19/08/2026
🎬 জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি | জহির রায়হান
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের ইতিহাসে জহির রায়হান এক অনন্য নাম। জন্মদিনে বাংলাদেশ ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে এই বহুমাত্রিক শিল্পীকে যিনি তাঁর সৃষ্টিশীলতা, প্রতিবাদী চেতনা ও মানবিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন।
জহির রায়হান ছিলেন একাধারে কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, চিত্রপরিচালক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, চিত্রগ্রাহক ও প্রযোজক। অন্যায়, অমানবিকতা, দুঃশাসন, সামাজিক আধিপত্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর শিল্পীসত্তা সবসময় সোচ্চার ছিল। নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট, তৎকালীন নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম আবু আবদার মোহাম্মাদ জহিরুল্লাহ, ডাকনাম ‘জাফর’। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হন।
১৯৫০ সালে ‘যুগের আলো’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় তাঁর যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করার পাশাপাশি ১৯৫৬ সালে ‘প্রবাহ’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে তাঁর লেখা ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ও ‘আরেক ফাল্গুন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- সূর্যগ্রহণ, শেষ বিকেলের মেয়ে, হাজার বছর ধরে, আর কতদিন, কয়েকটি মৃত্যু, বরফ গলা নদী, তৃষ্ণা প্রভৃতি। ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৬৪ সালে আদমজী পুরস্কার লাভ করেন এবং ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত হন।
চলচ্চিত্রে তাঁর পদার্পণ ১৯৫৭ সালে। ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর নির্মাণ করেন সোনার কাজল (১৯৬২), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), উর্দু চলচ্চিত্র সঙ্গম (১৯৬৪), বাহানা (১৯৬৫), বেহুলা (১৯৬৬), আনোয়ারা (১৯৬৭) এবং কালজয়ী ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০)।
সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ধারণ করা ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছিল তাঁর সাহসী ও প্রতিবাদী চলচ্চিত্র-প্রয়াস। নির্মাণকালে তাঁকে সরকারি নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। চলচ্চিত্রের ভাষা, আঙ্গিক ও নির্মাণশৈলী নিয়ে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নতুন পথ দেখিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁর ‘আর কতদিন’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ অসমাপ্ত থেকে যায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ওপার বাংলায় চলে যান। সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ ও ‘বার্থ অব আ নেশন’। তাঁর তত্ত্বাবধানে বাবুল চৌধুরীর ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন’ এবং আলমগীর কবীরের ‘লিবারেশন ফাইটারস’ প্রামাণ্যচিত্রও নির্মিত হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর চলচ্চিত্র প্রদর্শনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করেন।
পরিচালনার পাশাপাশি তিনি প্রযোজনা করেছেন জুলেখা (১৯৬৭), দুই ভাই (১৯৬৮), সংসার (১৯৬৮), সুয়োরাণী-দুয়োরাণী (১৯৬৮), কুচবরণ কন্যা (১৯৬৮), মনের মত বউ (১৯৬৯), শেষ পর্যন্ত (১৯৬৯) এবং প্রতিশোধ (১৯৭২)।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৫ সালের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাঁকে মরণোত্তর বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ১৯৭৭ সালে একুশে পদক এবং সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার-এ ভূষিত করা হয়-দুটিই মরণোত্তর।
স্বাধীনতার পর ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। তাঁর নিখোঁজ ভাই, কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার, যিনি স্বাধীনতার ঠিক পূর্বমুহূর্তে আল-বদর বাহিনীর হাতে অপহৃত হয়েছিলেন, তাঁকে খুঁজতে শুরু করেন জহির রায়হান। সেই সন্ধান তাঁকে নিয়ে যায় মিরপুরে। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে যাওয়ার পর তিনি আর ফিরে আসেননি। এরপর তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রচলিত ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, সেদিন মিরপুরে বিহারী ও ছদ্মবেশী পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিনি নিহত হয়ে থাকতে পারেন।