16/08/2026
সপ্রানের বিবৃতি
প্রস্তাবিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ ও ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’: প্রশ্নবিদ্ধ ধারার কারণে রাষ্ট্র–জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা
তারিখ: ১৬ আগস্ট ২০২৬
গত পনেরো বছরে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন শুধু অসংখ্য ব্যক্তি ও পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থার ভিত্তিকেও গভীরভাবে দুর্বল করেছে। জুলাই অভ্যুত্থান সেই ক্ষত উপশম, রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কার্যকর জবাবদিহির অধীন করার একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রিসভা কর্তৃক ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ। জনমনে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, আইন দুটির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতি মোকাবিলা এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে।
তবে কেবল নতুন আইন প্রণয়নই রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার ক্ষত উপশমের জন্য যথেষ্ট নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে আইনগুলোর কাঠামো ও প্রয়োগে স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহির সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকতে হবে। জনগণকে বিশ্বাস করার বাস্তব ভিত্তি দিতে হবে যে, রাষ্ট্র নিজের প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাকেও স্বাধীন তদন্তের অধীন করতে প্রস্তুত।
এই জায়গা থেকেই খসড়া দুটির কয়েকটি বিধান উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নেতৃত্ব নির্বাচনে নির্বাহী বিভাগ ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কাঠামোর শক্তিশালী প্রভাব কমিশনের দৃশ্যমান স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বিশেষত, যেসব মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার কার্যক্রম কমিশনের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে, তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব কমিশনের নেতৃত্ব নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখলে একটি মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থসংঘাত তৈরি হয়।
একইভাবে, শৃঙ্খলা-বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রতিবেদনের ওপর কমিশনের প্রাথমিক নির্ভরতা উদ্বেগজনক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন না এলে কিংবা গৃহীত ব্যবস্থা সন্তোষজনক না হলে কমিশনের নিজ উদ্যোগে তদন্তের সুযোগ থাকলেও, এই প্রাথমিক নির্ভরতা তদন্ত বিলম্বিত করা এবং অভিযোগসংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রমাণকে প্রভাবিত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য গ্রহণ করা প্রয়োজন; কিন্তু সেটি স্বাধীন তদন্তের পূর্বশর্ত হওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে গুমের অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে গুম ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অতীতে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। পুলিশ বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সদস্য অভিযোগে সংশ্লিষ্ট থাকলে একই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে তদন্ত পরিচালনা একটি মৌলিক স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করে এবং তদন্তের প্রতি ভুক্তভোগী ও জনগণের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে।
খসড়ায় মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি অনধিক পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত ও দুরভিসন্ধিমূলক মিথ্যা অভিযোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। তবে গুম এমন একটি গোপন অপরাধ, যেখানে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণের বড় অংশ প্রায়ই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে কোনো অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত না হওয়া এবং জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ করার মধ্যে আইনকে সুস্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। অন্যথায় ক্ষতিপূরণ ও কারাদণ্ডের আশঙ্কা ভুক্তভোগী পরিবারকে অভিযোগ জানানো থেকে বিরত রাখতে পারে।
সপ্রান মনে করে, এসব প্রশ্নবিদ্ধ বিধান আইন দুটির সামগ্রিক উদ্দেশ্য ও ইতিবাচক সম্ভাবনাকে দুর্বল করতে পারে। যে আইনগুলো রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক মেরামতের ভিত্তি হওয়ার কথা, সেগুলো যদি রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থসংঘাত কিংবা অভিযোগকারীদের মধ্যে ভীতি তৈরির সুযোগ রাখে, তবে পুরোনো ক্ষত উপশমের পরিবর্তে রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা আরও গভীর হতে পারে।
এই কারণে সপ্রান আইন দুটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো পুনর্বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের আহ্বান জানাচ্ছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়াকে দৃশ্যমানভাবে স্বাধীন, স্বচ্ছ ও বহুপক্ষীয় করতে হবে; রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের একক নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবের সুযোগ রাখা যাবে না; এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার যেন নিরাপদে ও আস্থার সঙ্গে অভিযোগ জানাতে পারেন, সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক কেবল নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পুনর্গঠিত হয় না। জনগণ যখন দেখতে পায় যে, রাষ্ট্র নিজের প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাকেও স্বাধীন তদন্ত এবং কার্যকর জবাবদিহির অধীন করেছে, তখনই আস্থা ফিরে আসে। আইন দুটি দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা মোকাবিলা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র–জনগণের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে যে, সে কেবল নাগরিককে আইনের অধীন করতে নয়, নিজের ক্ষমতাকেও স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির অধীন করতে প্রস্তুত।