26/10/2025
🟫“কফি এবং আফ্রিকান মুসলিমদের এক নিরব কান্না”
এক পরন্ত দুপুরবেলা, যখন তানজানিয়ার এক কফি হাউজে বসে ছিলাম, আর তখনি পেছনের দূরাগত মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছিল আজানের সুমধুর স্বর, সে এক অদ্ভুত, চমৎকার সময়। চারপাশে আফ্রিকান পুরুষেরা বসে গল্প করছিল, কেউ কেউ ঝিমোচ্ছিল কফির ধোঁয়ার ভেতরে, আর একজন বৃদ্ধ বলছিলেন, “কফি মানেই ধৈর্য, এটা তোমাকে অপেক্ষা করতে শেখায়, যেমন সৃষ্টিকর্তা শেখান।”
আমার মনে হলো, এই কফির কাপ শুধু একখণ্ড স্বাদ নয়, এটা একখণ্ড ইতিহাস, একখণ্ড আত্মা, একটুকরো প্রার্থনা। এই কাপের ভেতর লুকিয়ে আছে শত শত বছর ধরে নিঃশব্দে পুড়ে-পুড়ে খাঁটি হয়ে ওঠা আফ্রিকার মানুষদের গল্প, তাদের হারিয়ে যাওয়া নাম, আর ইসলামের ছায়ায় জন্ম নেওয়া এক বর্ণাঢ্য ধারা।
কফির জন্ম তো ইথিওপিয়ার কাফা অঞ্চলে। একবার এক ছাগলপালক, ‘কালদী’.. দেখল তার ছাগলগুলো এক ধরনের ফল খাওয়ার পর অদ্ভুত রকম চঞ্চল হয়ে উঠছে। সেখান থেকেই শুরু। প্রথমে স্থানীয় সুফি সাধকেরা এই বীজের নির্যাস পান করতেন রাতে জেগে প্রার্থনা করার জন্য। কারণ, কফি তাদের জাগিয়ে রাখত। কফি, সেই অর্থে, ছিল এক ধরণের ধ্যান। এক ধরণের ইবাদত।
আর তারপর ধীরে ধীরে ইয়েমেন, মক্কা, কায়রো হয়ে এটি ছড়িয়ে পড়ে গোটা মুসলিম বিশ্বে। ইউরোপ যখন কফিকে শুধুই এক ধরণের “বিকেলের পানীয়” হিসেবে জানল; তখন আফ্রিকান মুসলমানেরা একে জানত ধ্যানের সঙ্গী, জ্ঞানচর্চার সহচর, আর সূফিদের রাতে জেগে থাকার সাথি। আমি সেইসব ইতিহাস নিয়ে ভাবছিলাম, তখন পাশে বসে থাকা আমার গাইড বললেন,
“এই কফিটা দেখছো? এটা আমাদের মাটি থেকে এসেছে। কিন্তু সারা দুনিয়া আমাদের আর মনে রাখেনি”
তাঁর কণ্ঠে ছিল একধরনের হাহাকার, একধরনের মৌন প্রতিবাদ। বর্তমানে নামীদামি সব ক্যাফে, রেস্টুরেন্টে কফির গায়ে যেসব বড় বড় নাম লেখা থাকে, কলোম্বিয়ান রোস্ট, ইতালিয়ান এসপ্রেসো, ফ্রেঞ্চ প্রেস, আমেরিকানো, কাপুচিনো; কিন্তু সেখানে নেই আফ্রিকান মুসলিমদের নাম। অথচ ইতিহাস বলছে, প্রথম কফি হাউজ তৈরি হয়েছিল ওসমানীয় সাম্রাজ্যে। কনস্টান্টিনোপলে, যেখানে পুরুষেরা বসে কফির সঙ্গে আলোচনা করত রাজনীতি, ধর্ম, সাহিত্য। এইজন্যেই...
