24/05/2025
জন্মলগ্ন থেকে মায়ের সাথে আমাদের সম্পর্কটা খুব বেশি একীভূত থাকে। মাকে আমরা দেখি বেশিরভাগ সময়, তাকে অনুকরণের চেষ্টাই তখন আমাদের প্রধান করণীয় হয়ে দাঁড়ায়। দিন গণনার সাথে সাথে এই অভ্যাসের ব্যত্যয় ঘটে বটে; তবে যেই মানুষটা মায়ের পাশাপাশি থেকে আমাদের জন্য নিজের সবটা উজার করে দিতে চেষ্টা করেন, সেই বাবা থেকে যান আলোচনার বাইরে।
আমাদের কারো বাবা ব্যবসায়ী, যিনি নিজের সারাটা দিন ব্যয় করেন মানুষের সাথে বোঝাপড়া করতে করতে। কারো বাবা হয়ত জব করেন ৯টা-৫টা, বসের ঝাড়ি গুলো হজম করে দিনশেষে বাড়ি ফেরেন কেবল আমাদের হাসি মুখটা দেখবেন বলে। কারো বাবা জীবিকার টানে পড়ে আছেন এই ইট-পাথরের শহরে, পরিবার থেকে বহুদূরে—সারাদিন খেটেখুটে পরিবারের মুখে অন্ন যোগাতেই যার দিন পার হয়ে যায়। কেউ আবার গার্মেন্টসের মতো এমন চাকরি করেন, যার বেতনটা নিতেও রাস্তায় নামতে হয়। এতো কষ্ট আর পরিশ্রমের পিছনে তাদের নিজেদের বিলাসী জীবন মুখ্য থাকে না, বরং তাদের মূল উদ্দেশ্য নিজের পরিবারকে ভালো রাখা, তাদের প্রয়োজন গুলো পূরণ করা। পরিবারের পরে যদি নিজের জন্য কিছু জোটে, তবে তাতেই তারা বেশ খুশি।
সৃষ্টিগত দিক দিয়েও ছেলেরা অনুভূতি প্রকাশের বেলায় অনেক ইন্ট্রোভার্ট; নিজেদের কষ্ট বা ভালোবাসা— কোনোটিই তারা সহজে প্রকাশ করতে পারেন না। তাই আমরাও ধরে নেই মানুষটা ঠিক আছেন, বাবাদের আবার কিসের চাওয়া-পাওয়া!
এই বাস্তবতা কেবল বাবাদের না, আমাদের ভাই এবং স্বামীদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। তাদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের যথাযথ প্রতিদান আমরা দিতে পারব না, দেওয়া সম্ভবও না কখনো। কিন্তু তাদের এই আন্তরিকতা ও স্নেহপরায়ণতাকে আমরা শ্রদ্ধা করি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাবাকে নিয়ে আমাদের একজন বোনের কিছু অনুভূতি তুলে ধরে আজকের মতো ইতি টানছি।
------
সাল ১৯৯৫, হঠাৎ করে বাবার অফিস থেকে বিদেশে ট্রেনিং ঠিক হয়েছে। ১ মাসের জন্য মালয়েশিয়াতে যেতে হবে। আমি আর আমার বড় বোন অনেক খুশী হয়ে গেলাম। কারণ আমাদের ধারণা ছিল বিদেশে সব কিছু পাওয়া যায়, বিশেষ করে যে জিনিসগুলো বাংলাদেশে পাওয়া যায় না, সেগুলো। তখন বাংলাদেশের খেলনার বাজার আজকের দিনের মত সমৃদ্ধ ছিল না। আমরা তখন বার্বি ডল দিয়ে খেলতাম, নানু বিদেশ থেকে এনেছিল (হালাল, হারাম জানতাম না অবশ্যই) কিন্তু বার্বি ডল এর বেডরুম সেট, ডাইনিং সেট, কিচেন, বাথরুম ইত্যাদি সেট পাওয়া যায় শুনেছিলাম। তাই দুই বোন বায়না ধরলাম বাবার কাছে, আমাদের জন্য বার্বি ডল এর সেট আনতে হবে। আমি চাইলাম বেডরুম সেট আর আমার বোন চাইলো ডাইনিং রুম সেট। ছোট বোন অনেক ছোট, ও চকলেট পেলেই সন্তুষ্ট।
বাবা নির্ধারিত দিনে চলে গেলো। ছোটবোন বাবার ব্যবহৃত লুঙ্গি, গেঞ্জি নিয়ে ঘুমাতো। ঐখানে বাবার গন্ধ পায় বলে। আমাদের অপেক্ষা বাবা কবে ফিরবে বার্বি ডল এর সেট নিয়ে। বিদেশে সব পাওয়া যায়। বাবা নিশ্চয়ই নিরাশ করবেন না আমাদের।
