26/02/2026
সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আজকেও একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন শ্রমিক ও মালিকরা সমঝোতার ভিত্তিতে চাঁদা সংগ্রহ করে তাঁদের কল্যাণে ব্যয় করেন এবং এটা মন্ত্রণালয়ের রহিত করার কোন সুযোগ থাকেনা। তাঁর বক্তব্যটি কমেন্টে সংযুক্ত করা হয়েছে শুনতে পারেন।
এবার আসুন, আপনাদের সামনে কেবল মহাখালী বাস টার্মিনাল কেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বিষয়টি তুলে ধরা যাক।
সাধারণত যে দল সরকার গঠন করে সে দলের অনুসারীরাই সংশ্লিষ্ট টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চাঁদাবাজি করে থাকে।
আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় তাদের অনুসারীরা চাঁদা গ্রহণ করত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরেও তারাই চাঁদা গ্রহণ করছে, কেবল প্রশ্রয়দাতা পরিবর্তন হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগপন্থী কিছু মালিকের গাড়ি ও কাউন্টার অবৈধভাবে দখল করেছে চাঁদাবাজ চক্রটি। টার্মিনালের আশপাশের সড়কে যত্রতত্র পার্কিং করে যনবাহনচলাচলে বিঘ্ন ঘটানো ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে জনমনে অসন্তোষ তৈরির বিষয়টির কোন পরিবর্তন হযনি।
৫ আগষ্ট ২০২৪ মহাখালী বাস টার্মিনাল বন্ধ থাকার পর পুনরায় যখন ৮ আগষ্ট ২০২৪ আবার বাস চলাচল শুরু হয়। সেদিন থেকেই কাউন্টার দখল, বাস দখল, বাস চলাচলে বাধা প্রদান, ভাংচুর এসবের শুরু হয়। এসকল ঘটনায় আহত হয়ে একাধিক ড্রাইভার, স্টাফ এখনো পর্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে।
টার্মিনালে গাড়ীর সংখ্যাও একটা সময় কমতে থাকে ও বেশ কয়েকটি রুট বন্ধ হয়ে যায়। সেসব বিবেচনায় পূর্বের চাঁদার হার কমানো হয়।
গত ১৩ এপ্রিল ২০২৫ , রাত ৮.৩০ এর সময় বনানী থানাধীন মহাখালীবাস টার্মিনালের উত্তর পাশে এনা পরিবহনের কাউন্টার দখল করার জন্য ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল বাতেন ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সেক্রেটারি সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে বিলাস পরিবহনের লোকজন হামলা করলে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের সিটি এসবি বনানী জোনের এএসআই মোহাম্মদ আরিফুল ছবি তুলতে গেলে তাকে বাধা প্রদান করা হয়, পুলিশ পরিচয় দেয়ার পরেও এনা পরিবহনের কর্মীরা তাকে এলোপাথাড়ি মারধর করে। পরবর্তীতে বনানী থানা পুলিশ ঘটনা স্থলে এসে তাকে উদ্ধারকরে কুর্মিটোলা হাসপতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে ।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সিটি এসবি বনানী জোনের এএসআই মোঃ আরিফুল ঘটনাস্থলে গ্রেফতারকৃত এনা পরিবহনের ড্রাইভার মোহাম্মদ খালেক সহ অজ্ঞাত ৭০/৮০জনকে বিবাদী করে বনানী থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন। মামলা নং ১৩, তারিখ-১৪/০৪/২০২৫ ইং, ধারা-১৪৩/১৮৬/৩৩২/৩৫/৫০৬
সাদিকুর রহমান হিরু মহাখালী বাস টার্মিনালের চাঁদা আদায় সিন্ডিকেটের মূল সমন্বয়ক, আওয়ামী সরকারের পুরোটা সময় জুড়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের ছত্র ছায়ায় তিনি মহাখালী বাস টার্মিনালের চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন।
৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়ে বহিস্কৃত বিএনপি নেতা কামাল জামান মোল্লা এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেনের সরাসরি সহযোগিতায় মহাখালী বাস টার্মিনালের চাঁদা আদায় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ জারি রাখেন এই হিরু।
চলমান এই চাঁদা আদায়ের কাজে তাকে সহায়তা প্রদান করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাইফুল ইসলাম, মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি আজাদ, এবং অন্যান্য শ্রমিক নেতারা (সংযুক্ত তালিকা দেখুন)।
এই চক্র বর্তমানে মহাখালী বাস টার্মিনাল কেন্দ্রিক চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।
নীচের তালিকার পাশাপাশি একতা পরিবহন থেকে গাড়ি প্রতি দৈনিক ২০০০ টাকা করে রুট খরচ নামে উত্তোলন করা হয় যা থেকে ১৫০০ টাকা হিরুর সিন্ডিকেটকে দিতে হয়।
একতা পরিবহনের ১০০ গাড়ি থেকে প্রতিদিন ২ লাখ টাকা চাঁদা উত্তোলিত হয় যার থেকে ১.৫ লাখ টাকা হিরুর সিন্ডিকেট পায়। এভাবে প্রতিদিন এই চক্র প্রায় ৫.১০ লাখ টাকার চাঁদা আদায় করছে। যে কোন উৎসবের সময় যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়। এভাবে বছরে ১৮-২২ কোটি টাকার মতো চাঁদা তোলা হয় কেবল এক মহাখালী বাস টার্মিনাল হতে।
এছাড়াও কোন নতুন পরিবহন কোম্পানি টার্মিনালে বাস চালু করতে চাইলে নিয়ে আসলে মালিক সমিতির তালিকাভুক্ত করার নামে রুটের গুরুত্ব অনুযায়ী ২ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হিরুর সিন্ডিকেট নিয়ে থাকে।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ২০ টি বাসের নিয়ন্ত্রণ এখন সাদিকুর রহমান হিরু'র হাতে, এসব বাসের আয়ের সিংহভাগ পলাতক আসাদুজ্জামান খান কামালের নিকট হিরু নিয়মিত পাঠিয়ে যাচ্ছেন।
মন্ত্রী সাহেবের কাছে প্রশ্নঃ
তাঁর ভাষ্যমতে যেহেতু শ্রমিক ও মালিকরা সমঝোতার ভিত্তিতে এই চাঁদা আদায় করে তাঁদের কল্যাণে ব্যয় করে থাকেন, তাহলে —
১. শেষ কবে এই উত্তোলিত চাঁদা কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে সে ব্যাপারে কি কোন ধারণা তাঁর আছে? এসব চাঁদার ব্যয় চিহ্নিত করতে কি আদৌ কোন অডিট করা হয়েছে? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কি আদায়কৃত চাঁদা অডিটের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন?
২. এই চাঁদা সংগ্রহ সাধারণ যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াতের ভাড়ায় যে প্রভাব ফেলে, সেখান থেকে তিনি কিভাবে যাত্রীদের মুক্ত করবেন? এই চাঁদা নিশ্চই হাওয়া থেকে আসেনা? উপার্জিত অর্থ থেকেই পরিবহন মালিকদের ব্যয় করতে হয়।
৩. সরকারী দল বা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন চাঁদা সিন্ডিকেটের নেতৃত্বকে আশ্রয় দেন, তখন সেসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিষয়ে কি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে?
বি.দ্র. সংযুক্ত ইমেজে চাঁদার যে অংক দেখছেন সেটা ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী দেয়া হয়েছে। বর্তমানে চাঁদার হার কত সেটা জানার চেষ্টা চলছে।