“কফি হাউজগুলো একসময় 'জ্ঞানীদের বিদ্যালয়' নামে পরিচিত ছিল”
আজকের ক্যাফেগুলোর “মোডার্ন ল্যাটে” বা “ক্যারামেল ম্যাকিয়াটো” কফি গুলোতে সেই আগেকার আমলের মতন জ্ঞান নেই, ধ্যান নেই, এমনকি গভীরতাও নেই। তবু, সেই আফ্রিকান কফি হাউজে এক দুপুরে বসে, আমি টের পেয়েছিলাম, এই কাপের ভেতরে সময়ের দীর্ঘশ্বাস জমে আছে।
“জানেন, কফি আর ইসলামের সম্পর্কটা কত গভীর.........??”
ইতিহাসে যাকে “ক্বাহওয়া” বলা হতো, সেটাই আজকের কফি। এই শব্দের শিকড় আরবিতে, যার মানে, 'এক ধরনের উত্তেজক পানীয়', কিন্তু অনেক সুফির মতে এর মানে ছিল আত্মার এক ধরণের জাগরণ ইয়েমেনের সুফিরা রাতভর জিকির করতেন, ধ্যানে বসতেন, আর পাশে থাকত কফির পেয়ালা। তাদের বিশ্বাস ছিল, আল্লাহর নাম স্মরণ করতে হলে শরীরকেও সচল রাখতে হয়। কফি ছিল সেই সাধনার শরীরঘনিষ্ঠ অংশ। এমনকি প্রথম কফিশপ তৈরি হয়েছিলও মুসলিম দুনিয়ায়। ১৪৭৫ সালে কনস্টান্টিনোপলের ‘কিভা হান’ নামের দোকানটিকে ধরা হয় ইতিহাসের প্রথম পাবলিক কফি হাউজ। সেখানে একসঙ্গে বসতেন দার্শনিক, ব্যবসায়ী, ধর্মতাত্ত্বিক, কবি, আরও কত মানুষ। তারা কফির পেয়ালার ধোঁয়ার ভেতরে খুঁজতেন সমাজের জটিলতা, রাজনীতির ধাঁধা, ঈশ্বরের ছায়া। পাশ্চাত্য দুনিয়া তখনও জানত না কফির গন্ধ কেমন। তখনও ইউরোপের মানচিত্রে কফি ছিল 'মুসলমানদের পানীয়'। এমনকি রোমান ক্যাথলিক চার্চ একসময় কফিকে “শয়তানের পানীয়” বলে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল। পরে পোপ ক্লেমেন্ট নিজে এক কাপ কফি খেয়ে বলেছিলেন,
“এই শয়তানের পানীয় এতই সুস্বাদু… শুধুমাত্র অবিশ্বাসীদের একচেটিয়া মনোভাবে এই পানীয় ছেড়ে দেওয়াটা দুঃখজনক হবে”
কফি তখনও পুরোপুরি ছিল পূর্বের জিনিস। আর আফ্রিকার বুকেই ছিল তার জন্ম। ইথিওপিয়া, যেখানে অরণ্যের ভেতর গেরিলা লড়াইয়ের মতো মাথা তুলে উঠত কফির বুনো গাছ; সেখানেই কফি প্রথম প্রাণ পেল। আর মুসলমানরাই তাকে প্রথম ভালোবাসা দিল। তবু আজ ইতিহাসের গায়ে এই আফ্রিকান মুসলমানদের নাম নেই। আমরা জানি ‘ব্রাজিলের কফি রপ্তানি’, আমরা শুনি ‘ক্যালিফোর্নিয়ার স্পেশাল রোস্টারির’ গল্প; কিন্তু এই কফি পান করার প্রথার শুরুটা হয় আফ্রিকান দেশ থেকে। তখন এটি ছিল রাতভর ধ্যান, সুফিবাদের প্রার্থনা আর জিকিরের সঙ্গে যুক্ত। আসলে এই গল্পটা একটি “নীরব উত্তরাধিকার”, যা আফ্রিকার কৃষক, মাটি, মানুষের রক্ত, প্রার্থনা আর ইতিহাসের কিছু ভুলে যাওয়া নামের সঙ্গে ঘুরপাক খায়।
