19/08/2026
সারা দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের দরুন বিগত বেশ কিছুদিন ধরে জনগণ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতায় স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
পাশাপাশি অনেক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর ভাষ্যমতে, জুন ও জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ অন্যান্য মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। ফলে সকল শ্রেণির মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বিষয়টি অসহনীয় হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০২৬ সহ ২০২২ ও ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। এর মধ্যে ২০২২ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও ডলার সংকটের জেরে এবং জাতীয় গ্রিডের বিপর্যয়ে দেশের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় অন্ধকারে ছিল।
এছাড়া ২০২৩ সালে তীব্র দাবদাহ ও এলএনজি আমদানিতে বিধিনিষেধের কারণে এক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছিল।
দেশীয় গণমাধ্যমের ভাষ্যমতে, বর্তমান জ্বালানি সংকটের মূল কারণ গ্যাস সরবরাহের স্বল্পতা। এই ঘাটতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের ব্যাপারটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছিল।
তাদের পরিকল্পনার অন্যতম অংশ ছিল ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) এবং ল্যান্ড-বেজড রি-গ্যাসিফিকেশন প্ল্যান্ট স্থাপন। এখন দেখা যাচ্ছে, এর কোনোটিই প্রত্যাশামাফিক কার্যকর হয়নি।
মহেশখালীতে মাত্র দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর ফলে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী বাইরের উৎস থেকে গ্যাস আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গত ১০–১১ বছরে যেসব উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
অর্থাৎ, বলাই বাহুল্য যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়াটা যেমন দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল, তেমনই এর স্থায়ী সমাধানও সাময়িক কোনো পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাথে জাতীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র আছে। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, বর্তমান সরকার নিও-লিবারেল বা নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে। এটি এমন এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতাদর্শ, যা মুক্তবাজার, বেসরকারিকরণ, ব্যবসা-বাণিজ্যে সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্তি (Deregulation) এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের ওপর জোর দেয়।
এই অতিমাত্রায় বেসরকারিকরণ বা মুক্তবাজার অর্থনীতি শুনতে ভালো মনে হলেও, বাস্তবে এটি সুনির্দিষ্ট মুনাফালোভী পুঁজিপতি গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলই সবচেয়ে বেশি করে। বাজারের ওপর সরকার বা অন্য কোনো নৈতিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, ফলে জনগণের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো অথোরিটি পাওয়া যায় না।
ফলত, করপোরেট মাফিয়াদের ইচ্ছানুসারে নির্ধারিত হয় বাজারমূল্য। তাছাড়া বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আমাদের বলে, এ পদ্ধতির অনিয়ন্ত্রিত মুক্তবাজার অর্থনৈতিক কাঠামোতে একচেটিয়া সিন্ডিকেট তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ, একটি বিষয় সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের জাতীয় সংকট খুব শীঘ্রই সমাধান হওয়ার মতো নয়। বরং পরিস্থিতি জনগণের জন্য আরও প্রতিকূল হয়ে উঠবে বলেই মনে হচ্ছে। এই সামগ্রিক ভোগান্তি ও সংকটময় পরিস্থিতিতে ইসলামপন্থীদের নিজস্ব মূল্যায়ন থাকা দরকার।
সমাধানের আগে সংকটের পেছনে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে আলোকপাত করা দরকার, যা বিগত কয়েক দশক থেকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে:
১। আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত
২। রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণহীনতা ও অসম বণ্টন
৩। মুক্তবাজার অর্থনীতি (নব্য উদারনৈতিক)
৪। অতিমাত্রায় নগরায়ন ও শিল্পায়ন
৫। আধুনিক এককেন্দ্রিক শাসনকাঠামো
৬। বস্তুবাদী দর্শনের ভিত্তিতে নাগরিকসত্তা গঠন
৭। সম্পদের মালিকানা-সংক্রান্ত অস্পষ্ট অবস্থান
মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং সিন্ডিকেট-সংক্রান্ত সমস্যার বিপরীতে, অতীতে আমরা দেখেছি একদল সেক্যুলার সমাজতন্ত্র-ঘেঁষা মডেল তথা অর্থনৈতিক সেক্টরের অধিক মাত্রায় সরকারিকরণের নীতি গ্রহণ করেছিল। যার ফলে এই খাত ব্যবসায়ীদের বদলে আমলাতন্ত্রের লুটেরা ও বিত্তবানদের হাতে চলে যায়।
আমরা বলতে চাচ্ছি, এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান কেবল পশ্চিমা নীতি-আদর্শের ঢালাও অনুকরণে সম্ভব নয়। আমরা যে সমাধানের কথা বলব, তা এই ব্যবস্থা তার কাঠামোগত কারণেই করতে পারবে না কিংবা করতে ইচ্ছুক হবে না।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দেশের মূল অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় দর্শনেরই গাঠনিক প্রয়োগ মাত্র। সমস্যার গোড়া চিহ্নিতকরণের জন্য নিচের প্রশ্নগুলোর সমাধান করা জরুরি।
১. সম্পদের মালিকানা কার এবং কতটুকু? সেটা কে নির্ধারণ করবে?
