27/03/2026
ইতিহাসের অকাট্য দলিল
‘একটি জাতির জন্ম’: শহীদ জিয়ার কলমে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার মাহেন্দ্রক্ষণ
রুদ্র মুহম্মদ জাফর
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ নানা সময়ে বাঁক নিয়েছে। গত কয়েক দশকে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ইতিহাসের মহানায়কদের স্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রবল মেরুকরণ। এই দীর্ঘ বিতর্কের ভিড়ে অনেক সময় চাপা পড়ে যায় সমসাময়িক দলিল আর প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। অথচ ইতিহাসের সত্য কখনো কখনো এতটাই স্পষ্ট যে, তা কোনো রাজনৈতিক চশমা ছাড়াই পাঠ করা সম্ভব। এমনই এক অকাট্য ও ঐতিহাসিক দলিল হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম মহানায়ক, ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের নিজের লেখা প্রথম নিবন্ধ ‘একটি জাতির জন্ম’।
১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে ‘দৈনিক বাংলা’র বিশেষ সংখ্যায় নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় এটি পুনরায় ছাপা হয়। আজ যখন স্বাধীনতার ঘোষণা কিংবা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি যুক্তি চলে, তখন জিয়ার এই লেখাটি আমাদের ইতিহাসের এক নির্মোহ আয়না হিসেবে কাজ করে। এই নিবন্ধে জিয়াউর রহমান কেবল যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেননি, বরং অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও স্পষ্টতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত অবস্থান।
বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’র স্বীকৃতি
জিয়াউর রহমান তাঁর নিবন্ধের শুরুতেই অত্যন্ত সিনা টান টান করে বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। তিনি লিখেছেন, "১লা মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে সারা দেশে শুরু হলো ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলন।" বর্তমান সময়ে যারা বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে মানতে দ্বিধা করেন কিংবা বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান, তাদের জন্য জিয়ার এই একটি বাক্যই যথেষ্ট। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং তৎকালীন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা যখন তাঁর প্রথম লেখায় এই অভিধাটি ব্যবহার করেন, তখন তা কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে নয়, বরং হৃদয়ের গভীর থেকে আসা সত্যের উচ্চারণ হিসেবেই গণ্য হয়। জিয়াউর রহমান এটি লিখেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন যুদ্ধের স্মৃতি তখনো দাউ দাউ করে জ্বলছে এবং ইতিহাসের কুশীলবেরা সবাই জীবিত।
৭ই মার্চের ভাষণ: যুদ্ধের ‘গ্রিন সিগন্যাল’
জিয়াউর রহমানের এই রচনায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশটি হলো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ। তিনি লিখেছেন, "৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম।" এই একটি উদ্ধৃতি বর্তমানের অনেক ঐতিহাসিক ধোঁয়াশা দূর করে দেয়। অনেকে বলে থাকেন, ২৬শে মার্চের আগে সশস্ত্র যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি ছিল না কিংবা সামরিক কর্মকর্তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন না। কিন্তু জিয়াউর রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ৭ই মার্চের ভাষণটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা ছিল না; এটি ছিল বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য এক চূড়ান্ত সমর-আদেশ বা যুদ্ধ শুরু করার সংকেত। জিয়াউর রহমানের ভাষায়, সেই ভাষণ শোনার পর তাঁর মতো পেশাদার সেনারা বুঝে নিয়েছিলেন যে, এখন আর পিছু হটার পথ নেই।
পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডা ও জিয়ার পাল্টা অবস্থান
জিয়াউর রহমান তাঁর নিবন্ধে তুলে ধরেছেন কীভাবে পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালি সেনাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করত। তিনি উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণের সময় তাঁদের মগজধোলাই করার চেষ্টা করা হতো। তাঁদের বারবার বোঝানো হতো—শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের অখণ্ডতার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং তিনি রাষ্ট্রের ‘এক নম্বর শত্রু’। কিন্তু জিয়াউর রহমান তাঁর লেখায় গর্বের সাথে প্রকাশ করেছেন যে, পাকিস্তানি সেনাদের সেই বিষাক্ত প্রচারণায় তাঁরা বিভ্রান্ত হননি। বরং তাঁরা অন্তর দিয়ে অনুভব করেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই তাঁদের মুক্তিদাতা। এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, জিয়াউর রহমান কেবল একজন সৈনিক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন প্রখর রাজনৈতিক সচেতন মানুষ, যিনি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পারতেন।