তানজানিয়ার রাজধানী দার এস সালামের এক কফি হাউজে আমি আর আমার গাইড বসে ছিলাম; এবং আমার গাইডের চোখে যখন আমি তাকালাম, তার দৃষ্টিতে যেন দেখলাম এক নিঃস্ব পুরনো রাজা, যার প্রাসাদ অন্য কেউ দখল করে নিয়েছে। তিনি বললেন,
“এখন সব মানুষ ফ্যাশনের মতো চুমুক দেয় কফিতে। কিন্তু আমাদের জন্য এটা ছিল আত্মা, এক ধরণের ইবাদত”
আমি কাপটা হাতে নিলাম। আর টের পেলাম, সত্যিই, এটা শুধু কফি নয়, এটা 'একটা সভ্যতার চুমুক'। তানজানিয়ার আকাশে তখন হালকা রোদ, কিন্তু বাতাসে লেগে ছিল মেঘের গন্ধ। আমি কফি হাউজের কোণার টেবিলে বসে জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম, যেখানে সাদা জামাকাপড় পরে হেঁটে যাচ্ছিলো একজন শিশু, হাতে ছিল সাইকেলের চাকা। দূরে কোথাও আজান হচ্ছিল, ভেসে আসছিল কিছু পাখির ডাক। কফির কাপটা ঠোঁটে তুলে আমি হঠাৎ করেই খুব পুরোনো একটা জিনিস মনে করতে চাইলাম, আমার প্রথম কফি। না, সেটা কোনো রোমান্টিক জায়গা ছিল না; সেটা ছিল শীতলক্ষ্যার পাড়ে বসে, পুরান ঢাকার এক বন্ধুর সাথে ভাগ করে খাওয়া এক কাপ দুধ-কফি, যার স্বাদে যতটা না ছিল ক্যাফেইন, তার চেয়ে বেশি ছিল সন্ধ্যার আলস্য, বন্ধুত্বের নির্ভরতা, আর কৈশোরের প্রথম হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা। জীবনে যতবার আমি সত্যি সত্যি কফির স্বাদ পেয়েছি, সেটা শুধুমাত্র জিভে ছিলো না, ছিলো পাঁজরের নিচেও। কফি যদি শুধু জিহ্বার অভিজ্ঞতা হতো, তাহলে তাকে নিয়ে এত কথা বলার কিছু ছিল না। কিন্তু কফি হচ্ছে এমন এক জিনিস, যা কখনও প্রার্থনার মতো, কখনও প্রেমের মতো, কখনও বা বিষাদের মতো করে গায়ে লাগে। যারা দীর্ঘ একাকীত্ব জানে, নিরবতা পছন্দ করে, নিজের মতন করে থাকতে এবং বাঁচতে পছন্দ করে, সবার থেকে আলাদা একা চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে.. তারা বুঝে কফির গন্ধ কেনো এরকম নিরবতা এবং এক প্রকার হাহাকারের কথা বলে।
তানজানিয়ার এই কফি হাউজে বসে আমি হঠাৎ অনুভব করি, এখানে সময় বয়ে যায় না, বরং স্মৃতি জমে থাকে। কফির কাপ শেষ হয়, কিন্তু সময়ের ভেতরে সেই চুমুকটা রয়ে যায়, ঠোঁটের ভাঁজে, নিঃশ্বাসের ঘ্রাণে, মগের গায়ে লেগে থাকা এক বিন্দু কফির ছাপের মতো। পাশের টেবিলে কেউ হাসছে, কেউ পত্রিকা পড়ছে সুহেলি ভাষায়, আর দূরের রাস্তায় একটা ছেলের সাইকেলের বেল বাজছে হঠাৎ করে। আমি বুঝতে পারি, এই কফি শুধু আফ্রিকার নয়, এই কফি আমার, আপনার, সবার। এই কফির প্রতিটা চুমুকে আমি শুনতে পাই অতীতের কোনো ক্ষীণ শব্দ, মায়ের চায়ের কাপ নেড়ে দেওয়া চামচের টুংটাং, কিংবা বাবার গভীর রাত অবধি পড়ার টেবিলে পড়ে থাকা থার্মাস। আমি বুঝতে পারি, এই কফি একটা স্বাদ নয়, একটা প্রতিধ্বনি। একটা হারিয়ে যাওয়া সময়, যা প্রতিবার ঠোঁট ছোঁয়ালেই ফিরে আসে।
