24/09/2026
এক.
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে পতিত ও ভারতে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা যেদিন ঘোষণা দিলেন আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন এবং আইনের মুখোমুখি হবেন, সেদিন রাজনৈতিক অঙ্গণে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশে ফিরলে তাকে এয়ারপোর্ট থেকেই গ্রেফতার করা হবে এবং তাকে আদালতের দেয়া মৃত্যুদ-ের মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ চাঙাভাব দেখা যায়। দেশে আত্মগোপনে থাকা কিছু নেতাকর্মী উজ্জীবিত হয়ে ঝটিকা মিছিল বের করে। খুব ভোরে কিংবা জুম্মার নামাজের পরে ঝটিকা মিছিল করে সটকে পড়ে। পালিয়ে বিদেশে চলে যাওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বেশ সক্রিয় ও প্রচার-প্রপাগান্ডা চালাতে থাকে। এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মনেপ্রাণে বিশ^াস করছে, শেখ হাসিনা বীরের বেশে দেশে ফিরে সরকারের পতন ঘটিয়ে দেবেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার বহু আগেই অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারও তাকে ফেরত দেয়ার জন্য ভারত সরকারকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে। ভারত তাতে কর্ণপাত করছে না। নীরব হয়ে রয়েছে। যদি হাসিনা ফিরতেই চাইতেন, তাহলে সরকার তাকে ফেরত চাওয়ার সাথে সাথেই তিনি রাজী হয়ে যেতেন। তাতে ভারত সরকারের বাধা দেয়ার কিছু ছিল না। তিনি দেশে ফিরে আইনের মুখোমুখি হতেন। সেটা তিনি না করে নিজেই কেন ঘোষণা দিলেন? এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ তার এই ফেরাকে দেশে থাকা নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার এক ধরনের স্ট্যান্টবাজি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ বলেছেন, হাসিনা নিরাপদ স্থানে থেকে এই ঘোষণার মাধ্যমে দেশে পালিয়ে থাকা নেতাকর্মীদের আরও বিপদে ফেলেছেন। তারা এই ঘোষণায় উজ্জীবিত হয়ে মিছিল করতে গিয়ে ধরা খেয়ে আরও বিপদে পড়ছে। কেউ কেউ বলেছেন, ঘোষণা দিয়ে যদি দেশে না ফেরেন, তাহলে আওয়ামী লীগ আরেকবার অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। নেতাকর্মীরা হতাশায় মুহ্যমান হয়ে পড়বে।
দুই.
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে উৎসবভাব বিরাজ করছে। তারা প্রতিমুহূর্তে ভিডিও এবং পোস্ট করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছে। কেউ কেউ সরকারের পি-ি চটকাচ্ছে। দেখে নেয়ার হুমকিও দিচ্ছে। এখন তাদের আক্রমণের একমাত্র লক্ষ্য বিএনপি সরকার। সমস্ত রোষ যেন তারা তার উপর ঢেলে দিচ্ছেন। অথচ আগে অন্তর্বর্তী সরকার বা এনসিপিকে তারা লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বেশি ভিডিও এবং পোস্ট দিত। অন্যদিকে, আওয়ামী সমর্থক সাংবাদিকরা বিভিন্ন চ্যানেলের টকশোতে গিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের ন্যারেটিভ ক্রিয়েট করছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই তাদেরকেই আওয়ামী লীগের পি-ি চটকাতে দেখা গেছে। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জনরোষ থেকে বাঁচার জন্য তারা রং বদলে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে ও আওয়ামী লীগকে গণধিকৃত দল হিসেবে বর্ণনা করত। এখন গণতান্ত্রিক সরকারের সময় এসে তারা সাহস সঞ্চার করে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিসজম শাসনব্যবস্থা এবং এর প্রধান ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে প্রাসঙ্গিক করার মিশনে নেমেছে। কৌশল হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করছে। যাদের সামান্য কা-জ্ঞান আছে, তাদের এই কৌশলী ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানে যে হাসিনার সরাসরি নির্দেশে তার অনুগত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিচারে সরাসরি গুলি করে চৌদ্দশ’ শিশু থেকে শুরু করে ছাত্র-জনতাকে নির্মমভাবে খুন করেছে, গণহত্যা চালিয়েছে, তা তারা বেমালুম হয়ে আছে। গণহত্যা নিয়ে তারা কোনো আলাপ করে না। অথচ হাসিনার এই নিষ্ঠুর গণহত্যার আলাপ বারবার করার কথা। ইতিহাসের এমন নির্মম গণহত্যা নিয়ে মানবিকতা সম্পন্ন কারো দ্বিমত করার কথা নয়। তা না করে, তাদের কেউ কেউ ইউটিউব চ্যানেলে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণহত্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা আওয়ামী লীগ, যুবলীগের ক্যাডার নয়, অন্য কেউ গুলি চালিয়েছে, এমন বয়ান দিচ্ছে। এতে বোঝা যায়, তাদের বিবেকবোধ ও মনুষত্ব কতটা লোপ পেয়েছে। তারা