিদের সালাম দেয়। তাই এটা চরম বেয়াদবি'।
এ কথা মূলত হিংসার দহনে জন্ম নেয়া কথা। কেননা দুরুদ শরীফ বলি আর সালাম বলি উভয়টার ক্ষেত্রেই শরীয়তের বিধিবদ্ধ নিয়ম হল প্রথমে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরুদ ও সালাম দেয়া। তারপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের 'তাবআন' (تبعا) তথা অনুসরণ করে অন্যান্যদের প্রতি সালাম দেয়া। অন্ধ কিংবা মূর্খ অথবা হিংসুক না হলে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে এর সংক্রান্ত কথাগুলো ভুরিভুরি রেফারেন্স দেখা ও পাওয়ার কথা।
ওলামায়ে কেরাম যে কাজটাকে শরীয়তের নিয়ম বলেছেন হিংসুকরা এটাকেই বলছে বেয়াদবি। এ সকল জ্ঞান পাপীদের জন্য হেদায়েতের দোয়া করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
দেখুন নিম্নে কয়েকটা রেফারেন্স দেয়া হলো:
وقال ابن كثير رحمه الله بعد ذكر الخلاف ملخصا هذا الخلاف : " وأما الصلاة على غير الأنبياء، فإن كانت على سبيل التبعية كما تقدم في الحديث: ( اللهم، صل على محمد وآله وأزواجه وذريته ) ، فهذا جائز بالإجماع ، وإنما وقع النزاع فيما إذا أفرد غير الأنبياء بالصلاة عليهم .
وقال النووي واتفقوا على جواز جعل غير الأنبياء تبعاً لهم في الصلاة، فيُقال: اللَّهمّ صل على محمد وعلى آل محمد، وأصحابه، وأزواجه وذرِّيته، وأتباعه، للأحاديث الصحيحة في ذلك، وقد أُمرنا به في التشهد، ولم يزل السلفُ عليه خارج الصلاة أيضاً.
وأما السلام، فقال الشيخ أبو محمد الجوينيُّ من أصحابنا: هو في معنى الصلاة، فلا يُستعمل في الغائب، فلا يفرد به غير الأنبياء، فلا يُقال: عليّ عليه السلام، وسواء في هذا الأحياء والأموات.
এখন বলবেন, 'এখানে তো মিলাদের সালামের কথা বলা হয় নাই। মিলাদের কিয়ামের মধ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের সাথে পীর অলিদের সালাম দেয়া বেয়াদবি'।
তাহলে বলতে চাওয়া হচ্ছে, অন্য জায়গায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লামের সাথে পীর অলীদেরকে সালাম দিলে বেয়াদবি হবে না— মিলাদের কেয়ামে দিলে বেয়াদবি হবে।
এটা মূলত মসলাকে আলা হযরত বিরোধীদের প্রসব করা হাস্যকর যুক্তি! মসলাক পীড়ার দহন যন্ত্রণায় প্রসব হওয়া ফাতওয়া! প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের সাথে অন্যান্য জায়গায় পীর অলীদের সালাম দিলে বেয়াদবি হবে না, মিলাদের কেয়ামে দিলে বেয়াদবি হবে— এ কথা কোন নির্ভরযোগ্য কিতাবে থাকলে রেফারেন্স দেয়ার জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি।
আচ্ছা আরেকটা কথা, তাঁরা কিংবা তাঁদের মাসলাকের পীরেরা কোন মাহফিলে গেলে নারায়ে তাকবির স্লোগানের সাথে ওই আলেম কিংবা পীরের নামে স্লোগান দেয়া হয় না? অবশ্যই দেয়া হয়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দেয়ার পর পীর অলীদেরকে সালাম দিলে যদি বেয়াদবি হয়; তবে মহান আল্লাহর নামে তাকবির দেয়ার পর আলেম কিংবা পীরের নামে স্লোগান দিলে তখন বেয়াদবি হবে না কেন? কবি এখানে নিরব!