তানজানিয়ার সেই কফি হাউজে বসে আমি হঠাৎ নিজেকে দেখে ফেলি যেন আয়নার এক বিপরীত পাশে। আমার সামনে রাখা কাপের ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে চলে আসে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার এক ভোর, কুয়াশায় ঢাকা। শীতের সকালে, বাসার বারান্দায় বসে আম্মু রুটির সঙ্গে গরম দুধ-কফি দিতেন, কফির রঙটা হালকা, কিন্তু গন্ধটা ভারী ছিল। তখন আমি জানতাম না ‘ক্যাফেইন’ কী, ‘অ্যাসিডিক নোটস’ কাকে বলে?, বা বারিস্তা কীভাবে কফির জন্য দুধকে নরম ফেনা বানিয়ে দেয়। তখন কেবল জানতাম, এই কফির গন্ধ মানে ‘আমার বাড়ি’, এই স্বাদ মানে, ‘আমার আম্মুর হাতে বানানো এক কাপ কফি’।
আর এখন?
“এখন কফির কাপ সামনে এলেই আমি একটু ভয় পাই”
কারণ এই কাপটা সময়ের মতো, কখনও মিষ্টি, কখনও তেতো, আর কখনও এমন একটা অনুভূতি জাগায়, যেটার নামই আমি ঠিকমতো বলতে পারবো না। তাছাড়া কফির ভিতর জমে থাকে আমার দেখা না হওয়া মানুষদের মুখ, লেখা না হওয়া চিঠির লাইন, ফেরত না আসা ভ্রমণপথ। আমি একেক চুমুকে শুনতে পাই নিজের হারিয়ে যাওয়া অংশগুলোর হাহাকার, যারা আমাকে ছেড়ে গেছে, অথচ, তারা ছেড়ে গিয়েও আমার ভিতরেই থেকে গেছে।
তখন বিকেল ৪টার মতন বাজে। কফি হাউজে আমি এবং আমার গাইড বসে আছি আর গল্প করছি; ঠিক তখনি, সেই ক্যাফেটার ভিতর ঢুকেছিল একটা যুবক, তার পরনে ছিল ছেঁড়া জার্সি, চোখে ছিল ক্লান্তি আর কপালে একরাশ স্বপ্নহীনতা। কফির দাম জিজ্ঞেস করে ফিরে গেলো চুপচাপ, হয়তো তার পকেটে শুধু এক টুকরো পাউরুটির খরচই ছিল। আমি তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে অনেকক্ষণ। ভাবলাম, বর্তমানে এই কফির কাপটা কি সত্যিই আমাদের সবার জন্য? নাকি এটা এখন শুধুই এক শ্রেণির আধুনিকতা, এক বিশেষ গোষ্ঠীর রুচিবোধের পরিচায়ক হয়ে গেছে?
আমার সামনে তখন এক কাপ ব্ল্যাক কফি, কোনো দুধ নেই, চিনি নেই, মুছে ফেলা হয়নি তেতোভাব। সেই কফির দিকে তাকিয়ে আমি ভাবি, আমাদের জীবনও কি ঠিক এইরকমই? আমাদের সবার দিনগুলো কি আসলে একেকটা ব্ল্যাক কফি, যেখানে যে যার মতো করে খুঁজে নিচ্ছে নিজস্ব উষ্ণতা?
