18/08/2026
বাংলার মুসলিম সমাজে আধুনিক জ্ঞানচর্চা, সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও আত্মপরিচয়ের বিকাশে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ এক বহুমাত্রিকতার নাম। সাংবাদিক, সম্পাদক, সাহিত্যিক, আলেম ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি তাঁর দীর্ঘ শতবর্ষী জীবনের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়কে সম্পৃক্ত করেছিলেন একটি বৃহত্তর সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে। উপমহাদেশের মুসলমান সমাজ যখন শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চেতনার নানা সংকটে নিমজ্জিত, তখন আকরম খাঁ তাঁর কলমকে পরিণত করেছিলেন জাগরণের হাতিয়ারে। সংবাদপত্রকে তিনি সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি জাতির চিন্তা ও আত্মপরিচয় নির্মাণের একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর উত্তরাধিকার তাই কেবল একটি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়, বরং একটি সমাজের আত্মসচেতন হয়ে ওঠার ইতিহাস।
মাওলানা আকরম খাঁ ১৮৬৮ সালের ৭ জুন, পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তাঁর জীবনে বিস্তৃত ছিল না। কিন্তু সীমিত প্রাতিষ্ঠানিকতার গণ্ডি তাঁর জ্ঞানানুসন্ধিৎসাকে কখনো আবদ্ধ করতে পারেনি। আরবি, বাংলা, উর্দু, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় তাঁর গভীর অনুশীলন এবং ইসলাম, ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান তাঁকে স্বশিক্ষিত মনীষীর এক বিরল প্রতিভায় পরিণত করে। জ্ঞানের জন্য তাঁর এই নিরন্তর অনুসন্ধান পরবর্তী জীবনে সাংবাদিকতা, সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্বের বিচিত্র ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতার ভিত্তি নির্মাণ করে।
সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে অল্প বয়সেই তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। আহলে হাদিস ও মোহাম্মদী আখবারে কাজের পর তিনি ‘মোহাম্মদী’ ও ‘আল-এসলাম’-এর সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ‘জামানা’ ও ‘সেবক’ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি সংবাদপত্রকে আরও সক্রিয় সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকার দিকে নিয়ে যান। ‘সেবক’-এর মাধ্যমে অসহযোগ ও স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় পত্রিকাটি নিষিদ্ধ হয় এবং সরকারবিরোধী সম্পাদকীয় লেখার কারণে তাঁকে গ্রেপ্তারও হতে হয়। সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর এই দায়বদ্ধতা প্রমাণ করে, তাঁর কাছে কলম ছিল বিশ্বাস ও সংগ্রামের প্রতীক।
১৯৩৬ সালের অক্টোবরে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় দৈনিক ‘আজাদ’। তৎকালীন বাংলা ভাষার সংবাদপত্রের জগতে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। ‘আজাদ’ দ্রুত মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুসলমান সমাজের অধিকার, শিক্ষা, রাজনৈতিক আত্মপরিচয় এবং সমকালীন নানা প্রশ্নে পত্রিকাটি একটি শক্তিশালী জনমত গঠনের ক্ষেত্রও তৈরি করে। বাংলার সাংবাদিকতার ইতিহাসে ‘আজাদ’-এর প্রতিষ্ঠা তাই কেবল সংবাদপত্র প্রকাশের ঘটনা নয়; এটি ছিল একটি আত্মসচেতন সমাজের কণ্ঠস্বরকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রয়াস। আকরম খাঁর এই সাংবাদিক উত্তরাধিকার তাঁকে মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক জীবনও ছিল বহুমাত্রিক। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল বাঙালি মুসলমানদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার জন্য আপোশহীন সংগ্রাম । ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং সংগঠনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে ভূমিকা রাখেন। আবার ১৯১৮ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯২০ সালে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত খেলাফত সম্মেলনে তিনি খেলাফত কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন এবং তৎকালীন উসমানীয় খেলাফতের সমর্থনে অর্থসংগ্রহ ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মুসলিম সমাজের স্বার্থকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন।
তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রতি অগাধ বিশ্বাস। ১৯২২ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য পার্টি এবং ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল সেই বিশ্বাসেরই বহিঃপ্রকাশ। পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের ফলে তিনি কংগ্রেস ও স্বরাজ্য পার্টির প্রতি আস্থা হারান এবং ধীরে ধীরে মুসলিম রাজনীতির দিকে অধিকতর মনোযোগী হন। এই পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক যাত্রা তাঁকে তাঁর সময়ের জটিল ভারতীয় রাজনীতির একজন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী ও পর্যবেক্ষকে পরিণত করেছিল।
