23/05/2026
'হে শিশু, আমাদের ক্ষমা করো’
হাম। যে রোগটি বাংলাদেশ থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল, সেই রোগই এখন শিশুদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যা এখন শুধু একটি সংখ্যা নয়। ১০০, ২০০, ৩০০—এভাবে গুনতে গুনতে ৫০০।
কোথাও কোনো হাসপাতালের বিছানায়, কিংবা কোনো গ্রামের মাটির ঘরে, কোনো মা বা বাবা তাঁদের শিশুর কপালে হাত রেখে কাঁপা গলায় বলবেন, ‘আর একটু চোখ খোলো বাবা।’
কিন্তু শিশুটি আর চোখ খুলবে না। ভাবলে শিউরে উঠতে হয়—এই শিশুগুলোর অপরাধ কী ছিল?
তারা তো রাজনীতি বোঝেনি। টিকাদান কর্মসূচির ফাইল কোথায় আটকে আছে, তা জানত না। এ নিয়ে দেনদরবারে কী সমস্যা হয়েছিল, তা তাদের জানাও নেই।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, যারা বাংলাদেশকে টিকা দিয়ে সহযোগিতা করে, তারা বারবার সতর্ক করেছে। তারা এখন স্পষ্ট করে বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানে গাফিলতি হয়েছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত ঘটেছে। যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলার টিকা পাওয়ার কথা ছিল, তাদের অনেকেই সেই সুরক্ষা পায়নি। আর সেই ফাঁক গলেই ফিরে এসেছে হাম।
এই দেশ হাম নির্মূলের প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
গ্রামের পর গ্রাম, শহরের অলিগলি—স্বাস্থ্যকর্মীরা গিয়ে শিশুদের টিকা দিয়ে এসেছেন। মায়েরা বুক ভরে বিশ্বাস করেছিলেন, অন্তত এই একটি রোগ থেকে তাঁদের সন্তান নিরাপদ।
সেই অর্জন কি তাহলে আমরা হারিয়ে ফেলছি?
যখন একটি রাষ্ট্র সময়মতো টিকা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়, যখন সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, যখন দায় স্বীকারের বদলে ব্যাখ্যা খোঁজা হয়—তখন আসলে প্রতিটি অনিরাপদ শিশুর গলায় অদৃশ্য একটি নম্বর ঝুলে যায়। কে হবে পরেরজন?
প্রতিটি শিশুই একটি পূর্ণ পৃথিবী। একটি শিশু মারা গেলে শুধু একটি প্রাণ হারায় না; হারিয়ে যায় তার ভবিষ্যৎ, তার মায়ের স্বপ্ন, তার বাবার ভরসা, তার ভাইবোনের খেলার সঙ্গী।
হামের এই পুনরুত্থান আমাদের জন্য শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়; এটি আমাদের নৈতিক ব্যর্থতার আয়না।
চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। ভ্রুক্ষেপ ছিল না কারও। তারও আগে অন্তত দেড়টি বছর ধরে টিকা দিতে নিদারুণ অবহেলা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
তবে হে শিশু, তুমি আমাদের ক্ষমা করো। তুমি তাদের ক্ষমা করো, যারা তোমাকে এই পৃথিবীটা দেখতে দিল না সুন্দর করে।