23/03/2026
ঘটনার শুরু বৃহস্পতিবার রাতে। সেহরি করে বাসায়
ফিরছিলাম। গুলশান লিংক রোড ক্রস করার পর হঠাৎ খেয়াল করলাম যে অ্যাক্সিলারেটর ছেড়ে দিলে গাড়ির সামনের চাকা থেকে সাউন্ড আসছে(ভিডিও ১)। এত রাতে আশেপাশে কোনো মেকানিকের দোকান খোলা না থাকায় আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে মাটিকাটায় বাসায় চলে আসি। পরের দিন শুক্রবার অফিস শেষে তারাবীহ পড়ে গাড়ি নিয়ে বের হই মেকানিক দেখানোর জন্য এবং গাড়ি নিয়ে যাই ECB কালশি রোডের পাশে থাকা পাবনা অটোমোবাইল গ্যারেজে। গ্যারেজের মালিক মঞ্জু আমার সামনে সামনের চাকা খুলে চেক করে। আমি আগে থেকেই আমার গাড়ির সমস্যাটা একটি গ্রুপে পোস্ট করেছিলাম, যেখান থেকে ধারণা পাই যে প্রবলেমটা CV Joint, Ball Joint বা Suspension থেকে হতে পারে। কিন্তু সে সামনাসামনি চেক করে কোনো সমস্যা বের করতে পারে না। সে বলে এভাবে গাড়ি চালানো ঠিক হবে না। সে নাকি রাতে ভালোভাবে চেক করবে। এজন্য গাড়ি রেখে যেতে বলে। যেহেতু আমার পরিচিত কয়েকজন বড় ভাই আগে এই গ্যারেজে তাদের গাড়ির কাজ করিয়েছে, তাই ভরসা করে গাড়ি রেখে আসি।
রাতে সে আমাকে কল করে জানায় গাড়ির অবস্থা নাকি খারাপ এবং সাউন্ডটা নাকি Idle Pinion থেকে আসছে, তাই গিয়ারবক্স রিপেয়ার করতে হবে। এতে নাকি প্রায় ৫০–৬০ হাজার টাকা খরচ হবে। সে আরও বলে সবচেয়ে ভালো হয় গিয়ারবক্স পরিবর্তন করলে, সেক্ষেত্রে প্রায় ১.৫ লাখ টাকা লাগতে পারে। বিভিন্নভাবে আমাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমি বলি সকালে এসে সামনাসামনি দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেব। পরের দিন সকালে গ্যারেজে গিয়ে দেখি আমার গাড়ির সামনের বাম পাশের চাকার সব পার্টস খোলা। বুঝতে পারি সে রাতে আবার গাড়ি খুলে চেক করেছে। আমি তাকে স্পষ্ট করে বলি যে আমি গাড়ি অন্য গ্যারেজে নিয়ে গিয়ে চেক করব। তখন সে আমাকে বোঝাতে থাকে যে এই অবস্থায় গাড়ি চালালে পুরো গিয়ারবক্স নষ্ট হয়ে যাবে। সে আরও বলতে থাকে তার কাছে নাকি ম্যাজিস্ট্রেট, ইন্সপেক্টরসহ বড় বড় অফিসারের গাড়ি আসে এবং এমন অনেক গাড়িও নাকি আসে যেগুলো ১০ জায়গা ঘুরেও ঠিক হয়নি কিন্তু সে ঠিক করে দিয়েছে। পাশের একটি X-Trail দেখিয়ে বলে এই গাড়ির গিয়ারবক্স নষ্ট হয়েছে কারণ মালিক তার কথা না শুনে গাড়ি চালিয়েছে। মোটকথা সে এমনভাবে কথা বলছিল যেন আমার গাড়ির সমস্যাটা দুনিয়াতে সে ছাড়া আর কেউ ঠিক করতে পারবে না।
আমি যখন তবুও রাজি হচ্ছিলাম না, তখন সে বলে দেয় আমি যদি গাড়ি এখান থেকে নিয়ে যাই তাহলে সে আর কোনোদিন আমার গাড়ির সমস্যা দেখবে না। তারপরও আমি তাকে বলি গাড়ি রেডি করে দিতে যাতে আমি অন্য গ্যারেজে যেতে পারি। প্রায় ১ ঘণ্টা সময় নিয়ে সে খুলে রাখা পার্টগুলো লাগিয়ে দেয়। কিন্তু আমি গাড়িতে বসে স্টার্ট দিয়ে অ্যাক্সিলারেট করতেই দেখি গাড়ি সামনে এগোচ্ছে না। তখন সে বলে আগের রাতেই নাকি গাড়ি গ্যারেজে নেওয়ার সময় একটা “কট” সাউন্ড হয়েছিল এবং সে নাকি ঠেলে গাড়ি গ্যারেজে ঢুকিয়েছে। বিষয়টা আমার কাছে একেবারেই অস্বাভাবিক লাগে। কারণ আমি নিজে গাড়ি চালিয়ে গুলশান লিংক রোড থেকে বাসা এবং পরের দিন বাসা থেকে তার গ্যারেজ পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। তাই আমি বিষয়টা ক্রসচেক করার জন্য আমার ড্যাশক্যাম ফুটেজ দেখি। সেখানে পরিষ্কার দেখা যায় আমার গাড়ি রিভার্স গিয়ারে ঠিকঠাকভাবেই তার গ্যারেজে ঢুকছে। ভিডিওতে ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের সময় দেখা যায় সে নিজেই সামনে দাঁড়িয়ে আমার গাড়িকে একেবারে গ্যারেজের শেষ দিকে রাখার নির্দেশ দিচ্ছে( ভিডিও ২)। প্রমাণ সামনে দেওয়ার পর সে আবার কথা ঘুরাতে শুরু করে এবং বলতে থাকে তার নাকি ভুল হয়েছে আমার গাড়ি রেখে দেওয়া।
