28/04/2026
https://www.facebook.com/share/p/1NEeNhvGsC/
“You can’t connect the dots looking forward; you can only connect them looking backward. So you must trust that the dots will somehow connect in your future.” — Steve Jobs
মৃত্তিকা বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ভাইভা বোর্ডে ‘soil definition’ দিতে না পারা সেই ছাত্রটিই যখন আজ লন্ডনের কর্পোরেট ডেস্কে বসে গ্লোবাল অপারেশনস সামলায়, তখন বোঝা যায়—জীবন আসলে পাঠ্যবইয়ের সংজ্ঞার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। আমার শুরুটাও ছিল ঠিক এমনই—একদম অগোছালো। প্রাতিষ্ঠানিক সিলেবাসের চেয়ে বাইরের পৃথিবী এবং নিজের দক্ষতাকে গড়ে তোলার প্রতি যে সহজাত টান ছিল, সেই কৌতূহলই আজ আমাকে হাজার মাইল দূরে যুক্তরাজ্যের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশে বন্ধুদের মাঝে আমি ‘আহসান’ নামেই পরিচিত ছিলাম। তবে যুক্তরাজ্যে আসার পর আমার সহকর্মী ও বন্ধুরা আমাকে ‘মুজাহিদ’ বা ‘হক’ নামেই ডাকে। আমার শিক্ষার ভিত গড়ে ওঠে মাদ্রাসায়। ২০০৫ সালের ৫ জুন আমি পবিত্র কোরআনের হাফেজ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি। মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় হাফেজ হওয়ার সেই একাগ্রতা আমাকে জীবনের পরবর্তী কঠিন সময়গুলোতে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে।
তবে ২০০৬ সালে বাবার আকস্মিক মৃত্যু আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরিবারের ছোট সন্তান হওয়ায় মা ও বড়দের সিদ্ধান্তে আমাকে হাজারীবাগের একটি সাধারণ স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। মাদ্রাসা থেকে স্কুলে আসার এই পরিবর্তন ছিল আমার জীবনের প্রথম বড় অ্যাডাপ্টেবিলিটি টেস্ট।স্কুলজীবনে আমার মন কখনোই চার দেয়ালের গণ্ডিবদ্ধ পড়াশোনায় আটকে থাকেনি। যখন সহপাঠীরা ক্লাসের পড়ায় ব্যস্ত, আমি তখন ক্লাব, সায়েন্স ফেয়ার, নতুন প্রজেক্ট এবং আউট-নলেজের জগতে নিজেকে ব্যস্ত রাখতাম। একাডেমিক পড়াশোনা আমাকে খুব বেশি টানেনি, কিন্তু কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস ছিল আমার সবচেয়ে বড় আগ্রহ। এই প্রথাগত ধারার বাইরে চলার কারণেই এসএসসি ও এইচএসসি-তে আশানুরূপ ফলাফল হয়নি, ফলে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ হাতছাড়া হয়।
অবশেষে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই—যে বিষয়ের নাম আমি আগে কখনোই শুনিনি। অনার্সে ভর্তির পর আমি এক নতুন উপলব্ধির মুখোমুখি হই—নিজের ভাগ্য নিজেকেই গড়তে হবে। এই সময় আমি নিজেকে ব্রিটিশ কাউন্সিল, সয়েল ক্লাব এবং জাতিসংঘ-সম্পর্কিত বিভিন্ন দেশি-বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করি। বিভিন্ন দেশের তরুণদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ আমার কমিউনিকেশন ও প্রেজেন্টেশন দক্ষতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ছাত্রাবস্থায় নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে ভারত, ভুটান এবং মালয়েশিয়া ভ্রমণ করার পাশাপাশি পবিত্র হজ পালন করার সৌভাগ্য অর্জন করি। এই গ্লোবাল এক্সপোজার আমার আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আমার পেশাগত যাত্রা ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।
শুরুটা হয় Grameenphone Ltd.-এ, যেখানে আমি Customer Service Manager (Apprenticeship) হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। দেশের শীর্ষ টেলিকম অপারেটরে কাজ করার ফলে কাস্টমার সার্ভিস ও কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (CRM) বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করি।পরবর্তীতে কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে আমাকে বসুন্ধরায় অবস্থিত প্রধান কার্যালয় ‘GP House’-এ স্থানান্তর করা হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। পরে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (HSIA) শাখায় কাজ করার সুযোগ পাই, যেখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। এরপর Royal Multispeciality Hospital (RMSH)-এ Branding and Marketing Executive হিসেবে যোগদান করি। এখানে ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেস তৈরি এবং ডিজিটাল মার্কেটিং পরিচালনার দায়িত্ব পালন করি। পরবর্তীতে AJ Group-এ Senior Branding & Marketing Executive হিসেবে রিয়েল এস্টেট সেক্টরে কাজ করি, যেখানে প্রজেক্ট মার্কেটিং, সেলস অপারেশন এবং করপোরেট কমিউনিকেশন সামলাই। এরপর ‘Probashi’ নামক NRB কানেক্টিভিটি প্ল্যাটফর্মে Marketing Specialist হিসেবে কাজ করি, যেখানে B2B মার্কেটিং এবং গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করি। আমার ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জাপানিজ মাল্টিন্যাশনাল এড-টেক কোম্পানি PT. Timedoor Indonesia-তে Marketing and Admin হিসেবে কাজ করা। এখানে গ্লোবাল টিম ম্যানেজমেন্ট এবং জাপানিজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের অধীনে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পরিবর্তন করে।
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন থাকলেও কম সিজিপিএ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের North Dakota State University থেকে ফান্ডিং রিজেকশন, Erasmus Mundus স্কলারশিপ এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রত্যাখ্যান আমাকে হতাশ করলেও আমি হাল ছাড়িনি। পরবর্তীতে AIUB থেকে মার্কেটিংয়ে Executive MBA সম্পন্ন করি এবং Data Analytics, Python ও Digital Marketing-এ নিজেকে দক্ষ করে তুলি। পাশাপাশি Alliance Française থেকে ফ্রেঞ্চ ভাষায় A1 ও A2 সম্পন্ন করি, যা আমার গ্লোবাল প্রোফাইলকে আরও শক্তিশালী করে।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ আসে, যখন যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য 2 Sisters Food Group-এ কাজ করার সুযোগ পাই। বর্তমানে আমি ওয়েলসের স্যান্ডিক্রফ্টে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানে Quality Assurance Operative হিসেবে কাজ করছি। এখানে প্রতিদিন ইউকে রেগুলেশন অনুযায়ী Food Safety Compliance, Traceability, Labelling Accuracy এবং BRC Standard-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়।
আমার এই যাত্রা আমাকে শিখিয়েছে—সফলতা মানে শুধু ভালো রেজাল্ট নয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি আমার পরামর্শ—শুরু থেকেই নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করো। একাডেমিক জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরুরি সফট স্কিল এবং গ্লোবাল মানের দক্ষতা অর্জন। আমি যদি মাটির সংজ্ঞা না পারার পরও আজ লন্ডনের কর্পোরেট টেবিলে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারি, তবে সঠিক পরিকল্পনা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে তুমিও পারবে। আজকের পৃথিবী শুধু সার্টিফিকেট দেখে না—দেখে তোমার দক্ষতা, কাজের মান এবং অধ্যবসায়। তাই সময় থাকতে নিজেকে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে গড়ে তোলো; একদিন তোমার পরিশ্রমই তোমার হয়ে কথা বলবে।