আমি চুমুক দিই, চোখ বন্ধ করি। ধীরে ধীরে সেই গন্ধ আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আরও পুরোনো দিনে। এক বিকেলে, এক বইমেলায়, যখন আমি একটি মেয়ের সঙ্গে হাঁটছিলাম হাত ধরাধরি করে, তখন আমরা দু’জনে একসাথে কফি খেয়েছিলাম, স্টাইরোফোম কাপের ভিতর ঢেলে দেওয়া উষ্ণ কিছু। মেয়েটির ঠোঁটে লেগে ছিল কফির ফেনা, আমি চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম, কিছু বলিনি। সেই মুহূর্তটা যেন এখনও আমার গলায় আটকে আছে।
“আজ এত বছর পর সেই কফি কি আবার ফিরিয়ে আনতে পারবে সেই মেয়েটির হেসে উঠা?”
“হয়তো না।”
কিন্তু সে স্মৃতি থেকে আজ আমি পালাতে পারছি না। কারণ কফি কখনওই কেবল একটি পানীয় নয়, এটি একটি দরজা, যা খুললে ভেতর থেকে উঠে আসে আমাদের লুকিয়ে রাখা অতীত।
সেই তানজানিয়ান দুপুরে, কাঠের জানালার ফাঁক দিয়ে ছেঁকে আসা আলো আর কফির ধোঁয়ার ভিতর একসময় আমি একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে গেলাম। চারপাশে কেউ ছিল, অথচ কেউ ছিল না। এমন এক নিঃসঙ্গতা, যা মানুষের ভিড়ে আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এই বোধটা আগে কোথাও হয়েছিল কি? মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে, ঢাকার ধানমণ্ডির এক ক্যাফেতে একবার বসে ছিলাম, জানলার ধারে, ঠিক এমন বিকেলে। তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম, কিন্তু বুঝতে শিখেছিলাম, কফি শুধু একধরণের পানীয় নয়। বরং মানুষের জীবনের প্রত্যেকটা অধ্যায়ের সাথে কফি জড়িত।
আসলে, প্রেমিকেরা খুব কমই কফি পায়। তারা পায় চা, যেখানে দু’জনের ভাগ থাকে, ঠোঁটের ছাপ থাকে, চুমুকের শব্দে একটা বোঝাপড়া থাকে। কিন্তু যারা হারিয়ে গেছে, ছেড়ে এসেছে, ভুলে গিয়েছে বা ভুলে যাওয়ার ভান করছে, তাদের হাতে কফির কাপ থাকে। আর সেই কাপে চুমুক দেয়ার মানে হলো, নিজেকে একটু একটু করে ফিরিয়ে আনা, কিংবা নিজের ভিতরে নেমে আসা অন্ধকার এক ঘর, যার দরজা নেই, কেবল জানালায় হালকা আলোর রেখা। আমি জানি, এমন বহু মানুষ আছে যারা কোনোদিন কাউকে বলে না, তারা একা। কিন্তু তারা প্রতিদিন এক কাপ করে কফি খায়। অফিসের ডেস্কে, ট্রেনের জানালায়, বাসার বারান্দায় বা পুরোনো কোনো কলেজ ক্যাম্পাসে। সেই কফি তাদের কারো হয়ে ওঠে না, তবু তারা খায়। কেন? কারণ কফি সেই অনুভূতিগুলোর জন্য বানানো, যাদের ভাষা নেই। কফি সেই কান্নার মতো, যা গলা দিয়ে বের হয় না, কিন্তু বুক ভিজিয়ে ফেলে।