আমাদের বাসাটা ছিল দোতলা, নিচে গেটে তালা লাগানো থাকতো। দারোয়ান ছিল না কোনো। প্রতিটা বাসায় তালার চাবি থাকতো। প্রত্যেক বাসার কলিং বেল নিচে গেটের পাশে ছিল। ১ মাস পর বাবার ফেরত আসার দিন আমি প্রতিটা কলিং বেলের শব্দে চাবি নিয়ে নিচে নেমেছি। ভেবেছি এই বুঝি বাবা এলো! এরকম প্রায় ৫/৬ বার উঠা নামা করার পর সত্যি বাবাই আসলো। আমি প্রথমে চিনি নাই। আমার বাবাকে দেখে ভেবেছিলাম বাবা অন্য কারো স্যুট কোট পরা! কারণ? আমার বাবার চিরস্থায়ী ভুঁড়ি টা অদৃশ্য, কাধ ছোট হয়ে গেছে, মুখটাও চিমিয়ে গেছে! আমি অসম্ভব অবাক হয়েছিলাম! বাবা বলল, "কি রে দরজা খোল মা। কেমন আছোস।" আমি কী বলেছিলাম মনে নাই। মাথায় ছিল বাবার এই হাল হলো কীভাবে। ইতোমধ্যে বাসার সবাই নিচে নেমে এসেছে। আমি গেট খুলতেই সবাই বাবাকে বাসায় নিতে ব্যস্ত। ছোটবোন লাফ দিয়ে কোলে উঠে গেলো বাবার। সবাই খুব খুশি। আমিও কিন্তু বাবার এরকম অবস্থার রহস্য ভেদ করতে না পারার একটা ব্যাথা অনুভব করছিলাম হয়তো।
উপরে এসেই সুটকেস খুলে আমাদের দুই বোনকে একে একে বুঝিয়ে দিলেন একটা নয়, দুই দুইটা বার্বি ডল এর সেট! আমার চাওয়া বেডরুম সেট আর আপুর চাওয়া ডাইনিং রুম সেট। আমরা পাগল প্রায় হয়ে গেলাম আনন্দে। প্যাকেট খুলতেই বড় বোনের কমান্ডিং সুরে আপু বলল, "এটা তোমরা সেট করতে পারবা না ভেঙ্গে ফেলবা। তাই আমিই লাগাবো।"
আমি কাতর কণ্ঠে বললাম "স্টিকার গুলা লাগাতে দাও।" ও বলল, "নষ্ট করে ফেলবি।" বুঝলাম যত যাই বলি, লাভ নাই।
আমাদের রুম থেকে আম্মুদের রুমে যাওয়ার মাঝখানে একটা জায়গা ছিল কমন বাথ আর হাত ধোয়ার বেসিনের জায়গা। আমি যখন সেইখানে এসে পৌঁছি তখন শুনতে পেলাম খাওয়ার ঘরে বাবা খেতে বসে বলছেন "ভাত দাও ভাত! কতদিন ভাত খাই না।" কথাটা শুনে দেয়ালের আড়ালে দাড়ালাম। আম্মু জিজ্ঞেস করলো,"মালয়েশিয়ায় ভাত পাওয়া যায় না? আমি জিজ্ঞেস করতে চাইসিলাম, তুমি এত শুকাইসো কীভাবে।"
বাবার জবাব যা শুনলাম সেটা আমি আমার বাকি জীবনে ভুলবোনা। বাবা বললেন, "ভাত তো ছিলই। আসলে প্রথমে গিয়ে ওদের খেলনা দেখছি। এত দাম! আর আমাকে যে বরাদ্দ দেওয়া হইসে সেটা দিয়ে হবে না। তাই সকালে তো হোটেলে নাস্তা ফ্রি, দুপুরে ট্রেনিং এর সময় যে স্নাকস দিসে খাইসি আর রাতে রুমে ফল দিতো সেটা খাইসি। ডিনার আর লাঞ্চের টাকাটা বাঁচাতে হইসে।"
আমি বুঝলাম আমার বাবা ১ মাস পরিপূর্ণ লাঞ্চ না করে আর ডিনার না করে আমাদের চাওয়া পূরণের জন্য টাকা জমিয়ে খেলনা এনেছে! বাবার শরীরের এরকম দশার রহস্য ভেদ করতে পারলাম। কিন্তু বুক ফেটে কান্না পাচ্ছিল। আমার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, জীবনে অনেক সম্মান অনেক মর্যাদার চাকরি করেছেন, কিন্তু সেই সম্মানের মান রেখেছেন। অবৈধ টাকা ছিল না আমার বাবার, তাই হালাল রুজি, অল্পে তুষ্ট থাকার উপদেশ দিতেন। الحمدلله
এই ঘটনার পর থেকে আমার বাবার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোনো ম্যাটেরিয়াল জিনিসের ডিমান্ড আমি করতে পারি নাই। কিছু কিনতে ইচ্ছা করলে রিক্সা ভাড়ার থেকে টাকা বাঁচিয়ে, ঈদের সালামি জমিয়ে কিনতাম। বাবাকে বলতে পারি নাই। কারণ আমার বাবা তার সাধ্যের অতিরিক্ত যা কিছু আমাদের ইচ্ছা সেটা পূরণে কোনো শর্টকাট নিবেন না। নিজেকে কষ্ট দিবেন কিন্তু বিপথে পয়সা উপার্জন করবেন না। বাবার থেকে শিখেছি অনেক কিছু الحمدلله। বাবার মৃত্যুর পর তার ব্যাপারে মানুষের সাক্ষ্য আমাকে আরো প্রশান্তি দেয়। الحمدلله আল্লাহ্ আমার বাবাকে ক্ষমা করেন, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করেন।
স্মৃতিকথা—
সামান্থা সাবেরীন মাহী
লেখনীতে—
সামিরা ইসলাম