16/06/2025
বাজিতপুরের সন্তান আবদুল মোনেম খান
আবদুন মোনেম খান (২৮ জুন ১৮৯৯ – ১৩ অক্টোবর ১৯৭১) ছিলেন বাঙালি রাজনীতিবিদ, আইনজীবী ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর।
তিনি ২৮ অক্টোবর ১৯৬২ থেকে ২৩ মার্চ ১৯৬৯ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরদের মধ্যে তার মেয়াদ সবচেয়ে দীর্ঘ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় যদিও পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন তবুও তার এদেশের প্রতিটি উন্নয়নমূল্ক কাজে ছিলো বিশেষ অবদান।
আবদুল মোনেম খান ১৮৯৯ সালের ২৮ জুন কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার হুমায়ুনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মৌলভি কমর আলি খান ও মায়ের নাম নাসিমা খাতুন।
তিনি ১৯১৬ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল হতে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর ১৯২০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২২ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুনরায় বি.এল. ডিগ্রি লাভ করেন।
আবদুল মোনেম খান ১৯২৭ সালে ময়মনসিং জেলা বারে আইনজীবী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৩০ সালে উত্তর বঙ্গে সংঘটিত বন্যার সময় তিনি সুভাষ চন্দ্র বসুর সাথে ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়েছেন। ১৯৩২ সালে তিনি ময়মনসিংহের আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়ার সহকারি সচিব নির্বাচিত হন। তিনি একজন ক্রীড়া সংগঠকও ছিলেন। তিনি ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সদস্য ছিলেন। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুল বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বপালন করেছেন। ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলার প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন।
তিনি ১৯৩৫ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগ দেন। তিনি ময়মনসিংহ জেলার মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯৩৬ সালে তার আমন্ত্রণে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ময়মনসিংহ সফরে আসেন। এই সফরে জিন্নাহ বেশ কয়েকটি জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন। ১৯৪৭ সালে তিনি পুনরায় জেলা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন।
১৯৪৫ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের সদস্য হন। পরবর্তী কয়েকবছর তিনি এই পদে ছিলেন। পৌরসভার ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে তিনি অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ড করেছেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলার ন্যাশনাল গার্ডকে সংগঠিত করেন। তিনি সংগঠনের সালার-ই-জেলা নিযুক্ত হন।
১৯৪৭ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হন। একই বছরে নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হন। ১৯৫০ সালে তিনি বেঙ্গল ডিফেন্স কমিটি ও প্রভিন্সিয়াল আর্মড সার্ভিসেস বোর্ডের সদস্য হন। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে তিনি অনেক ভোট হারান।
১৯৬২ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেই বছর আইয়ুব খান তাকে কেন্দ্রের স্বাস্থ্য, শ্রম ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী নিযুক্ত করেন।
কয়েক মাস পরে তাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। ১৯৬২ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ১৯৬৯ সালের ২৩ মার্চ তিনি এই পদে ছিলেন। তার শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, ব্যবসা, কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রামে সংঘটিত জলোচ্ছ্বাস এবং ১৯৬৫ সালের সাইক্লোনের পর তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। তার শাসনামলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্সটিটিউট অব পোস্ট-গ্রেজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) এবং কয়েকটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬৭ সালে তিনি দিঘাপতিয়ার রাজবাড়িকে উত্তরা গভর্নর হাউসে রূপান্তর করেন।
তিনি আইয়ুব খানের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। আইয়ুব খান প্রবর্তিত মৌলিক গণতন্ত্রের পক্ষে তিনি কাজ করেছেন এবং ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে আইয়ুব বিরোধী জোটের (কপ) প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর সাথে প্রতিদ্বন্দ্ব্বীতায় তিনি আইয়ুব খানকে সহায়তা করেছেন। তার শাসনামলে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা ও এগারো দফা দাবি এসবের বিরোধী ছিলেন। ফলে তাকে নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরী হয়।
তিনি আইয়ুব খানের ঘনিষ্ঠ সহায়তাকারী ছিলেন। শাসনকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদিদের প্রতি বিরূপ আচরণের জন্য তাকে দোষারোপ করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করায় যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঢাকায় নিজ বাসভবনে ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর মুক্তিবাহিনীর হাতে তিনি নিহত হন।
তথ্য সংগ্রহ উইকিপিডিয়া।
ক্রেডিটঃ Muhammad Uzzal