02/06/2026
আপনি নিম্নলিখিত খোলা চিঠির বিষয়বস্তুর সাথে একমত হলে এই অনলাইন গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
গণ স্বাক্ষরে অংশ নিতে ক্লিক করুনঃ (গুগল ফর্ম লিঙ্কঃ https://docs.google.com/forms/d/e/1FAIpQLScflP3CHkPxpaXY8oTeuvhTfkxrmRXPaxcSWu0nivFiVaLYxw/viewform)
"সাংস্কৃতিক সার্বম্ভৌমত্ব রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলা চিঠি"
তারিখঃ ০২ জুন ২০২৬
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকা।
অনুলিপি প্রেরণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী, সংস্কৃতি মন্ত্রী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সকল আসনের সংসদ সদস্যবৃন্দ।
শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।
আমরা- বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকর্মী, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও দর্শকসমাজ- গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত ও সনদপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রদর্শনী স্থানীয় উগ্রগোষ্ঠীর চাপের মুখে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের চেষ্টা করা হলেও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে সেটিও রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপের সদস্য এবং চলচ্চিত্রকর্মী হিসেবে আমরা এই ঘটনাকে কেবল একটি প্রদর্শনীর স্থগিতাদেশ হিসেবে দেখছি না; বরং এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, সৃজনশীল সার্বভৌমত্ব এবং সাংবিধানিক অধিকারের ওপর একটি কাঠামোগত আঘাত।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের চিন্তা, বিবেক, মতপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক চর্চার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাষ্ট্র কর্তৃক বৈধভাবে অনুমোদিত একটি চলচ্চিত্র যদি প্রদর্শনের দ্বারপ্রান্তে এসে কতিপয় গোষ্ঠীর পেশিশক্তি ও অযাচিত চাপের মুখে বন্ধ হয়ে যায়, তবে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা কোথায় দাঁড়ায়? যদি একটি শিল্পকর্মের ভবিষ্যৎ আইন ও নীতিমালার পরিবর্তে রাস্তার চাপ বা সংগঠিত মব-রুল দ্বারা নির্ধারিত হয়, তবে আগামীতে এ দেশের কোনো চলচ্চিত্র, নাটক, বই বা শিল্পকর্মই আর নিরাপদ থাকবে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বাংলাদেশের ইতিহাসে শিল্প ও সংস্কৃতি সব সময়ই জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। যে চলচ্চিত্রগুলো সমাজের জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিষয়গুলো তুলে ধরে এবং প্রথাগত নির্মাণের সীমানা পেরিয়ে নতুন গল্প বলে, সেগুলোই মূলত একটি জাতির আয়না হিসেবে কাজ করে। মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামীণ জীবন, নারীর সংগ্রাম কিংবা ধর্মীয় সহাবস্থানের মতো বিষয়গুলো চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই বিশ্বদরবারে পৌঁছেছে। চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নয়; এটি একটি শিক্ষামাধ্যম এবং জাতীয় সংলাপের উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম।
আজ যদি একটি চলচ্চিত্রকে জোরপূর্বক প্রদর্শন থেকে বিরত রাখা হয়, আগামীকাল হয়তো কোনো বইমেলা বা সাংস্কৃতিক উৎসবও একইভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এর ফলে শিল্পীরা বাধ্য হয়ে 'সেলফ-সেন্সরশিপ' -এর পথে হাঁটবেন, যা যেকোনো বিকাশমান গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি, মতের অমিলের সমাধান কোনোভাবেই নিষেধাজ্ঞা হতে পারে না। একটি সুশীল সমাজ প্রতিহিংসা বা দমনের পরিবর্তে পারস্পরিক আলোচনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের মাধ্যমেই বেশি বিকশিত হয়। কোনো শিল্পকর্ম নিয়ে আপত্তি থাকলে তার জবাব হতে পারে আরেকটি শিল্পকর্ম বা সুস্থ সমালোচনা-প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা নয়।
এই প্রেক্ষাপটে,নিম্ন সাক্ষরিত চলচ্চিত্র কর্মী,শিল্পী তথা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের এর পক্ষ থেকে আমরা আপনার কাছে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাগুলো উপস্থাপন করছি:
১. সনদপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ: রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত কোনো চলচ্চিত্র স্থানীয় চাপ, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দাবির মুখে বন্ধ করা যাবে না—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও কঠোর প্রশাসনিক নির্দেশনা আবহমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রদান করা এখন সময়ের সময়ের দাবি।
২. সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা প্রদান: চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বা সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করার শর্টকাট পথে না হেঁটে, প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত সেগুলোর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
৩. চলচ্চিত্র স্বাধীনতা সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন: স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রদর্শন, উৎসব এবং বিকল্প প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৪. জেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক অধিকার বাস্তবায়ন: দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার জন্য জেলা প্রশাসনকে ইতিবাচক ও সহায়ক ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দিতে হবে।
৫. প্রশাসনিক পর্যায়ে সংবেদনশীলতা ও প্রশিক্ষণ: মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাংস্কৃতিক অধিকার, শিল্পের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে।
৬. জাতীয় চলচ্চিত্র কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা: দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত ‘চলচ্চিত্র কাউন্সিল’ গঠন করতে হবে, যা চলচ্চিত্রের নির্মাণ, প্রদর্শন, অর্থায়ন ও নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এবং সেইসাথে শিল্পচর্চার পথে অসাংবিধানিক ও বে-আইনি হস্তক্ষেপের বিপরীতে আইনগত সহায়তা প্রদান করবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমাদের ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতা কখনো শক্তি প্রয়োগে বিকশিত হয় না; মুক্ত পরিবেশেই তার ডালপালা মেলে। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র ভিন্নমতকে ভয় পায় না, শিল্পকে দমন করে না।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই,যেখানে একদিকে একজন ধার্মিক নির্বিঘ্নে তাঁর ধর্ম চর্চার সুযোগ পাবেন ঠিক অন্যদিকে একজন নাগরিক হিসেবে তিনি নিরাপদে ও নির্ভয়ে চলচ্চিত্র দেখতে পারবেন, সংস্কৃতিচর্চা করতে পারবেন এবং একজন শিল্পী নির্ভয়ে প্রথা ভাঙার গল্পও বলতে পারবেন। একটি সনদপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য কাউকে যেন অনুমতির বাইরে অতিরিক্ত কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে না হয়।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের স্বার্থে আপনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। নির্বাচনের পর আপনি যেভাবে সপরিবারে সিনেপ্লেক্সে চলচ্চিত্র দেখতে গিয়ে জাতির কাছে একটি ইতিবাচক ও সুস্থ বিনোদনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরকারি আয়োজনে সপরিবারে একটি উন্মুক্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে সেই সাংস্কৃতিক বার্তাকে আরও সুদৃঢ় করবেন—এটাই আমাদের বিনীত প্রত্যাশা।
সেই সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী, সংস্কৃতি মন্ত্রী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সকল আসনের সংসদ সদস্যবৃন্দদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে বাংলাদেশের আবহমান সাংস্কৃতিক সার্বম্ভৌমত্ব রক্ষায় ইতিবাচক সাংস্কৃতিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করবেন।
শ্রদ্ধাসহ,
স্বাক্ষরকারীদের পক্ষে,
রিসার্চ এন্ড কমিউনিকেশন উইং,
[email protected]
চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ
(বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকর্মী, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীদের পক্ষে)