এই সময় আমার মাথা কাজ করছিল না। একদিকে তার মিথ্যাচার ধরা পড়ে গেছে, অন্যদিকে গাড়ি সেই অবস্থায় অন্য গ্যারেজে নেওয়াও সম্ভব না। রাগের মাথায় আমি বলে আসি যেন আমার গাড়িতে আর হাত না দেয়। এরপর আমি Gari Bazar Workshop এ যাই। গাড়ি কেনার পর এখান থেকেই আমি কিছু বড় মেইন্টেন্যান্স কাজ করিয়েছিলাম (ইনজেক্টর, স্পার্ক প্লাগ, ইঞ্জিন ওয়েল, গিয়ার ওয়েল চেঞ্জ ইত্যাদি)। তাদের হেড টেকনিশিয়ানকে অনুরোধ করি এসে গাড়িটা দেখার জন্য। শনিবার হওয়ায় তাদের অনেক কাজ ছিল, তাই তারা ইফতারের পর সময় দেয়। ইফতারের পর তারা এসে গাড়ি দেখে এবং নিচে ঢুকে বুঝে ফেলে কেন গাড়ি চলছিল না। তারা সাজেস্ট করে যেভাবেই হোক গাড়ি ওই গ্যারেজ থেকে বের করতে, পরে তারা লোক পাঠিয়ে গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাবে এখান থেকে। এরপর আমার গাড়ি এই গ্যারেজ থেকে ঠেলে বের করা হয়। পরে Gari Bazar থেকে লোক এসে গাড়ি ঠেলে তাদের গ্যারেজে নিয়ে যায়। লিফটে তোলার পর প্রথমেই দেখা যায় গিয়ার অয়েল লিক করছে। প্রথমে ভেবেছিলাম ছোটখাটো লিক হবে। তাই ওইটাকে ওইভাবে পাত্তা দেয় নাই। পরে তারা সাজেস্ট করে যে গাড়ির ড্রাইভ শ্যাফট চেঞ্জ করলেই গাড়ি চলবে। এরপর আমি তাদেরকে এইটা চেঞ্জ করার পার্মিশন দিয়ে বাসায় চলে আসি।
পরের দিন সকালে তারা জানায় গিয়ারবক্সের আউটার শেলে ফাটল আছে (ছবি সংযুক্ত), যার কারণে হাউজিং করাতে হবে। আমি মাত্র ১.৫ মাস আগে গিয়ার ওয়েল চেঞ্জ করেছি, তাই যদি কোনো লিক থাকত তাহলে তখনই ধরা পড়ত। আর ফাটলটা দেখলেই বোঝা যায় এটি কোনো আঘাতের কারণে হয়েছে। আগের গ্যারেজে থাকা অবস্থায় মঞ্জু যেহেতু বারবার গিয়ারবক্স রিপেয়ারের কথা বলছিল, তাই আমি একেবারে শিউর সে ইচ্ছাকৃতভাবে এই ক্ষতিটা করেছে যেন বড় কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। হাউজিং করাটা বেস্ট সল্যুশন হলেও আমার সামর্থ্যের বাহিরে হওয়ায় পরে আপাতত অন্য একটি গ্যারেজ থেকে M-Seal আঠা দিয়ে সিল করে নিয়েছি, যেটা দিয়ে হয়তো ১–২ বছর চালানো যাবে।
সবাইকে অনুরোধ করব পাবনা অটোমোবাইলের মতো গ্যারেজ থেকে সাবধান থাকতে। ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি হওয়ায় সে রেফারেন্স দেয় যে ডিওএইচসের বড় অফিসার থেকে শুরু করে ক্যান্টনমেন্টের মেজর/ কর্ণেল সবাই তার কাছে আসে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি তারা আসলে কোন লেভেলের বাটপার। আমি তাদের থেকে নেওয়া ডকুমেন্ট ও Gari Bazar থেকে নেওয়া ইনভয়েস পোস্টে এটাচ করে দিলাম।
আমাদের সবার কাছেই নিজের গাড়ি খুব প্রিয়। তাই আমি সবসময় চেষ্টা করি আমার গাড়ি যাতে সবসময় ভালো থাকে । আমি গাড়ি কেনার সময় মাল্টিব্র্যান্ড থেকে ফুল ইন্সপেকশন করিয়ে কিনেছিলাম এবং বড় মেইন্টেন্যান্স কাজগুলো Gari Bazar থেকেই করিয়েছিলাম, যাতে গাড়িটা একেবারে নতুনের মতো চালাতে পারি।
এই পোস্টের উদ্দেশ্য সবাইকে সতর্ক করা। আমি যেহেতু এই ফিল্ডে একেবারে নতুন এবং গাড়ি নিয়ে আইডিয়া একটু কম, তাই খুব বাজেভাবে ঠকে গিয়েছি।
ধন্যবাদ পুরো পোস্টটি পড়ার জন্য।