মূলত আসল সমস্যাটা হলো, এই কালামটা আলা হযরত লিখেছেন এবং এটা সিরিকোটী সিলসিলার ভক্তরা পড়েন— সমস্যাটা এখানেই! নাজায়েজ না হলেও টেনেটোনে নাজায়েজ বানাতে হবে! ওখানে আল্লাহর নামে তাকবীরের পর পীরের নামে স্লোগান দিলে সেটা হয়ে যায় আদব ও ইবাদত। আর এখানে নির্ভরযোগ্য কিতাবের বর্ণিত তথ্যের আলোকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দেয়ার পর পীর অলিদেরকে সালাম দেয়ার বিধিবদ্ধ শরয়ী পদ্ধতি থাকলেও এটা হয়ে যায় নাজায়েজ ও বেয়াদবি!
এখানে আরেকটা প্রশ্ন অনেকেই করেন, আর তা হলো, 'আলা হযরত এই কালামটা মিলাদের উপজীব্য হিসেবে লেখেননি।লিখেছেন কবিতা বা কাসিদা হিসেবে। আর আমরা এটাকে মিলাদের অংশ বানিয়ে নিলাম'।
আচ্ছা বলুন তো, আল্লাহর যে বুজুর্গ 'ইয়া নবি সালামু আলাইকা' লিখেছিলেন তিনি কি এটা মিলাদের কেয়ামে পড়ার জন্য সুনির্দিষ্ট ভাবে লিখেছেন? আমরা সবাই কিন্তু এটা মিলাদের মূল উপজীব্য করে নিয়েছি। এখানে কোন আপত্তি নেই! ওখানে আপত্তি কেন হতে যাবে? আবার 'মিলাদের এই অংশটা শুধু 'ওখানেই' হয় ! পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এটা পড়া হয় না! এটা ভন্ডামি বেয়াদবি'! এরকম কথা প্রায়শই শোনা যায়।
দেখুন, সারা পৃথিবীতে মিলাদ সামগ্রিকভাবে এক ও অভিন্ন হয় না। কোন কোন দেশে মিলাদে 'দফ' বাজানো হয় যা আমাদের দেশে হয় না। আমি ইমাম বুসিরির মাজারে মিলাদের ফরমেট ভিন্ন দেখেছি।
আমাদের পাক ভারত উপমহাদেশের মিলাদের মধ্যে অনেক জায়গায় 'মোস্তফা জানে রহমত' পড়া হয়। এটা সালামের একটা পদ্ধতি। আবার অনেকেই পড়ে না। তবে এটাকে নাজায়েজ বলার কোন নির্ভরযোগ্য দলিল নাই। 'ইয়া নবী সালামু আলাইকা' কসিদাটাও কোন একজন বুজুর্গ লিখে গেছেন, যা আমরা শত বছর ধরে পড়ে আসছি। 'মোস্তফা জানে রহমত'ও আ'লা হযরত রচনা করেছেন, যা কোটি কোটি মুসলমান মিলাদের কসিদায় পড়ে। বলা চলে এটা 'মকবুলে আম' হয়ে গেছে। কল্পিত ও মনগড়া যুক্তি দিয়ে এটাকে বন্ধ করার প্রয়াস সুন্নী সমাজে ফিতনা হিসেবে চিহ্নিত হবে।
ঢাকায় থাকার সুবাদে বাংলাদেশের অনেক দরবারের মিলাদ শরীফের ফরমেট দেখার আমার সুযোগ হয়েছে ।বাংলাদেশের অনেক দরবারের মিলাদের মধ্যে 'ইয়ানবী সালামু আলাইকা' পড়ার আগে যখন 'সাল্লু আলাইহি ওয়া সাল্লিমু তাসলিমা' পাঠ করা হয় তখন সাথে সাথে 'সাল্লাল্লাহু আলা মোহাম্মদ' পড়তে পড়তে দাঁড়িয়ে যায় এবং এটা মিলাদ শরীফের অংশ। এখন প্রশ্ন হল, মিলাদ শরীফের এই অংশটা পৃথিবীতে যে সকল দেশে মিলাদ হয় কোন কোন দেশে পড়া হয়। আমার জানামতে বাংলাদেশের মুষ্টিমেয় ওই কয়েকটি দরবারের অনুসারীদের মিলাদ ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোন দেশের মিলাদের মধ্যে এটা পড়া হয় না। এখন কি এ কারণে এটাকে ভন্ডামি বলা হবে? 'মোস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম' তো বাংলাদেশ পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ পৃথিবীর অনেক দেশে হলেও পড়া হয়। সেই তুলনায় 'সাল্লাল্লাহু আলা মোহাম্মদ' বাংলাদেশের বাইরে কোথাও পড়া হয় বলে আমার জানা নেই ।
তবে এ কথাও সত্য যে, আলা হযরতের এই অনবদ্য কালামের সুযোগ নিয়ে বহু ভন্ড তাদের ভন্ড পীরদেরকে মিলাদের কেয়ামের সালামে অন্তর্ভুক্ত করে, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক!