মনুষত্বকে চাপা দিয়ে অন্ধ ও বধির হয়ে হাসিনাকে প্রাসঙ্গিক করার বয়ান দিচ্ছে। হাসিনা দেশে ফিরবে, এই চাপা আশা এবং আনন্দ নিয়ে কথা বলছে। আর কেউ কেউ তো ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলছে, হাসিনার ফেরার কথা শুনে সরকার থরথর করে কাঁপছে, কিংবা গদি উল্টে যাচ্ছে। বিএনপিপন্থী সাংবাদিকদের অনেককেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় যে, হাসিনার বশংবদ হয়ে যাওয়া টিভি চ্যানেলগুলোর কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাসিনা যেমন রেখে গেছে, তেমনই রয়ে গেছে। এগুলোর নীতিনির্ধারণী জায়গায় হাসিনারই লোকজন বসে আছে। তাদের আশঙ্কা সময় ও সুযোগ বুঝে এই চ্যানেলগুলোই সরকারকে ছোবল মারবে। তার আলামত এখন দেখা যাচ্ছে।
তিন.
শেখ হসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা আনন্দ ও উৎসব চলছে, তা বোঝা যায়। শুধু তাদের মধ্যেই নয়, পুলিশ ও প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী সমর্থক কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ নিয়ে চাপা আনন্দ রয়েছে। সম্প্রতি ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির (এখন প্রত্যাহার করা হয়েছে) এক ফোনকল সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হয়। তাকে বলতে শোনা যায়, আওয়ামী লীগ আবার ফিরবে, আওয়ামী লীগ এলে কিছুই হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে। মাঠের পুলিশ ভয়ানক দুর্বল। ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে, এই মাসেই শেখ হাসিনার আসা উচিৎ ছিল। শেখ হাসিনা ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না। হাসিনার অনুসারী এই ওসি’র ফোনালাপ পুলিশ এবং প্রশাসনের ভেতরে আইসবার্গ হয়ে থাকা হাসিনার অনুসারিদের কথার টিপ (চূড়া) মাত্র। গত ১১ সেপ্টেম্বর গুলশান-১ এ জুম্মার নামাজের পর আওয়ামী লীগ যে ঝটিকা মিছিল বের করে, তা যে পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জ্ঞাতের বাইরে হয়েছে, তা পর্যবেক্ষকরা মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, যতই ব্যাখ্যা দেয়া হোক, পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থায় ঘাপটি মেরে থাকারাই আওয়ামী লীগকে মিছিল করার সুযোগ করে দিয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলশানে ঝটিকা মিছিল করার আগে মিছিলকারীরা গুলশান থানা পুলিশের বেশ কয়েকজনের সহায়তা পেয়েছিলেন। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গোপন চ্যাট বক্সের স্ক্রিন শট থেকে জানা যায়, মিছিলের আগের রাতেই পরের দিনের কর্মসূচি ঠিক করা হয়। গুলশান থানা পুলিশের আশ্বাসও পায় তারা। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, যখন মিছিল বের করা হয়, তখন সড়কে কোনো পুলিশ সদস্য বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছিলেন না। ফলে নির্বিঘেœ মিছিলটি বের করার সুযোগ পায় তারা। এটি কেবল গুলশানের মিছিলের ক্ষেত্রেই ঘটছে এমন নয়, রাজধানীসহ সারাদেশেই এভাবে ভেতরে ভেতরে ফ্যাসিস্টদের দোসর পুলিশ নানাভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সহায়তার চেষ্টা করছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাত-আটটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এগুলো যে ডিসেম্বরে হাসিনার ফেরাকে কেন্দ্র করে একধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পাঁয়তারা, তা বুঝতে বাকি থাকে না। তবে জনমনে এই ধারণা জন্মেছে, সরকার এখনো প্রশাসন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। যদি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারত, তাহলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এই ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে পারত না। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির উচিৎ ছিল, দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে পুলিশ বাহিনী থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর কর্মকর্তাদের অপসারণ করা। পাশাপাশি স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করা। অথচ সাত মাসেও এ কাজটি না করে, ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশ কর্মকর্তাদেরই অদল-বদল করে বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং দিয়েছে। ফ্যাসিস্টের দোসর কর্মকর্তাদের যে জায়গায়ই পোস্টিং দেয়া হোক না কেন, তারা যে আওয়ামী লীগের হয়েই কাজ করবে, তা তো দলটির ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
চার.