তানজানিয়ার সেই কফি হাউজটার কোণায় বসে আমি তাকিয়ে থাকি এক বৃদ্ধ দম্পতির দিকে। তারা দুজনেই নীরবে কফি খাচ্ছেন, কেউ কারও দিকে না তাকিয়ে। অথচ তাদের ভিতরে যে শান্তি, তা এতটাই গভীর, যেন পৃথিবীর শেষ কফির দানা তারাই একসঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে। কেউ কথা বলছে না, কেউ হাসছে না, তবু তাদের পাশে বসে আমি অনুভব করি, এই পৃথিবীতে সব প্রেমের শেষ ঠিকানা আসলে নীরবতা। কফির মতোই, যা ঠান্ডা হলেও তার গন্ধ থেকে যায়, যা তেতো হলেও তাতে এক ধরনের মায়া থাকে।
আমি নিজের কাপের দিকে তাকাই। তাতে এখনো অল্প কফি রয়ে গেছে। এই অল্পটুকু কফির ভিতর আমি দেখতে পাই এক হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর চিঠি, সেই মেয়ে যার চোখের ভেতর আমি এক সময় নিজের শান্তি খুঁজতাম, এমনকি দেখতে পাই সেই পুরোনো শহরটাকেও, যেখানে বিকেলে ছোট দোকান থেকে ভেসে আসত জিনজার কফির গন্ধ।
কফির কাপ শেষ হয়ে আসে, আমি শেষ চুমুকটা দিই। জানি, এই কাপটা ফুরিয়ে গেলে হয়তো আবার ফিরে যেতে হবে সেই পৃথিবীতে, যেখানে সবাই তাড়াহুড়োয়, সবাই ক্লান্ত, কেউ কারও কথা শোনে না। কিন্তু এই এক কাপ কফি, এই কয়েক মুহূর্ত, এই নিঃশব্দ বিকেল, আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি একা নই। আমার মতো আরও কেউ, কোনো এক দূর শহরে, এখনই হয়তো বসে আছে এক কাপ কফি হাতে…
…ভেতরে মেঘ জমে আছে তারও”
কখনো কখনো আমার মনে হয়, পৃথিবীর সব ক্যাফে আসলে একটাই ক্যাফে, শুধু জায়গা বদলায়, দেয়ালের রঙ বদলায়, নাম বদলায়, কিন্তু আবহটা ঠিক একই থাকে। সেই অদ্ভুত ধরণের নিস্তব্ধতা, সেই অল্প আলো-অন্ধকার, সেই কাঠের টেবিলের উপরে রাখা ব্যবহৃত কাপ, আর সেই চেয়ারে বসে থাকা কিছু মানুষ, যারা কথা বলে না, তবু তাদের চোখে থাকে একরাশ অসমাপ্ত বাক্য।
“তানজানিয়ার সেই ক্যাফেতে বসে আমার মনে হয়েছিল, আমি কি তবে আগেও এসেছি এখানে?”
হয়তো কোনো জন্মান্তরে, হয়তো কোনো স্বপ্নে। জানালার পাশে যে গাছটা ছিল, তার ছায়া পড়ে যাচ্ছিল আমার টেবিলের উপর, ঠিক যেমনটা পড়ে একটা নির্দিষ্ট বিকেলে ঢাকার কোনো এক ক্যাফেতে, যেখানে আমি আর আমার ছোটবেলার বন্ধু শেষবার বসেছিলাম। সে এখন কানাডায় থাকে, আর আমি এখানে। কিন্তু আমি জানি, যদি আজ রাতে ওর হাতেও কফির কাপ থাকে, তাহলে আমরা আবার একই সময়ের ভেতর পড়ে যাব, ভৌগোলিক দূরত্বের বাইরে, কিন্তু এক ঘ্রাণের বন্ধনে।
কফির এই আশ্চর্য ক্ষমতা আছে....
