20/03/2026
১৪৪৭ হিজরীর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বার্তা
---------------------------------
بسم الله الرحمن الرحیم
إنَّ الْحَمْدَ لِلهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوذُ بِاللهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلاَ مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلاَ هَادِىَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার।” (সূরা বাকারা ২:১৮৩)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من صام رمضان ايمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه متفق عليه
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সাওয়াব অর্জনের জন্য সিয়াম রাখবে, তার পূর্বের জীবনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল মুসলিম ভাই ও বোনদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
মহান আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে, তিনি আমাদের সুস্থতার সাথে রমাদানের সিয়াম পালনের তাওফিক দান করেছেন। ইনশাআল্লাহ, আমরা সবাই যথাযথ নিয়ম মেনে সদাকাতুল ফিতর ও ঈদের সালাত আদায় করব।
আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে দুআ করি, তিনি রমাদানের সমস্ত বরকত ও কল্যাণ দিয়ে প্রতিটি মুমিনের জীবনকে ধন্য করুন। এই মোবারক ঈদ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য বয়ে আনুক শান্তি ও সমৃদ্ধি। আপনাদের সিয়াম, তারাবিহ, সদাকাতুল ফিতর, দুআসমূহ এবং সকল কায়িক ও আর্থিক ইবাদত আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।
সম্মানিত মুসলিম ভাই ও বোনেরা!
আমাদের ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পেত, যদি সারা বিশ্বে ঈমানদারেরা মজলুম ও নির্যাতিত না হতেন এবং আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী অবস্থায় থাকতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মুসলিম উম্মাহর একটি বড় অংশ আজ নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার, আরেক অংশ গাফলত ও উদাসীনতার অন্ধকারে নিমজ্জিত।
নিঃসন্দেহে এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য এক কঠিন ও পরীক্ষামূলক সময়। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাযা উপত্যকা দখলদার ইসরায়েলের আক্রমণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে; সেখানে সত্তর হাজারেরও বেশি মুসলিম শাহাদাতবরণ করেছেন, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু।
অন্যদিকে, ক্রুসেডার-যায়নবাদী অক্ষের প্রতি আনুগত্যের অংশ হিসেবে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা আফগানিস্তানে নগ্ন আগ্রাসন চালিয়েছে। যে বাহিনী একসময় এই ভূখণ্ডে নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, বারবার নিজ জনগণের দিকেই অস্ত্র তাক করেছে, তারাই আজ আফগানিস্তানে ইসলামী ইমারাতকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাচ্ছে। ২৭শে রমাদানের রাতে কাবুলের একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে বিমান হামলায় ৪০০ জন নিহত ও ২৫০ জন আহত হয়েছেন।
একইভাবে মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ইরানে সাধারণ জনগণকে লক্ষ্যবস্তু করছে; মিনাব শহরে এক হামলায় অন্তত ১৬৫ জন স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে। যুদ্ধের ন্যূনতম রীতিনীতি উপেক্ষা করে বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হচ্ছে।
ভারতের মুসলিমদের ওপর চরম জুলুম ও নিপীড়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। কাশ্মীর হিন্দুত্ববাদী দখলদারিত্বের শিকার, যেখানে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের মডেলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
তবুও এই দুঃসহ বাস্তবতার মাঝেও ভবিষ্যতের কল্যাণের ইঙ্গিত রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, কষ্ট ও পরীক্ষার পরই আসে স্বস্তি ও পুনর্জাগরণ।
فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।” (সূরা ইনশিরাহ ৯৪:৬)
বর্তমানের এই বেদনাবহ ঘটনাগুলো, তাদের কঠিন বাস্তবতা সত্ত্বেও, উম্মাহর সামনে এক নতুন অধ্যায়ের দ্বার উন্মুক্ত করছে।
সম্মানিত মুসলিম ভাই ও বোনেরা,
বাংলাদেশে আমরা দীর্ঘ ১৭ বছরের আওয়ামী জাহিলিয়্যাতের দুঃশাসন থেকে মুক্ত হয়ে আরো একটি ঈদ পালন করছি। হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডের ওপর ভারতীয় আধিপত্য পুরোপুরি দূর না হলেও তা কিছুটা শিথিল হয়েছে। এ জন্য আমরা মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি, যিনি মুমিনদের জন্য এই প্রশস্ততা দান করেছেন।
এই পরিবর্তন এসেছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও জান-মালের কুরবানির পর। তবে এই কুরবানির পরও কাঙ্ক্ষিত মুক্তি অর্জিত হয়নি; বরং নতুন বাস্তবতায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে, জুলুম ও জাহিলিয়্যাতের বুনিয়াদ এখনো অটুট রয়েছে।
এর প্রমাণ আমরা চারপাশেই দেখতে পাচ্ছি। সেক্যুলার গোষ্ঠীর অদক্ষতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতালিপ্সা এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোর অন্তর্নিহিত জুলুম আজও এই সমাজকে প্রভাবিত করছে। যে উপাদানগুলো আওয়ামী জাহেলিয়্যাতের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, সেগুলো এখনো বিদ্যমান। এই কওম ও যমীনের সামনে থাকা সংকটগুলোও তাই বহাল রয়েছে, এবং এই ভূখণ্ডের ওপর বিদেশি শক্তির প্রভাবও অটুট আছে।