তবে আমাদের কথা হক্কানী অলি বুজুর্গদের সালাম দেয়া প্রসঙ্গে।
এবার নিরপেক্ষতার কথায় আসি। আমাদের দেশে মাসলাকে আলা হযরতের অনুসারী যেমন আছে, ফুরফুরাসহ অন্যান্য মাসলাকের মানুষও আছে। 'মোস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম' মাসলাকে আলা হযরতের অনুসারীরা পড়েন ; ফুরফুরার মতো অন্যান্য মসলাকের অনুসারীরা পড়ে না। এটা হতেই পারে। সব জায়গা সব পরিবেশে 'মোস্তফা জানে রহমত' প্রযোজ্য নাও হতে পারে। আমি প্রথমেই বলেছি কেউ না পড়লে বা পড়তে না চাইলে তাকে বাধ্য করার বিষয় না। এটা তার স্বাধীনতা। আবার এ দুইয়ের মাঝখানে তৃতীয় আরেকটা লেয়ার আছে, যারা ব্যক্তিগতভাবে আমাকেও বহুবার বলেছে যে, তারা মাসলাক-টাসলাকের মাঝে নেই। তারা নিরপেক্ষ। ওকে, এতেও কোন আপত্তি নেই। তারা মাসলাক-নিরপেক্ষ থাকুক। কিন্তু চলমান আলোচনায় সেই মাসলাক-নিরপেক্ষ অনেকেই দেখলাম facebook ওয়ালে এ নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে মিলাদের মধ্যে 'মোস্তফা জানে রহমত' বন্ধ করার প্রস্তাব প্রসব করছে এবং যারা এটাকে বেয়াদবি বলছে তাদের সাথে 'সহমত' পোষণ করছে! এটার নামই কি মাসলাক-নিরপেক্ষতা? 'নিরপেক্ষতা' শব্দের নতুন কোন অর্থ জন্ম গ্রহণ করেছে কিনা আমার একটু জানতে হবে।
'বুজুর্গানে দ্বীনের মিলাদ' প্রতিষ্ঠা করার যে ধোঁয়া তুলে 'মুস্তাফা জানে রহমত পে লাখো সালাম'কে মাইনাস করার প্রয়াস চলছে, তাহলে কি আলা হযরত বুযুর্গানে দ্বীনের একজন ছিলেন না? ইতিহাস বলে, মিলাদকে সমাজে টিকিয়ে রাখার জন্য পাক-ভারত উপমহাদেশে আলা হযরতের চেয়ে বেশি সংগ্রাম অন্য কেউ করেনি !আজ সেই মিলাদ প্রসঙ্গ এনে সেই আলা হযরতকেই বুযুর্গের তালিকা থেকে বের করে দেয়া হলো!!
নবীর মিলাদে পীর অলিদের প্রতি সালাম কেন, এ কথাটা তো গাউছে পাকের প্রতি সালাম দেওয়ার উপর আঘাত করে। গাউছে পাকের শানে আঘাত করলে বেলায়েত থাকবে?