তবে মাওলানা আকরম খাঁকে কেবল সাংবাদিক বা রাজনীতিক হিসেবে দেখলে তাঁর প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাপ্তি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিসর ছিল বিস্তৃত এবং তাঁর লেখার প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলমান সমাজকে নিজের ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। ‘সমস্যা ও সমাধান’, ‘মোস্তফা-চরিত’, ‘আমপারার বঙ্গানুবাদ’, ‘মোসলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’, ‘তাফসীরুল কোরআন’, ‘মুক্তি ও ইসলাম’, ‘বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রিষ্টান ধর্ম’সহ তাঁর বহু গ্রন্থ বাংলা ভাষায় সমাজচিন্তার একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যভাণ্ডার নির্মাণ করে।
তাঁর ‘মোস্তফা-চরিত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হজরত মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবন ও আদর্শকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। বিস্তৃত কলেবরের এই গ্রন্থে তিনি নবীজির জীবনকে ইতিহাস, যুক্তি ও ভক্তির সমন্বয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। প্রায় নয়শ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থ আজও তাঁর সাহিত্যিক ও গবেষণামূলক শ্রমের ব্যাপ্তির সাক্ষ্য বহন করে।
একইভাবে ‘মোসলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ ছিল তাঁর ইতিহাস-অনুসন্ধানী মননের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। এই গ্রন্থে তিনি বাংলার মুসলমান সমাজের সামাজিক অবস্থা, ঐতিহাসিক বিকাশ, অধঃপতনের কারণ এবং বিভিন্ন ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। ইতিহাসকে তিনি নিছক অতীতের বিবরণ হিসেবে না দেখে, এর সাথে অতীতের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটি সমাজের বর্তমানকে বোঝা এবং ভবিষ্যতের পথ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। তাঁর ইতিহাসচর্চার এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে নিছক তথ্যসংগ্রাহক না করে একজন সমাজচিন্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কোরআন ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল বিস্তৃত। ‘তাফসীরুল কোরআন’-এর পাঁচ খণ্ড এবং কোরআনের বিভিন্ন অংশের বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় জ্ঞানকে বাংলাভাষী সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর লেখায় ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং মূল্যবোধ, সমাজ, ইতিহাস ও চিন্তাজগতকে উপলব্ধির একটি বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি এমন এক সময়ে জন্মেছিলেন, যখন ঔপনিবেশিক শোষণ, শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা, রাজনৈতিক অধিকারহীনতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলার মুসলমান সমাজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছিল। তিনি এই সংকটকে মোকাবিলা করতে সংবাদপত্র, সাহিত্য, রাজনীতি ও ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কলম তাই কখনো ইতিহাস, কখনো ধর্ম, কখনো রাজনীতি, কখনো সমাজ নিয়ে বিরতিহীনভাবে লিখে গেছে। তিনি সমগ্র জীবনব্যাপী বাঙালি জনগোষ্ঠী কীভাবে নিজের আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে?-এই প্রশ্নের সমাধান করতে সংগ্রাম করেছেন।
এই কারণেই মাওলানা আকরম খাঁর জীবন আজও আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়, কলম যখন জ্ঞান, সত্য ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা একজন ব্যক্তির কণ্ঠস্বরকে অতিক্রম করে একটি সমাজের বিবেকের ভাষায় পরিণত হয়।
১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ইন্তেকাল করেন। এক শতাব্দীর বিস্তৃত জীবন যেন ঔপনিবেশিক ভারত থেকে বিভক্ত বাংলা এবং পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তান পর্যন্ত এক দীর্ঘ ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য। সাংবাদিকতা ও মুসলিম সমাজের জাগরণে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮১ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে সম্মানিত করা হয়।
ঢাকা ফোরাম অব থ্যট এন্ড সিভিলাইজেশন (DFTC) মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর ৫৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে এই মনীষীকে। যিনি তাঁর শতবর্ষী জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলা ভাষা, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, ইতিহাস ও ইসলামী জ্ঞানচর্চায় রেখে গেছেন এক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক উত্তরাধিকার। ইতিহাসের পাতা তাঁকে একজন সাংবাদিক বা সম্পাদক হিসেবে স্মরণ করতে পারে। কিন্তু একটি জাতির জাগরণের ইতিহাস তাঁকে স্মরণ করবে, পতনোন্মুখ সমাজকে আত্মসচেতন করে তোলার অন্যতম অগ্রনায়ক হিসেবে।