06/04/2025
#ভারতের নতুন ওয়াকফ বিল
ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল আপত্তির মধ্যেও লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাস হয়েছে বিতর্কিত ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫। বুধবার (২ এপ্রিল) গভীর রাতে লোকসভায় এবং বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) রাজ্যসভায় বিলটি অনুমোদন পাওয়ায় ৭০ বছর আগের ওয়াকফ আইন পরিবর্তন এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার মাত্র।
প্রথমে আমরা দেখি ওয়াকফ বিষয়টি কি ? "ওয়াকফ" আরবি শব্দ যার অর্থ বাধা বা নিরোধ। কোন ব্যক্তি যখন কোন সম্পত্তি মুসলিম আইনে স্বীকৃত কোন ধর্মীয় কাজ, দাতব্য উদ্দেশ্যে বা পূণ্য লাভের আশায় মহান আল্লাহর নামে স্থায়ীভাবে উৎসর্গ করে তখন এ উৎসর্গকে ওয়াকফ বলে। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মতে- ওয়াকফ্ হলো কোন নির্দিষ্ট বস্তুতে ওয়াকিফ্ (যিনি দান করেন) এর মালিকানা নিরোধ যাহা নেক উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত।
ভারতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ একর ওয়াকফকৃত জমি আছে বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন দরগাহর নামে যা ১৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সম্পত্তি। ভারতের ওয়াকফ বোর্ড এককভাবে শহুরে জমির মালিকানা হিসেবে পুরো ভারতের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে এবং সামগ্রিক জমির পরিমানের ভিত্তিতে ইন্ডিয়ান আর্মি এবং ইন্ডিয়ান রেলওয়ের পর তৃতীয় সর্বোচ্চ জমির মালিক। সুলতানি ও মুঘল আমলে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে বাদশাহি ও নন বাদশাহি লাখেরাজের মাধ্যমে ওয়াকফ্ সম্পত্তি সংক্রান্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা হতো।১৮৬৩ সনে The Religious Gift Act এর মাধ্যমে এ ধরনের সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা হতো। এরপর ১৯১৩ সালে The Mussalman Wakf Validating Act, 1913 (Act No. VI of 1913) সালে প্রণিত হলে এর মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তি কিছুটা প্রটেকশন লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯২৩ সালের The Mussalman Wakf Act , ১৯৫৪ সালের Wakf Act এবং সর্বশেষ ভারতে ১৯৯৫ সালে এই আইনের সংশোধন হয়। ১৯৯৫ সালের পরে এই প্রথম বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে এই আইনটি পাস হতে যাচ্ছে। ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী এই আইনটি পাস হলে ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় সরকারের আইনগত কর্তৃত্ব বাড়বে এবং ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিলে শিয়া ও পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীসহ ০২ জন নন-মুসলিম সদস্যের অন্তর্ভুক্তি কাউন্সিলের কার্যক্রমকে আরো অন্ত্রর্ভুক্তিমূলক ও গতীশীল করবে যার ফলে ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতা আসবে।
তবে, ভারতীয় মুসলিমদের আশঙ্কা হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার মুসলিম সম্পত্তির ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ অর্জন করার লক্ষ্যেই এই আইন পাশ করতে চাচ্ছে। মুসলিমদের আশঙ্কা এই পদক্ষেপের ফলে ওয়াকফ সম্পত্তির আওতাধীন ঐতিহাসিক মসজিদ, দোকান, মাজার, কবরস্থান এবং হাজার হাজার একর জমি বাজেয়াপ্ত, বিরোধ এবং ধ্বংসের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ওয়াকফ বিলের সবচেয়ে বিতর্কিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটি হলো এর মালিকানা বিধি যা শত শত মসজিদ, মাজার এবং কবরস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এই ওয়াকফ স্টেটগুলো যুগ যুগ ধরে মুসলমানরা দানস্বত্ত্ব মূলে ভোগ করে আসার কারণে এই