جو ولی قبل تھے یا بعد ہوئے یا ہوں گے
سب ادب رکھتے ہیں دل میں مرے آقا تیرا
মূলত গাউছে পাকের বেলায়ত বেলায়তে আম্মাহ। সে কারণে উনাকে গাউছুস সাকালাইন বলা হয়। তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হলেও সকল সিলসিলা ওনার ফয়েজ প্রাপ্ত। সকল সিলসিলার অনুসারীগণ উনাকে সালাম দিতে বাধ্য। ওনাকে সালাম দিলে চিশতিয়া সিলসিলার অনুসারীদের রাগ করার কিছু নেই! খাজা মইনুদ্দিন চিশতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বেলায়তও সেরকমই সার্বজনীন। এখানে খাজা মইনুদ্দিন চিশতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির নামে সালাম দিলে অন্য সিলসিলার মানুষের রাগ করার কিছু নেই! এই পাক-ভারত উপমহাদেশের সকল সিলসিলার মানুষ হযরত খাজা মইনুদ্দীন চিশতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির দ্বারা ফয়েজপ্রাপ্ত হয়েছেন। মোজাদ্দেদে আলফেসানী রাহমাতুল্লাহ আলাইহিও সে রকম। একই ধারাবাহিকতায় হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি রহমতুল্লাহি আলাইহির কথা যদি বলি— অন্য দেশের কথা নাই বললাম— বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সকল সুন্নি জনগোষ্ঠী সিরিকোটি হুজুরের ফয়েজ দ্বারা উপকৃত; কেউ প্রত্যক্ষভাবে কেউ পরোক্ষভাবে। এর সর্ববৃহৎ দলিল জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া। তাই সিরিকোটি হুজুরের বেলায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনি সার্বজনীন। অতএব সিরিকোটি হুজুরের প্রতি সালাম দিলে তাসাউফের দৃষ্টিকোণ থেকে রাগ করার কিছু নেই।
বরং জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আওলাদ রাসুল সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটী রহমতুল্লাহি আলাইহি যে এহসান বাংলার সুন্নি মুসলমানদের উপর করেছেন, তার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এহসান-প্রাপ্ত সুন্নি মুসলিম— যে দরবারেরই হোক না কেন— আমি মনে করি আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে সালাম দেয়া নৈতিক দায়িত্ব।
একই বিবেচনায় রাজধানী ঢাকার কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আওলাদ রাসুল আল্লামা সৈয়দ মোহাম্মদ তৈয়ব শাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহির ভূমিকাও সেরকমই।
এতক্ষণ তো আমরা পীর মাশায়েখদের কথা বললাম। আলেমদের মধ্যেও দরবারী সীমাবদ্ধতার মাঝে কিছুকিছু আলেম এমন ছিলেন, যারা সকল দরবারের কাছে সমাদৃত। গাজী শেরে বাংলা রহমতুল্লাহি আলাইহি, আল্লামা আবেদ শাহ মোজাদ্দেদী রহমতুল্লাহি আলাইহি, আল্লামা কাজী নুরুল ইসলাম হাশেমী রহমতুল্লাহি আলাইহি, অধ্যক্ষ আল্লামা এম এ জলিল রহমতুল্লাহি আলাইহি, আল্লামা শেরে মিল্লাত ওবায়দুল হক নঈমী রাহমাতুল্লাহ আলাইহি, অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন আল কাদেরী রহমাতুল্লাহ আলাইহি, আল্লামা আব্দুল বারী জিহাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি, আল্লামা আকবর আলী রেজভী রহমাতুল্লাহ আলাইহিসহ এই কাতারে আরো অনেকে আছেন। যাদের