15/01/2026
অবশেষে বিদেশ !
দুই সপ্তাহ আগে আমার এক বন্ধু পরিমল শিকদার ফেসবুকে লিখল—“বন্ধুরা, চলে যাচ্ছি। ভালো থেক।” তার বন্ধুরা এমনভাবে কমেন্ট করতে শুরু করল, যেন কেউ মারা গেছে—“আলহামদুলিল্লাহ”, “ভালো থেকো”, “দোয়া রইল”ইত্যাদি, ঠিক যেমন হাজারে হাজার “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” লেখা হয় মৃত্যুর খবরে !
আজ আরেক বন্ধু মনোয়ার হোসেন লিখল—“বিদায় বাংলাদেশ, ভালো থেকো সবাই ।” সেখানেও একই আবেগঘন বিদায়বেলা। কেউ লিখছে, “স্যার, দোয়া করি ভালো থাকবেন”, কেউ লিখছে, “একেবারে চলে যাচ্ছেন নাকি?”, কেউ আবার সোজাসাপ্টা—“ভালো থাকিস, আর ফিরিস না।”
এরই মধ্যে গতকাল শুনলাম, আমার এক ক্লাসমেট, যিনি একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রীসংস্থার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তিনি এখন DAE (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর)-এর প্রধান। সব খবরই ভালো। সবাই মেধাবী, সবাই এগিয়েছে, এ নিয়ে গর্বই হয়। কিন্তু বিষয়টা সেটা না !
বিষয়টা হচ্ছে, সময় বদলায়। মানুষ বদলায়। একই দিনে কোথাও দাফন হয়, আবার কোথাও বাসরঘর সাজে !
হাসিনার আমলে এক জেলা প্রশাসকের (বন্ধু) বাংলোয় গিয়েছিলাম। অহংকারে আমাকে সময়ই দেয়নি। উল্টো বলেছিল,
“তোরা বিদেশে গিয়া কার বাল ফালাইসছ ? কী করলি বিদেশে গিয়া ?” অথচ, বন্ধু কিন্তু ডিসি !💪
আমি উত্তরে বলেছিলাম,
“যারা সারাজীবন গুয়ের মধ্যে থাকে, তারা কখনো গুয়ের গন্ধ পায় না, রে পাগলা।”
গত বছর শুনি, সেই ডিসি মহোদয় বালবাচ্চা নিয়া নিজেই বিদেশে পালিয়েছে !🤠
আমার নিজের সংসারেও এই “বিদেশ-দেশ” নিয়ে তর্ক চলে। আমার স্ত্রী বলে, “আমার বোনদের ছেলেমেয়েরা দেশে থেকে কত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে। আর আমাদের বাচ্চারা বিদেশে জন্ম নিয়ে না হচ্ছে মুসলিম, না হচ্ছে অমুসলিম; মানে, আধাদোচা অবস্থা !🤠
আমি তাকে সান্ত্বনা দিই—
“শোনো, হ্যাগোর পোলাপানগুলাও তো শেষমেশ বিদেশেই পাঠান লাগবো যে ! না পাঠাইলে তারা হবে একেকটা “হাদি”, হবে একেকটা “সারজিস” আর বলবে, “শাউয়া-মাউয়া সব ছিঁড়া ফালাইতে হইবো !”
হ্যাঁ, বলছিলাম- অবশেষে বিদেশ !😢
ক্ষমতায় যেতে বিদেশ।
টাকা রাখতে বিদেশ।
উচ্চশিক্ষায় বিদেশ।
পালাতে গেলে বিদেশ।
চিকিৎসায় বিদেশ।
প্রযুক্তিতে বিদেশ।
হাত পাততে বিদেশ।
তাহলে দেশে কী আছে ? কি থাকবে ?
দেশে আছে, থাকবে- মসজিদ, মাদ্রাসা, বলাৎকার, খুন, আগুন, ওয়াজ, সালাফি, হেফাজত, জামায়াত, আজহারী, আমির হামজা, ৫০১, আহমাদুল্লাহ, ফুয়াদ, হাসনাত, জারা, নির্বাচন—আর অন্তহীন হইচই !
আমার এক ধার্মিক বন্ধু কানাডায় সেটেলড। সে ওখানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে । ফেসবুকে সহকর্মীদের সাথে ছবি দিয়েছে; সবাই নারী-পুরুষ মিলে, স্বাভাবিক পোশাকে। অথচ বাংলাদেশে সে প্রতিষ্ঠা করেছে মা-মেয়ের নামে একটা মাদ্রাসা, যেখানে শিশুদের ড্রেসকোড হচ্ছে সৌদি পোশাক !
গত বছরে অনিয়মিত পথে ইউরোপে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে শীর্ষে বাংলাদেশিরা। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা আর ইউরোপীয় সীমান্ত রক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্স—দুটোরই তথ্য তাই বলে।
মানে দাঁড়াল কী ?
নিজের দেশকে সবাই মিলে আফগানিস্তান বানাবো, কিন্তু নিজের গন্তব্য হবে ইউরোপ-আমেরিকা ?
আমেরিকায় বসবাসকারী অনেক বাংলাদেশিকে দেখি, ফেসবুকে বসে দেশে ইসলামিস্ট সরকার কায়েমের জন্য নিয়মিত ওয়াজ-নসিহত চালাচ্ছে। কিন্তু নিজেরা দেশে ফিরবে না। কারণ কী ?
কারণ, “ওখানে নিরাপত্তা বেশি”,
“ওখানে জীবনযাত্রার মান ভালো”,
“সন্তানদের ভবিষ্যৎ ওখানেই নিরাপদ।”
অথচ যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশি পরিবারের ৫৪.৮ শতাংশই সরকারি সহায়তায় চলে। সেই সরকার তালেবান সরকার না, গাজায় বোমা পড়ার পেছনের মদদদাতা সরকার। কিন্তু তারা সেই সরকারি সুবিধা নেবে, আবার ফেসবুকে বসে আমেরিকান পণ্য বর্জনের ডাক দেবে ! 🤠
দেশে বলবে—“ইসলামী শাসন চাই।”
আর নিজেরা থাকবে—অমুসলিম রাষ্ট্রের করুণায় !
তারেক জিয়া দেশে ফিরেছেন, তাকে দেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। বিদেশে তিনি নাকি ফ্রি স্টাইলে চলাফেরা করতেন—গার্ড লাগত না। তার মেয়ে বিদেশে খোলা মাথায় ঘুরলেও দেশে এসে মাথায় কাপড় দিল—এতে দেশের মানুষ খুব খুশি হলো ।কারণ, তিনি নাকি ভবিষ্যৎ দেশনেত্রী—ধার্মিক হবেন । বাংলাদেশের মানুষ ধার্মিক চায়, যোগ্য নেতা নয়; সে হোক কারোর বউ বা মেয়ে ! 🤠
সব মিলিয়ে মর্মকথা একটাই—
বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা নিজেরা উন্নত, নিরাপদ, মানবিক জীবনের জন্য অমুসলিম দেশ বেছে নেয়। আর দেশের মানুষের জন্য তারা চায় ধর্মীয় শাসন, কড়াকড়ি, শরিয়া, আফগানিস্তানি ভবিষ্যৎ।
নিজেদের জীবনের জন্য ইউরোপ।
আর দেশের মানুষের জন্য কাবুল।
এই দ্বিচারিতার নামই বোধহয় আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নৈতিক সংকট ! কি বলেন ?
⸻
ড. শাহ্ সুফি ফকির চাঁদ জগৎপুরী রাহিমাহুল্লাহ,
জাপান থেকে ॥