01/10/2026
এদেশের নির্দিষ্ট একটা শ্রেণীর মানুষের যে সিভিক সেন্স কত টা কম সেটা ৯ দিন সরকারি হাসপাতালে থেকে রিয়েলাইজ করলাম। এদেশের মানুষ যে এখনো এতো বন্য রয়ে গেছে সরকারি হাসপাতালে কয়েক রাত না কাটালে আমি সত্যি কখনো জানতাম না কারণ আমার ব্যক্তিজীবনে এই লেভেলের মানুষ দের সাথে আসলে আমার উঠাবসা নাই, তাই এরা যে এক্সিস্ট করে আমি জানতাম ও না। আমার ধারণা ছিলো কোভিডের পর কমবেশি সবাই ই হাইজিন জিনিস টা কে সিরিয়াসলি নিয়েছে।
হাসপাতালের অনেক অনেক ঘটনার মধ্যে কয়েকটা ঘটনা বলি জাস্ট।
ঘটনা ১: একদিন টয়লেটে গেছি। দুইজন ফিমেইল, রিলেটিভ হবেন হয়তো। একজন টয়লেট থেকে বের হতে হতে বলতেছে, " ইশ রে জুতা ডা ভিজ্জা গেছে গা "। সাথে সাথে তার সাথের মহিলা বলতেছে, " আরে গাধা, তুই নিজের জুতা নিয়া আইছোস ক্যান, অন্য কারো জুতা পইড়া আইবি বাথরুমে "। কথোপকথন শুনে আমি কিছু সেকেন্ড স্টান্ড হয়ে জাস্ট দাঁড়ায় ছিলাম!
ঘটনা ২: ICU তে আমার পাশের বেডের একজন বেডে বসে বসে নখ কাটতেছে, তার বাচ্চা বেডে শুয়ে আছে। এবং এরপর সে সেটা ক্লিন ও করে নাই। 😑
ঘটনা ৩: একটা বাচ্চা কিছুক্ষণের মধ্যে এক্সপায়ার করবে। ডাক্তার রা আমার পাশে দুইটা বেডের পেশেন্ট দের সরিয়ে দিয়ে একটা বেডে বাচ্চা টা কে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করতেছে। ( ছবি দিয়েছি ) বাচ্চার মা পাশে দাঁড়ায় কানতেছে। আমি আমার বেডে বসে বসে কানতেছি। বাচ্চার দাদি এসে যেই বেডে বাচ্চার উপর ট্রিটমেন্ট চলতেছে, সব ডাক্তার নার্স দের ভীড় ওখানে। ওখানে মাঝে গিয়ে ঢুকে বলতেছে, " ঢাকনা ডা কই, এহানেই না আছিলো "
আমি ডাক্তার হইলে ঐ মুহুর্তে বেটি রে ধরে উত্তম মধ্যম দিতাম। 😐
ঘটনা ৪: ICU তে একটা ফ্রিজ আছে কমন৷ যেই ঔষধ গুলো নষ্ট হয়ে যায় দ্রুত সেগুলো রোগী রা এই ফ্রিজে রাখে প্যাকেটে বাচ্চার নাম, বেডের নাম লিখে। সকালে নাস্তায় হসপিটাল থেকে পাউরুটি, কলা, ডিম দেয়। এক বাচ্চার মা গিয়ে কলা আর ডিম ফ্রিজে রেখে আসচ্ছে সে পরে খাবে 😫
ঘটনা ৬: ইমানার ভাইরাল ডাইরিয়া চলতেছে। তো গতকাল ওকে ডাক্তারের কাছে নিলাম। সেখানে এক বাচ্চা দিলো হিসু করে। রুম ভর্তি মানুষ দাঁড়ানোর জায়গা নেই। মহিলা কে সবাই বলতেছে আপনি ডায়পার পড়ায় আনলেন না ক্যান। মহিলা বলতেছে, " প্রতি বার ডায়পার পড়ায় আনি, হিসু করে না। প্রতিবার বাসায় নিয়ে শুকনা ডায়পার টা ফালাইতে হয় তাই আজকে আর পড়াই নাই। " মহিলা কে দেখে এতো টাও গরীব লাগতেছিলো না যে তিনি ১ টা ডায়পার নষ্ট হওয়া এফোর্ড করতে পারবেন না তারপর মহিলা বাচ্চার প্যান্ট টা খুলে দিয়ে সেখানে রাখা খেলনা ঘোড়ায় বসিয়ে দিলো বাচ্চা কে, এই নেংটু অবস্থায়! মানে তার পরে যে অন্য বাচ্চা রাও এটা ইউজ করবে এতোটুকু হাইজিনের বালাই নাই 😫
এই দিকে আমি বান্দা, হসপিটালে থাকতে যতবার টয়লেটে গেছি। ফিরে এসে বেডে উঠার আগে পায়ে হেক্সিসল দিয়ে ভিজা টিস্যু দিয়ে ভালো করে পা মুছে এরপর বেডের নিচে একটা বালতি রাখতাম, হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে তারপর বাচ্চার বেডে উঠতাম। ৯ দিনে শারদুল আর আমার কম্বাইন প্রায় ৪ টা টয়লেট টিস্যু শেষ হইছে। আমাদের কে যখন ICU তে দেয়, আমি এসে নিজের বেডশীট বিছাইছি, বাবু কে শোয়ায় দিয়ে এরপর হেক্সিসল আর ভিজা টিস্যু দিয়ে পুরো বেডের চারপাশ, টেবিল, আমার অংশের ফ্লোর সব কিছু ক্লিন করছি। বাচ্চার জন্য একটা বেলুন কিনে নিয়ে গেছিলাম, সেটাকেও নিয়ে আগে স্যানিটাইজ করে তারপর ওর কাছে নিছি। ICU এর নার্স রা বলতেছিলো, এই পর্যন্ত হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা দিছি আমরা কিন্তু আপনার মতো সিন্সিয়ার পেশেন্ট হাতে গুনে ২-৪ টা পাই আমরা। সবাই যদি আপনার মতো সিন্সিয়ার হতো বাচ্চা গুলা আরও আগে সুস্থ হতো।
মানুষের কাহিনী দেখে হাসবো নাকি রাগ হবো আমি কনফিউজড। কারণ যদি রিয়েক্ট করতে যাই তাহলে সারাদিন সারাক্ষণ কারো না কারো সাথে ঝগড়া করতে হবে। আমার পার্মিশন না নিয়ে আমার বাচ্চার বেলুন নিয়ে গিয়ে নিজের বাচ্চা কে খেলতে দেওয়া, আমাদের পানির বোতল আমি ঘুমে থাকা অবস্থায় চুরি হয়ে যাওয়া, জরুরী কলের কথা বলে আমার হটস্পট দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চৌদ্দ গুষ্টির সাথে ইমো তে আড্ডা দেওয়া - বলে শেষ করা যাবে না এদেশের মানুষের কমন সেন্স যে এতো কম।
লিখেছেন
তাসনিম দিশা