17/05/2026
বাংলাদেশে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ নীতির পরিবর্তন: তরুণ প্রজন্মের জন্য এক নতুন জনস্বাস্থ্য সংকট
-------------------------------------------------
বাংলাদেশ একটি বিপুল জনগোষ্ঠীর দেশ। এখানে কোটি কোটি মানুষের ভেতরে এখনো তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। বহু বছর ধরে সরকার, জনস্বাস্থ্য সংগঠন এবং নাগরিক সমাজ ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন আইন, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং কর বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ফলে প্রচলিত সিগারেট ও তামাকপণ্যের বাজার নিয়ে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির কারণে ভবিষ্যতে তাদের প্রচলিত ব্যবসা চাপে পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো এখন নতুন এক ব্যবসায়িক দিগন্ত উন্মোচনের চেষ্টা করছে, যার নাম নিকোটিন পাউচ ও ই-সিগারেট। “ধূমপানের কম ক্ষতিকর বিকল্প”, “স্মোক-ফ্রি ভবিষ্যৎ” কিংবা “হার্ম রিডাকশন” এর মতো আকর্ষণীয় ভাষা ব্যবহার করে এসব পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোম্পানিগুলোর কাছে জনস্বাস্থ্য নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মুনাফা এবং নতুন ভোক্তা সৃষ্টি।
তারা খুব ভালোভাবেই জানে, বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী একটি বিশাল সম্ভাব্য বাজার। কিশোর ও তরুণদের আকৃষ্ট করতে আধুনিক ডিজাইন, সুগন্ধি ফ্লেভার, ছোট আকৃতির প্যাকেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা ব্যবহার করা হচ্ছে। আজকের শিশু ও তরুণরাই আগামী দিনের দীর্ঘমেয়াদি নিকোটিন ভোক্তা হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, সিগারেটের বাজার যখন চাপে, তখন নিকোটিন পাউচ ও ই-সিগারেট সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার নতুন কৌশল হিসেবে সামনে আসছে।
বাংলাদেশ একসময় ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কারণ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে এসব পণ্য তরুণদের মধ্যে দ্রুত নিকোটিন আসক্তি বাড়াবে। কিন্তু পরবর্তীতে নানা কর্পোরেট চাপ, বিনিয়োগের অজুহাত এবং রাজস্ব আয়ের প্রলোভনে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোরদের হাতেও নিকোটিন পাউচ পৌঁছে যাবে। “ধোঁয়া নেই”, “গন্ধ নেই”, “স্টাইলিশ” বা “নিরাপদ বিকল্প” হিসেবে উপস্থাপন করে এসব পণ্যকে তরুণদের কাছে স্বাভাবিক করে তোলা হতে পারে। অথচ নিকোটিন নিজেই একটি অত্যন্ত আসক্তিকর রাসায়নিক, যা কিশোর মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এবং ভবিষ্যতে মাদকাসক্তির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
রাষ্ট্র হয়তো সাময়িকভাবে রাজস্ব পাবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশ পাবে অসুস্থ ও আসক্ত এক প্রজন্ম। পরিবারগুলোকে বহন করতে হবে চিকিৎসা ব্যয়, মানসিক চাপ এবং সামাজিক সংকটের বোঝা।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে:
জনস্বাস্থ্যের চেয়ে কি কর্পোরেট মুনাফা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?
বাংলাদেশ কি সত্যিই তামাকমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, নাকি শুধু পুরোনো তামাকের জায়গায় নতুন ধরনের নিকোটিন বাজার তৈরি করা হচ্ছে?
আজকের নীতিগত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম সুস্থ থাকবে, নাকি নতুন ধরনের নিকোটিন আসক্তির শিকার হবে।