সে দূরত্ব মুছে দেয়,
সে অতীত ফিরিয়ে আনে,
সে অনুপস্থিতদের ঠোঁটের তাপ ছুঁইয়ে দেয় আবারও।
আমি অনেকদিন পর বুঝি, আমার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা আসলে বলা হয়নি। তারা রয়ে গেছে ঠোঁটের ধারে, ঠিক যেমন অর্ধেক চুমুক ফেলে রাখা কফি। বলা হয়নি “ভালোবাসি”, বলা হয়নি “থাকো”, এবং, কখনো কাউকেই বলা হয়নি “তোমার চলে যাওয়া আমাকে এখনও পোড়ায়”। কফির কাপ ধরলে তাই আমার বুক ভার হয়ে ওঠে, কেননা তার ধোঁয়ার ভিতর আমি দেখতে পাই সেইসব কথা, যেগুলো শুধু শুনতে চেয়েছিল কেউ, কিন্তু এখন ও আর নেই।
সেই ক্যাফের এক কোনায় আমি এক বৃদ্ধকে দেখেছিলাম, তার সামনেও ছিল এক কাপ কফি। তিনি কাপের দিকে তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ, তারপর আস্তে করে বলেছিলেন, “উনার স্ত্রী খুবই উষ্ণ কফি খেতে পছন্দ করতেন”
আমি চমকে উঠেছিলাম। তিনি আর কিছু বলেননি, শুধু ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। যেন সেই ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে তিনি ছুঁয়ে ফেলছেন এক অনুপস্থিত নারীকে, যার ঠোঁটে গরম কফি লাগলে সে হালকা শিস দিয়ে বলত
“আহা!”
কোনো কবিতা কি পারে এমন স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে?
কোনো ছবি কি পারে এমন এক মুহূর্তকে জীবন্ত করতে?
কেবল এক কাপ কফিই পারে।
তানজানিয়ার সেই বিকেলটা আমার ভিতরে ঢুকে আছে আজও। যখন বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল, আর আমি জানালার পাশে বসে কফির গন্ধে খুঁজে নিচ্ছিলাম আমার ভাঙা অংশগুলো, যেগুলো এখন হয়তো একজন মানুষ হয়ে গেছে, কিংবা কেবল এক শূন্য চেয়ার।
তানজানিয়ার সেই ক্যাফে এখন আমার চোখে কেবল এক কফি হাউজ নয়, ওটা যেন এক সুফিবাদের ঠিকানা, যেখানে সময় একটু থেমে যায়, আর মানুষ নিজেকে ছুঁয়ে দেখে নতুন করে। সেই বিকেলটায় আমি কফির কাপ হাতে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। বাইরে হালকা বাতাস, মাঝে মাঝে বৃষ্টির গন্ধ, আর জানালার পাশে রাখা একটা রেডিও থেকে বাজছিল সাড়ে পাঁচ দশকের পুরোনো জ্যাজ, “মাইলস ডেভিস, নিঃশব্দে বাজিয়ে যাচ্ছিল মন ভাঙার অনুশীলন”
একসময় ক্যাফের দরজা খুলে ঢুকেছিল এক তরুণী। তার চোখে ছিল ক্লান্তি, হাতে ছিল একটা নোটবুক, আর পরনে ছিল বাদামি কুর্তা। মেয়েটি কাউন্টার থেকে কফি নিয়ে আমার উল্টো দিকের টেবিলে বসল। আমি তাকে চেনার ভান করিনি, অথচ মনে হচ্ছিল যেন তাকে কোথাও দেখেছি। অথবা হয়তো আমরা সবাই একটু একটু করে একইরকম হয়ে যাই, যারা একা বসে কফি খেতে পছন্দ করে
সে বসে বসে লিখছিল কিছু, হয়তো চিঠি, হয়তো কবিতা, হয়তো কেবল নিজের ভাঙা মনকে সেলাই করে যাচ্ছিল শব্দ দিয়ে। তার নীরবতা আমার দিকে এসে লাগছিল, যেমন কফির গন্ধ এসে লাগে শূন্য দুপুরে। আমি এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করলাম। মনে হলো, ঢাকার সেই পুরোনো বিকেলগুলো ফিরে এসেছে।