অসহযোগ আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ
জিয়াউর রহমান তাঁর নিবন্ধে ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা কোনো তুখোড় রাজনীতিকের বর্ণনার চেয়ে কম নয়। তিনি লিখেছেন কীভাবে সাধারণ মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঙালি সেনারা সেই আন্দোলনে একাত্ম হয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনায় স্পষ্ট ফুটে উঠেছে যে, বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যেভাবে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। জিয়াউর রহমান এই আন্দোলনের শক্তি থেকেই বিদ্রোহের রসদ পেয়েছিলেন। তাঁর মতে, বঙ্গবন্ধুর সেই ডাকই ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার একমাত্র পথ।
ঘোষক বনাম নেতৃত্ব: একটি অহেতুক বিতর্ক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে একটি বিতর্ককে খুব সুকৌশলে জিইয়ে রাখা হয়েছে—স্বাধীনতার ঘোষণা বড় নাকি নেতৃত্ব বড়? জিয়াউর রহমান নিজেই তাঁর লেখায় এই বিতর্কের সমাধান দিয়ে গেছেন। তিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন—এটি এক অনস্বীকার্য সত্য। কিন্তু জিয়া তাঁর নিজের লেখায় কোথাও নিজেকে বঙ্গবন্ধুর বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাননি। বরং তিনি অত্যন্ত বিনীতভাবে স্বীকার করেছেন যে, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণায় এবং তাঁরই দেওয়া নির্দেশনার আলোকে। তিনি নিজেকে একজন ‘যোদ্ধা’ এবং বঙ্গবন্ধুকে ‘দিশারি’ হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন।
জিয়াউর রহমানের এই নিবন্ধটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে কোনো দূরত্ব ছিল না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, আর জিয়া ছিলেন সেই আন্দোলনের এক নির্ভীক সেনাপতি। একজনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অন্যজন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আজ যারা জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাতে চান, তারা আসলে জিয়ার নিজের আদর্শকেই খাটো করেন।
‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধটি আজ কেবল একটি পুরোনো পত্রিকার কলাম নয়; এটি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের এক ঐতিহাসিক দলিল। আজকের কন্ঠের পাতায় যখন আমরা ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ করি, তখন এই ধরনের দলিলগুলো আমাদের সত্যের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়। শহীদ জিয়াউর রহমানের নিজের লেখা এই প্রথম রচনায় যে পরিপক্বতা এবং সত্যনিষ্ঠা ছিল, তা আমাদের বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে।
নিবন্ধটির শেষ দিকে জিয়াউর রহমান যুদ্ধের ময়দানে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, একটি জাতির জন্ম কেবল বন্দুকের নল থেকে হয় না, বরং তার পেছনে থাকে একজন কালজয়ী নেতার আদর্শ আর কোটি মানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
শহীদ জিয়াউর রহমানের নিজের কলমে বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির পিতা’ সম্বোধন করা এবং ৭ই মার্চের ভাষণকে যুদ্ধের মূল সংকেত হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি আজ রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়া উচিত। এটি কেবল একটি দলের জন্য নয়, বরং পুরো জাতির একাত্মবোধের জন্য প্রয়োজন। ইতিহাসকে তার আপন গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। জিয়াউর রহমান ও বঙ্গবন্ধু—দুজনেই বাংলাদেশের ইতিহাসের ধ্রুবতারা। একজন স্বপ্ন দেখিয়েছেন, অন্যজন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
জিয়াউর রহমানের ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধটি পাঠ করলে আমাদের সামনে একটিই সত্য প্রতিভাত হয়—১৯৭১ সালে আমাদের কোনো বিভক্তি ছিল না। আমাদের লক্ষ্য ছিল এক, নেতা ছিলেন এক এবং গন্তব্য ছিল একটি স্বাধীন বাংলাদেশ। আজ ৫৩ বছর পর দাঁড়িয়ে সেই ঐক্যবদ্ধ ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোই হোক আমাদের অঙ্গীকার। জিয়াউর রহমানের প্রথম লেখাটি আমাদের সেই পথই দেখায়, যেখানে বীরত্বের পাশে বিনম্র শ্রদ্ধা মিশে আছে।
রুদ্র মুহম্মদ জাফর
সম্পাদক, আজকের কন্ঠ