ফ্যাসিস্ট হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের তৎপরতা এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের লং মার্চ শুরুর আগে নেতাদের সরকার পতনের হুংকার যেন এক মোহনায় এসে মিলে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার একধরনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে ১১ দলীয় জোটের লং মার্চের পূর্বে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেছেন, তাদের আটদফা দাবি একদফা দাবিতে পরিণত হতে পারে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম একদাফ এগিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নির্ধারণ করতে হবে, তিনি কীভাবে ক্ষমতা থেকে যাবেন। দেশ থেকে হেলিকপ্টারে পালাবেন, নাকি সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করবেন, সেটা তাকেই ঠিক করতে হবে। অথচ তারা সরকার পতনের হুমকি দিলেও হাসিনার দেশে ফেরা ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করছে না। কেন করছে না? তারা কি চাচ্ছেন, যে আওয়ামী লীগকে দেশের মানুষ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে দিয়েছে, সেই আওয়ামী লীগ পুনরায় ফিরে আসুক? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে নানা ইস্যুতে মত-দ্বিমত থাকতে পারে। সরকার তাদের দাবি মানতেও পারে, নাও মানতে পারে। দাবি মানানোর নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে পারে। তবে আওয়ামী লীগ যাতে ফিরতে না পারে, এ বিষয়ে এক থাকতে হবে। তারা যেসব দাবিদাওয়া নিয়ে লংমার্চ করেছে বা আন্দোলন করছে, আওয়ামী লীগ ফিরে এলে কি সেগুলো পূরণ হবে? ধরে নেয়া যাক, এ সরকারের পতন হলো এবং রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হলো, তাহলে তাদের দাবি অনুযায়ী কি জুলাই সনদ সম্পর্কিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হবে? আওয়ামী লীগ কি তা করতে দেবে? সরকারকে বুঝতে হবে, সরকারের সামনে চলার পথটি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই কঠিন পথ সরকারকেই মসৃণ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের সামনে কঠোর অবস্থান নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যেখানে সরকারের টিকে থাকার প্রশ্ন, সেখানে নরম থাকার কোনো সুযোগ নেই। প্রশাসন, পুলিশসহ অন্যান্য যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফ্যাসিস্টের দোসররা ঘাপটি মেরে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র করছে, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে সরিয়ে দিতে হবে। প্রশাসন ও পুলিশকে আওয়ামী দোসরমুক্ত করতে হবে। আস্তিনের নিচে সাপ রেখে চললে, সেই সাপ যে যেকোনো সময় ছোবল মারবে, এই সাধারণ বিষয়টি বুঝতে হবে। বিরোধীদলের সাথে বসে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মোকাবেলাসহ তাদের দাবিদাওয়ার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করে কীভাবে সমাধান করা যায়, সে ব্যাপারে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আওয়ামী লীগ প্রশ্নে যেকোনো উপায়ে রাজনৈতিক ঐক্যমত্য সৃষ্টি করতে হবে।