29/03/2026
দেশজুড়ে বাড়ছে হামের প্রকোপ: সোনামণির সুরক্ষায় মা-বাবার জন্য যা জানা প্রয়োজন.....
সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে হামের (Measles) প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় হাম খুব দ্রুত এক শিশু থেকে অন্য শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে, সঠিক তথ্য জানা এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই আমরা সোনামণিদের সুরক্ষিত রাখতে পারি।
কেন হঠাৎ বাড়ছে হামের প্রকোপ?
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের প্রাদুর্ভাব সাধারণত একটি নির্দিষ্ট চক্র মেনে চলে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর এই ভাইরাসের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করে। বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০১৯ সালে হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। সেই চক্র অনুযায়ী, এ বছর হামের ঝুঁকি অত্যন্ত প্রবল। জানুয়ারির শুরু থেকেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী, তাই অভিভাবকদের এখন থেকেই সর্বোচ্চ সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কীভাবে চিনবেন?
হাম হলে শরীরের ভেতরে ভাইরাস প্রবেশের ১০ থেকে ১২ দিন পর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। সাধারণ সর্দিকাশির সাথে এর মিল থাকায় অনেকেই শুরুতে বিভ্রান্ত হন। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
১। তীব্র জ্বর: হঠাৎ করেই শিশুর শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাওয়া।
২। সর্দি ও কাশি: নাক দিয়ে পানি পড়া এবং অনবরত খুসখুসে কাশি থাকা।
৩। চোখের সংক্রমণ: চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং আলোতে তাকাতে শিশুর কষ্ট হওয়া।
৪। র্যাশ বা ফুসকুড়ি: জ্বর শুরুর ৩ থেকে ৪ দিন পর কানের পেছন বা মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সারা শরীরে লালচে র্যাশ ছড়িয়ে পড়া।
হাম নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও কুসংস্কার
আমাদের সমাজে হাম নিয়ে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে, যা শিশুর চিকিৎসায় মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করতে পারে:
ভুল ধারণা: হাম হলে শিশুকে গোসল করানো যাবে না বা গায়ে পানি লাগানো যাবে না।
সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভুল। বরং শিশুর গায়ে জ্বর ও অস্বস্তি থাকলে কুসুম গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার তোয়ালে ভিজিয়ে তার শরীর আলতো করে স্পঞ্জ করে দিলে শিশু আরাম পাবে এবং শরীর পরিষ্কার থাকবে।
ভুল ধারণা: এ সময় শিশুকে মাছ-মাংস বা ডিম দেওয়া যাবে না।
সত্য: হামের সময় শিশুর শরীর ভাইরাসের সাথে লড়াই করে অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময় তার পর্যাপ্ত প্রোটিন ও পুষ্টির দরকার। তাই চিকিৎসকের নিষেধ না থাকলে শিশুকে সব ধরনের সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে।
হামের চিকিৎসায় ভিটামিন 'এ' (Vitamin A)-এর গুরুত্ব
হাম হলে শিশুর শরীরে ভিটামিন 'এ'-এর মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেয়। এই ঘাটতির কারণে চোখের কর্ণিয়ার বড় ধরনের ক্ষতি, এমনকি অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া শ্বাসতন্ত্র বা অন্ত্রের জটিলতা কমাতেও এই ভিটামিন সাহায্য করে। তাই সন্তান হামে আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে সঠিক মাত্রায় ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল বা সিরাপ খাওয়ানো নিশ্চিত করুন।
প্রতিরোধের উপায়: সচেতনতার বিকল্প নেই
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে নিরাপদ ও শতভাগ কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা দেওয়া। বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) শিশুদের জন্য হাম ও রুবেলার (MR) টিকার দুটি ডোজ নির্ধারিত রয়েছে:
প্রথম ডোজ: শিশুর বয়স ঠিক ৯ মাস পূর্ণ হলে।
দ্বিতীয় ডোজ: শিশুর বয়স ১৫ মাস পূর্ণ হলে।
কর্মব্যস্ত জীবনে অনেক অভিভাবকই টিকার সঠিক তারিখ মনে রাখতে হিমশিম খান। কিন্তু একটি ডোজ বাদ পড়া মানেই সন্তানকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া। তাই ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে বা মোবাইলে রিমাইন্ডার সেট করে হলেও টিকার তারিখটি মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। Kidora Smart Parenting বিশ্বাস করে, আপনার একটুখানি বাড়তি মনোযোগই পারে সন্তানের সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।
সন্তান আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিক করণীয় কী?
১. আইসোলেশন বা আলাদা রাখা: হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে। তাই আক্রান্ত শিশুকে বাড়ির অন্য সুস্থ সদস্যদের, বিশেষ করে অন্য শিশুদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখুন।
২. পর্যাপ্ত তরল খাবার: এ সময় শিশুর শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। তাই বুকের দুধ, পানি, ফলের রস এবং তরল জাতীয় পুষ্টিকর খাবার বেশি করে খেতে দিন।
৩. ডাক্তারের পরামর্শ: ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা ওষুধ কিনে খাওয়াবেন না। দ্রুত একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং তার নির্দেশিত চিকিৎসা চালিয়ে যান।
হাম সেরে যাওয়ার পর সোনামণির যত্ন
হামের র্যাশ মিলিয়ে যাওয়ার পর বা জ্বর কমে যাওয়ার পরও শিশু বেশ কিছুদিন শারীরিকভাবে দুর্বল থাকে। এই সময় তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরায় গড়ে তোলার জন্য সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশ্রামের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাকে জোর করে কিছু না খাইয়ে, অল্প অল্প করে বারবার পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার চেষ্টা করুন।
সঠিক সময়ে নেওয়া আপনার একটি সচেতন সিদ্ধান্তই পারে সন্তানকে একটি সুস্থ ও সুন্দর শৈশব উপহার দিতে।
সবার সাথে শেয়ার করে সচেতনতা বাড়ানঃ
আপনার একটি শেয়ার হয়তো আরেকজন ব্যস্ত বাবা-মাকে সতর্ক করতে পারে এবং কোনো ছোট্ট সোনামণিকে এই মারাত্মক ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই সচেতনতা বাড়াতে আর্টিকেলটি নিজের টাইমলাইনে শেয়ার করে পরিবার ও পরিচিত অন্যান্য অভিভাবকদেরও জানার সুযোগ করে দিন।