২. সম্পদ ও অর্থনীতির উদ্দেশ্য কী হবে? এবং সেটা কে ঠিক করবে?
৩. শাসক এবং শাসিতের সম্পর্ক কী হবে? এবং সেটা কে ঠিক করবে?
ইসলাম এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যেভাবে দিতে পারে, পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত উত্তর দেয়। ফলে এখানে জনগণের ভোগান্তি কেবল অব্যবস্থাপনাগত বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি একটি আদর্শিক ও দর্শনগত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, লুটেরা ও সিন্ডিকেট সমস্যার সমাধানও কোনো না কোনোভাবে আদর্শিক প্রশ্নের সাথে সংযুক্ত।
তাই, আমরা মনে করি এ সমস্যার চূড়ান্ত ফয়সালা ইসলামী মূলনীতিকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমেই করা সম্ভব। শাসকগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের উচিত আল্লাহর বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং মানুষের হক মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া, সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।
মহান আল্লাহ বলেন:
کَیۡ لَا یَکُوۡنَ دُوۡلَۃًۢ بَیۡنَ الۡاَغۡنِیَآءِ مِنۡکُمۡ ؕ وَمَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡہُ ٭ وَمَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ۘ
“...যাতে তা তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, তাদের মধ্যেই কেবল আবর্তিত না হয়। আর রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।” (সূরা হাশর, ৭)
আমরা এও মনে করি, যদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের এই অসহনীয় সংকটের আশু সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, নিশ্চয়ই তা জনরোষকে আরও তীব্র করবে। আর তা হওয়াই স্বাভাবিক। মানুষের ওপর যুলুম করে ক্ষমতার স্বাদ বেশিদিন ভোগ করা সম্ভব নয়।
সম্মানিত উলামায়ে কেরাম ও ইসলামপন্থীদের নিকট আমাদের আহ্বান,
আপনারা মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিন, তাদের পাশে দাঁড়ান। মানুষকে ঈমান ও সবরের শিক্ষা দিন। বৈষয়িক উন্নতির পাশাপাশি আখিরাতমুখী হওয়ার দীক্ষা দিন। নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসার সবক দিন। দৈনন্দিন সংকটের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে সেক্যুলার শাসনব্যবস্থার আধিপত্যের সংকট থেকে জাতির উত্তরণে ইসলামের করণীয় সবিস্তারে বর্ণনা করুন।
আমরা এদেশের মানুষের কাছে আহ্বান জানাই,
আপনারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হোন। নিত্যদিনের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্ন সমস্যা মনে না করে, সামগ্রিক লেন্সে দেখার চেষ্টা করুন। আজকের সমস্যা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি কালকের সংকটের কথাও ভাবুন এবং সঠিক প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হোন। জাতির প্রকৃত কল্যাণকামীদের পাশে এসে জড়ো হোন। অন্যথায় আন্দোলন ও আত্মত্যাগের ফলাফল আবারও লুণ্ঠিত হবে, যা আমরা এবার কেউই চাই না।
আল্লাহ তা’আলা সকলের জন্য সহজ করে দিন। (আমীন)