ধরনের অনেক সম্পত্তির আনুষ্ঠানিক নথিপত্র নেই। কয়েক দশক এমনকি শতাব্দী আগেও আইনি রেকর্ড ছাড়াই মুসলিমরা সেসব দান করেছিলেন। এর আগে বাবরী মসজিদের মত ঐতিহাসিক স্থাপনা যখন রাষ্ট্রীয় মদদে ধ্বংস করা হয়েছিলো তখন জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধই কিন্তু ছিলো মূল ক্রীয়ানক। ১৯৫৪ সালের ওয়াকফ আইনে বাবরী মসজিদ ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে ঘোষিত থাকলেও আদালতে এর শেষ রক্ষা হয় নি। এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। জানুয়ারি,২০২৫ এ মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়ন শহরের মধ্যপ্রদেশ ওয়াকফ বোর্ডের অধীনস্ত প্রায় ৫.২৭ একর জমিতে থাকা দোকান, বাড়ি-ঘর ও একটি শতবর্ষী মসজিদসহ প্রায় ২০০ টি প্রপার্টি ভারত সরকার কর্তৃক বিখ্যাত মহাকালেশ্বর মন্দির ও এর পার্শ্বস্থ কুম্ভ মেলা সম্প্রসারণের নামে গুড়িয়ে দেয়া হয়। কাজেই এটি সহজেই অনুমেয় যে, ওয়াকফ আইন সংশোধনের মাধ্যমে ওয়াকফ বোর্ডে পূর্বের তুলনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরো মজবুত করবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা মুসলমানদের মসজিদ-মাদ্রাসা আর দরগাহ কেন্দ্রিক শিক্ষা ও ইলমী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি সহজেই উগ্রবাদীদের দ্বারা ইসলামিক ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহকে লক্ষ্যবস্তু বানানো সহজতর হবে।
তবে, বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি সরকারিভাবে করায়ত্ত করার উদাহরণ এটিই নতুন নয়। এটি বুঝতে হলে আমাদের চোখ দিতে হবে দূর অতীতে। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে অর্থাৎ সুলতানি ও মুঘল আমলে বিভিন্ন আলেমগণ মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতেন এবং নির্বিঘ্নে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য সুলতানগণ এ সকল প্রতিষ্ঠানকে লাখেরাজ বা করবিহীন সম্পত্তি প্রদান করতেন । এছাড়াও, মসজিদ,মন্দির, দর্গা নির্মাণ, ধর্মানুষ্ঠান পালন এমনকি নিঃস্ব ভিখারী ও মুসাফিরদের জন্যও লাখেরাজ দানস্বত্ত্ব ছিল। মোট ২২ প্রকার লাখেরাজ সম্পত্তির মধ্যে হিন্দুরা ০৭ প্রকার এবং মুসলিমরা বাকি ১৫ প্রকার সম্পত্তি ভোগ দখল করতেন। এসব ওয়াকফ এস্টেট থেকে যা আয় আসতো তা দিয়েই মূলত মুসলমানদের এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহজেই চলতে পারত।
কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনভার গ্রহণের পর থেকে ইংরেজ কর্মকর্তাদের নিষ্কর জমির প্রতি নজর পড়ে। উল্লেখ্য যে, নিষ্কর জমির পরিমাণ এত বেশি ছিল যে এসকল জমির রাজস্ব আদায় করা হলে তা বাংলার তৎকালীন মোট রাজস্বের এক চতুর্থাংশ হত। ১৭৬৯ সালে ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে কোম্পানি কর্তৃক প্রত্যেক পরগনায় একজন রেভিনিউ সুপারভাইজার নিয়োগ করে তাদের যে দায়িত্বসমূহ অর্পন করা হয়েছিলো তার মধ্যে অন্যতম হলো বে-আইনি লাখেরাজ বা নিষ্কর জমি চিহ্নিত করে রাজস্ব ধার্য করা। ১৭৯৩ সালে ইংরেজ সরকার এ সকল লাখেরাজ সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে এগুলোর সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার অজুহাতে সকল নিষ্কর জমির দানপত্রের উপযুক্ত প্রমাণ দাখিলের জন্য এক বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। অনেক মুসলিম কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দানপত্রের এসব জমি সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার প্রয়োজনীয়তা বোধ না করা, সরকারি আদেশ জনগণের মধ্যে ভালভাবে প্রচারের অপর্যাপ্ততা, দানপত্র কীটপতঙ্গের আক্রমণেও বিনষ্ট হওয়া এবং আদালতে নতুন সুবিধাভোগীদের মিথ্যা সাক্ষ্যসহ সর্বোপরি সরকারের উক্ত সম্পত্তিসমূহে দাবী প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ের ফলে ১৮২৮ সাল পর্যন্ত একের পর এক লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। উল্লেখ্য যে, শতকরা ৮৮ জনের লাখেরাজ সম্পত্তি সে সময় বাজেয়াপ্ত করা হয়। এতে হিন্দুরা কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়লেও একপাক্ষিকভাবে মূলত মুসলমানরা এবং সার্বিকভাবে এসব সম্পত্তির উপর নির্ভরশীল মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনিত হয়। ব্রিটিশ সিভিলিয়ান উইলিয়াম হান্টারের (১৮৪০-১৯০০) মতে “Hundreds of ancient families were ruined, and the educational system of the Musalmans, which was almost entirely maintained by rent-free grants, received its death-blow.” মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক এম আর আখতার মুকুল তার ‘কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী’ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে বর্ণণা করেছেন-“ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তনের ফলে এবং সঙ্গে সঙ্গে নিষ্কর বা লাখেরাজ জমির বাজেয়াপ্তির ফলে মুসলমানরা কপর্দকহীন নিঃস্ব হলো এবং মুসলমান জমিদারদের হিন্দু তহশিলদার নায়েব মুহরি ও গোমস্তা ইংরেজদের কৃপা-অনুগ্রহে ভূস্বামীর অধিকার লাভ করল।”
ভারতীয় উলেমাসহ সাধারণ মুসলিমগণ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি থেকে ব্রিটিশ সরকার এবং বর্তমান ভারতের সরকারের ওয়াকফ স্টেটের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপের উপর বরাবরই প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে। ০২ এপ্রিল ,২০২৫ পার্লামেন্টে হায়দ্রাবাদ লোকসভার সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই বিল অসাংবিধানিক বলে দাবি করে বলেন, “সরকার যে আইন তৈরি করছে তা সংবিধানের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিজেপি দেশে সংঘাত তৈরি করতে চাইছে। আগামীকাল কালেক্টর এবং ডিএম বলবেন যে এটি সরকারি সম্পত্তি এবং সেখানে পোস্টার সাঁটাবেন। মসজিদগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই বিল পাস হলে দেশের প্রাচীন মন্দিরগুলো সুরক্ষিত হবে, কিন্তু মসজিদগুলো নয়।”
এছাড়া এ বিষয়ে কংগ্রেস পার্টি লিডার সোনিয়া গান্ধির বক্তব্য হলো, “ এই আইন পাস সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক এবং সংবিধানের উপর একটি নগ্ন আক্রমণ।”
আদতে এই আইন সম্ভবত বিজেপি শাসিত ভারতে মুসলিমদের আরো একটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি করতে যাচ্ছে।
তথ্য তালাশঃ
১। মোঃ আবদুল কাদের মিয়া, ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, পৃঃ ২৩
২। কায় কাউস, ইতিহাসের ছিন্নপত্র(১ম খণ্ড), পৃঃ ২৪-৩৫
৩।মোঃ হান্নান মিয়া, ভূমি আইন প্রয়োগ ও পদ্ধতি, পৃঃ ৫১৬
৪। এম আর আখতার মুকুল , কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী, পৃ-১৩
৫।মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানি( অনুবাদঃ ফয়জুল্লাহ আমান), নকশে হায়াত (১ম খণ্ড), পৃ-১৯২-১৯৩
৬। https://www.kalbela.com/world/india/176830
৭। https://pib.gov.in/PressReleseDetailm.aspx?PRID=2118799®=3&lang=1
৮। https://minorityaffairs.gov.in/show_content.php?lang=1&level=2&ls_id=318&lid=252
৯। https://www.youtube.com/watch?v=HSv19wDl2K8&t=145s
১০। https://www.aljazeera.com/news/2025/3/25/government-encroachment-of-indias-waqf-lands-a-madhya-pradesh-example
১১। https://www.aljazeera.com/news/2025/4/4/indias-opposition-says-will-challenge-muslim-properties-bill-in-top-court
১২। https://dailyinqilab.com/international/news/748638
১৩। https://bangla.hindustantimes.com/nation-and-world/waqf-amendment-
১৪। https://shorturl.at/N8yhW
১৫https://www.jugantor.com/index.php/ajax/load/detail/936875/6/1