অমুক ক্যাফেতে বসে লিখতাম আমিও, জানালার পাশেই, আড়চোখে তাকিয়ে থাকতাম কাউকে, যাকে বলা হয়নি কোনোদিন,
"তুমি আমার গল্পের পাতার বাইরে থাকলেও, সবটুকুই আসলে তোমাকে নিয়েই”
আমি কফির দিকে তাকিয়ে আবার ভাবি, কেন এই এক পানীয় এত অনুভূতি জাগিয়ে তোলে? চা তো তা করে না।
পানিতো তো কেবল তৃষ্ণা মেটায়। তবে কফির মধ্যে এমন কী আছে যা আমাদের চোখের কোণে কুয়াশা এনে দেয়? হয়তো কারণ, কফি কখনো একা থাকে না, সে সঙ্গে করে নিয়ে আসে একটা জায়গার গন্ধ, একটা মুখের স্মৃতি, একটা বিকেলের ছায়া, একটা হারিয়ে যাওয়া কথার রেশ।
আমার কাপটা শেষ হওয়ার আগেই আমি বুঝি, এই ক্যাফেটা, এই মানুষগুলো, এই নিঃশব্দ গান, সবকিছু আসলে ঠিক যেমন থাকার কথা ছিল, সেইরকমই৷ আর হয়তো, ঠিক এই কারণেই আমি এখানে এসেছি, তানজানিয়ায়, এক নিঃশব্দ দুপুরে, জীবনের সেই না-বলা অধ্যায়টা একটু ছুঁয়ে দেখতে।
তানজানিয়ার সেই ক্যাফেতে আমার কফির কাপ একসময় একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়। তবু আমি কাপটা নামিয়ে রাখি না। তার তলানিতে যেটুকু কফির দাগ জমে থাকে, সেটা দেখেই যেন আমি কিছু ভাবতে থাকি। আসলে সব কফির কাপই একেকটা গল্প, শেষ চুমুক মানেই শেষ অধ্যায় নয়। অনেকসময় সেই ফাঁকা কাপেই থেকে যায় সবচেয়ে বেশি কথা।
এক জীবনে আমরা কত কিছুই তো শেষ করে ফেলি, একটা সম্পর্ক, একটা শহর, একটা বিকেল, একটা গান, আরো কতো কিছু। কিন্তু কিছু জিনিস কখনোই পুরোপুরি শেষ হয় না, কফির মতোই তারা থেকে যায়, তলানিতে, গন্ধে, স্পর্শে। আমরা চলে যাই, কিন্তু তারা রয়ে যায় আমাদের ভিতরে। কখনো মনে হয়, যদি এই ক্যাফে ছেড়ে চলে যাই, তবু আমার ভেতরে থেকে যাবে এখানকার জানালাটা, বাতাসের শব্দ, মেঝেতে পড়া রোদের ছায়া, আর সেই পুরোনো রেডিওর জ্যাজ মিউজিক।
এমনভাবে থেকে যাবে, যেভাবে প্রথম প্রেম থেকে যায় কারও চোখে, যা সে ভুলে যায়, কিন্তু হারায় না।
আর কফি?
সে তো থেকে যায়। স্মৃতির মতো, এক ফোঁটা কান্নার মতো,
অথবা, কোনো এক অচেনা মেয়ের রেখে যাওয়া নোটবুকের ভাঁজে লেখা কবিতার মতো; যা তুমি কোনোদিন খুলে দেখো না, তবু বুকের ডানদিকে তার ভার অনুভব করো।
আমার খুব ইচ্ছে হয়, একদিন ফিরে আসব এখানে। তানজানিয়ার সেই ক্যাফেতে, জানালার ধারে। হয়তো তখন কেউ থাকবে না চেনা, কেউ আর চিনবে না আমায়, তবু আমি একটা কফির কাপ হাতে নেব, বসে পড়ব সেই পুরোনো টেবিলটায়, আর চুপচাপ অপেক্ষা করব, যদি কোথাও থেকে ফিরে আসে কোনো গন্ধ,।যদি বাতাসে ভেসে আসে সেই পুরোনো দিনের এক চুমুক কফি। আর যদি সেখানে লুকিয়ে থাকে আমার পুরোনো আমি।
তখন আমি চোখ বন্ধ করব। আর, নিজেই মনে মনে বলবো,
“এই তো, আমি আছি। আমি এখনো সেই কাপটা রেখেছি, যেটাতে তুমি শেষ চুমুকটা নিতে পারোনি।”
📍Dar es Salaam, Tanzania
Sadman Sakib Ayon
21-7-2023