17/05/2026
🚢🇧🇩 অবরুদ্ধ বাংলাদেশি জাহাজে সন্তান, আমেরিকায় নির্ঘুম রাত মা-বাবার
একটি ফোনকলের অপেক্ষায় দিন-রাত কাটছে নিউইয়র্কে থাকা এক বাংলাদেশি দম্পতির। মোবাইল স্ক্রিনে একমাত্র ছেলের নাম ভেসে উঠলেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় কিছুটা কমে যায়। ওপাশ থেকে ছেলের কণ্ঠ ভেসে আসে— “মা, আমি ভালো আছি। চিন্তা করো না।” কিন্তু হাজার মাইল দূরে সমুদ্রের বুকে আটকে থাকা সন্তানের জন্য মায়ের দুশ্চিন্তা কিছুতেই থামছে না।
এই গল্প কোনো সিনেমার নয়। এটি পারস্য উপসাগরের সংবেদনশীল জলসীমায় আটকে পড়া বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান কিশোরের বাস্তব জীবনকাহিনি। প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ বন্দরে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে জাহাজটি। আর সেই জাহাজের ইঞ্জিন সচল রাখার দায়িত্বে রয়েছেন নরসিংদীর মেধাবী তরুণ রাশেদুল।
📚 নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বৈলাবো গ্রামের ছেলে রাশেদুল হাসান কিশোর ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। চট্টগ্রামের সেন্ট্রাল ক্যাডেট কলেজে শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে নরসিংদীর মাধবদী এসপি ইনস্টিটিউশন থেকে ২০০৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ নিয়ে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ থাকলেও সমুদ্র আর দেশের জন্য কাজ করার স্বপ্ন তাকে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে। ৪৭তম ব্যাচের ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষে ২০১২ সালে পাসিং আউট করেন। পরে আন্তর্জাতিক জাহাজে কাজ শুরু করেন। ২০১৮ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনে (বিএসসি)। দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজে চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
⚓গত ১৫ জানুয়ারি ভারত থেকে রওনা হয়ে দুবাই পৌঁছায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’। পরে ফেব্রুয়ারিতে পারস্য উপসাগরে প্রবেশের পর আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও স্থানীয় প্রশাসনিক জটিলতায় জাহাজটি রাস আল খাইমাহ বন্দরে আটকে যায়। প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ায় কোনো নাবিকই জাহাজ থেকে নামতে পারছেন না।
📡 জাহাজে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি নেই বলে জানিয়েছেন রাশেদুল। তিনি জানান, খাবার, সুপেয় পানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের কোনো সংকট নেই। স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা— “কবে জাহাজ ছাড়ার অনুমতি মিলবে?”
😭 বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা মা শিরীন সুলতানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার একটা মাত্র সন্তান। প্রতিদিন ওর মুখ দেখি, কথা বলি, তারপরও বুকের ভেতরের ভয় যায় না। শুধু চাই, আমার ছেলে যেন সুস্থভাবে এই ঈদে ঘরে ফিরতে পারে।”
তিনি সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতি দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।
👨👦 বাবা আব্দুর রশিদ জানান, দীর্ঘদিন বন্দরে আটকে থাকায় জাহাজের নাবিকদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে। খাবার বা পানির সমস্যা না থাকলেও অনিশ্চয়তা তাদের কষ্ট বাড়াচ্ছে।
🚢 বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, জাহাজে পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও জ্বালানি রয়েছে। সরকার ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সমন্বিতভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আবারও হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা হবে।
এখন নিউইয়র্কের নীরব এক ফ্ল্যাটে দিন গুনছেন মা-বাবা। তাদের একটাই অপেক্ষা— কবে সব জটিলতা কেটে গিয়ে “বাংলার জয়যাত্রা” আবার দেশের পথে যাত্রা শুরু করবে, আর ওপাশ থেকে ছেলে বলবে— “মা, আমি ঘরে ফিরছি।”
🚢🇧🇩