এই বাস্তবতার সুযোগ নিয়েই ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলার মহল নতুন কৌশলে আবার জনপরিসরে সক্রিয় হয়ে উঠছে। তারা পুরনো বয়ানগুলো নতুন আঙ্গিকে হাজির করছে এবং ‘ওয়ার অন টেরর’-এর বিতর্কিত ন্যারেটিভ সামনে এনে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি’ তকমা লাগানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। দুঃখজনকভাবে, প্রাক্তন ইসলামপন্থীদের একটি বিভ্রান্ত অংশও এই অপপ্রচারে ভূমিকা রাখছে। আমরা আল্লাহর কাছে তাদের হেদায়াত কামনা করি।
হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সূচিত হলেও সফর এখনো শেষ হয়নি। জুলুম ও জাহেলিয়্যাতের কাঠামো অটুট থাকলে কেবল শাসক পরিবর্তনে প্রকৃত পরিবর্তন আসে না। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, হকের পক্ষে প্রতিটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আগে আসে দ্বীনের পুনর্জাগরণ।
দাওয়াহ, ইসলাহ, আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার এবং তাজদীদের সংগঠিত, ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানুষের অন্তর, চিন্তা ও চরিত্র পরিশুদ্ধ হয়ে ওঠে।
ওয়াহী নির্দেশিত বিকল্প দৃশ্যপট সমাজের সামনে তুলে ধরার মাধ্যমে ক্রমে হক ও বাতিলের সুস্পষ্ট মেরুকরণ ঘটে। এভাবেই আমাদের যমীনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার মেহনত অগ্রসর হয়।
ইসলামী আন্দোলনের ভাইয়েরা,
এই সংকটকালে কওম ও উম্মাহর অবস্থা আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়কে ব্যথিত ও ভারাক্রান্ত করে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, মুমিন কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না; নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটে। কিন্তু এই সাহায্য আপনাআপনি আসে না। এর জন্য প্রয়োজন ঈমানদারদের জাগ্রত হওয়া, নিজেদের আমলি ও ঈমানী দিক থেকে প্রস্তুত করা এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে আসা।
ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহর দ্বীনের জন্য কাজ সবসময়ই নিষ্ঠা ও কুরবানির দাবি রাখে। আর এই কুরবানির মাধ্যমেই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য সফলতার দরজা খুলে দেন। তাই আমাদেরও উচিত জীবন, সময় ও সম্পদ দিয়ে দায়িত্বশীলভাবে এই পথে অগ্রসর হওয়া।
আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকি এবং তাঁর দ্বীন ও শরীয়াহ যথাযথভাবে পালন করি, তবে তিনি আমাদের অভিভাবকহীন অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না। বরং প্রকৃত ঈমানদারদের সাহায্য করা তাঁর প্রতিশ্রুতি। আল-কুরআনে তিনি ঘোষণা করেছেন:
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ
“ঈমানদারদেরকে সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।” (সূরা রুম ৩০:৪৭)
তাই আজ আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। আমরা কি আমাদের চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্যকে কাছে টানছি, নাকি আমাদেরই ভুলত্রুটি সেই সাহায্যকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে? আল্লাহর অসন্তুষ্টি বয়ে আনে - এমন প্রতিটি কাজ উম্মাহর বিজয়কে বিলম্বিত করে।
তাই আল্লাহর সাহায্যের যোগ্য হতে হলে আমাদের মুজাহাদা ও আন্তরিক পরিশ্রমে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আমাদের অন্তর, কর্ম ও আচরণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে আমরা সেই প্রকৃত মুমিন, যারা আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় অটল ও বদ্ধপরিকর।
সম্মানিত মুসলিম ভাই ও বোনেরা,
আমরা আপনাদেরই অংশ, আর আপনারাও আমাদের অবিচ্ছেদ্য স্বজন। এই কওম ও যমীনের বাস্তবতায় আমরা সবাই একই সংগ্রামের অংশীদার। আমাদের সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতার জন্য আমরা মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সংশোধন করুন, আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন এবং এই পরিস্থিতির উত্তরণ দান করুন।
আমরা আপনাদের আরো আহবান জানাই, পবিত্র রমাদান মাসে আপনারা যেভাবে ইবাদত ও দান-সদাকায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, ঈদের এই বরকতময় সময়েও সেই নেক আমলের ধারা অব্যাহত রাখুন। আপনাদের অভাবী আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের খোঁজ নিন এবং সাধ্যমতো তাদের সহায়তা করুন। আনন্দ ও উৎসবের আমেজে মসজিদ ও ঘরবাড়ি সুসজ্জিত করুন। এছাড়া শরীয়াহর সীমারেখা বজায় রেখে ঈদ পুনর্মিলনী, আনন্দ মিছিল, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আপনাদের সকল নেক আমল ও প্রচেষ্টাকে কবুল করে নিন।
পরিশেষে, আমরা আবারও সকল ঈমানদার ভাই ও বোনকে ঈদুল ফিতরের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমরা কায়মনোবাক্যে দুআ করি - আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই উম্মাহকে পূর্ণাঙ্গ সফলতা ও বিজয়ের পথে পরিচালিত করুন।
হে আল্লাহ! আমাদের সাহায্য করুন এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। মুসলিম উম্মাহর প্রতিরক্ষায় আপনি আমাদের কবুল করে নিন। আপনার সন্তুষ্টি অর্জন এবং মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার ও নবজাগরণে আমাদের জান-মাল ও শ্রমকে কবুল করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামীন।
রাদিউজ্জামান অনিক
সাধারণ সম্পাদক
ইসলামী রিভাইভাল ফ্রন্ট (IRF)