কেউ নিজেরাই ছিলেন এক একজন পীর, আবার কেউ ছিলেন পীরের মুরিদ। অথচ ওনাদের নাম উচ্চারিত হয় সবার দরবারে। আল্লাহর অলিদের মধ্যেও এমন আছেন, যারা সবার কাছে গ্রহণীয় বরণীয়। জামেয়ার প্রতিষ্ঠাতা আওলাদে রাসুল আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি হুজুর রহমতুল্লাহি আলাইহি ও কাদেরিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আওলাদে রাসুল আল্লামা সৈয়দ মোহাম্মদ তৈয়্যেব শাহ রহমাতুল্লাহ আলাইহি এ দেশের প্রেক্ষাপটে সেরকম। সুন্নি কমিউনিটি সবাই পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে তাদের দ্বারা ফয়েজ পাচ্ছে। তাই তাদের প্রতি সবারই সম্মানবোধ, কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা প্রয়োজন।
তা সত্ত্বেও একজন আল্লাহর অলিকে সালাম দিলে অন্য পীরের মুরিদ রাগ করার কোন বিষয় থাকলে এরকম প্রেক্ষাপটে সাধারণত প্রকাশ্যে কিছু বলা অনুচিত। বরং মিলাদ শরীফ পড়ার আগেই যাবতীয় ইনস্ট্রাকশন দিয়ে দেয়া অপরিহার্য। আমাদের আকাবিরীনকেও সেরকমই দেখেছি। আমরাও তাই করেছি বহুবার। আর যদি প্রকাশ্যে কিছু বলার প্রয়োজন তৈরি হয় তবে তার বিপরীত কথাটাই মৌলিক মারেফতের শিক্ষা। আর তা হল, সহনশীলতার শিক্ষা। একজন পীরের প্রতি সালাম দিলে উপস্থিত অন্য পীরের মুরিদদেরকে বরং এ কথা বলা যে, সকল হক্কানী পীরের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। অতএব অমুক পীরের প্রতি সালাম দেওয়া হয়েছে আমি অন্য পীরের মুরিদ তাই রাগ করার কিছু নেই। একজন সত্যিকার দাঈর এ কথাই বলার কথা— যদি প্রকাশ্যে কিছু বলার প্রয়োজন তৈরি হয়।
আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে ওয়াজ-মাহফিল রাজনৈতিক অরাজনৈতিক বহু প্রোগ্রামে যাবার সুযোগ হয়েছে এবং শত শত প্রোগ্রাম এমন ছিল যেখানে বহু পীরের মুরিদ ছিল— নয় বরং বহু দরবারের পীর সাহেবরাও ছিলেন। অথচ সালাম দেওয়া হয়েছে শুধু সিরিকোটী সিলসিলার হুজুরদেরকে। কেউ কোন আপত্তি করেননি— রাগ তো দূরের কথা! আবার এরকম বহু দরবারের প্রোগ্রামে গিয়েছি —যেখানে শুধু ওই দরবারের সিলসিলার মাশায়েখ হযরাতদেরকেই সালাম দেওয়া হয়েছে। তাতেও আমাদের কোন আপত্তি ছিল না— রাগ করা তো দূরের কথা। আল্লামা কাজী মইনুদ্দিন আশরাফী সাহেব জামেয়ার ময়দানে মিলাদে অংশগ্রহণ করলে সিরিকোটী হুজুরদের সালামি দিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। আর আমরাও আশরাফী সিলসিলার অনেক প্রোগ্রামে গিয়ে মিলাদে অংশগ্রহণ করেছি, যেখানে শুধু আশরাফি সিলসিলার মাশায়েখ হজরাতের প্রতি সালামি দেওয়া হয়েছে। আপত্তি কিসের?
(আরো অনেক কিছু লেখার
ছিল কিন্তু ব্যস্ততার কারণে আপাতত লেখা হলো না। সময় সুযোগ ও প্রয়োজনে পরে লেখার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। এতটুকু আল্লাহ তায়ালা কবুল করুন আমীন)
সংগৃহীত : মুফতি আবুল কাশেম ফজলুল হক (মা:জি:আ:), উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদপুর কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসা ঢাকা।
ধন্যবাদ Abul Kashem Fazlul Hoque ❤️❤️