24/05/2026
বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস: ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে সুস্থ জীবনের পথে
২৪ মে বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল মানসিক রোগ যা একজন মানুষের চিন্তা-চেতনা, আবেগ এবং আচরণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে । আমাদের সমাজে এই রোগটি নিয়ে অসংখ্য কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবার সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়।
সিজোফ্রেনিয়া কী এবং কেন হয়?
সিজোফ্রেনিয়া মূলত একটি মস্তিষ্কের রোগ । গবেষকরা মনে করেন, বংশগতি (Genetics), মস্তিষ্কের গঠন এবং পরিবেশগত কারণের সমন্বয়ে এই রোগ হতে পারে । এটি কোনোভাবেই জাদুটোনা বা "জ্বিন-পরীর আছর" নয় । ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য রিপোট অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ প্রায় ১.০%, যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় প্রায় কাছাকাছি । সাধারণত ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে এই রোগের লক্ষণগুলো প্রথম দেখা দেয়।
লক্ষণসমূহ চিনে নিন-
একজন সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত রোগী এমন কিছু শব্দ শুনতে পারেন বা এমন কিছু দেখতে পারেন যা অন্য কেউ দেখছে না বা শুনছে না (একে বলা হয় হ্যালুসিনেশন)। তারা এমন সব বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করেন যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই, যেমন— কেউ তাকে ক্ষতি করার চেষ্টা করছে (একে বলা হয় ডিলিউশন)। এ ছাড়া অসংলগ্ন কথা বলা, দৈনন্দিন কাজকর্মে অনীহা এবং সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া এই রোগের প্রধান লক্ষণ।
ভ্রান্ত ধারণা ও বাস্তবতা আমাদের সমাজে প্রচলিত সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো—
সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিরা সব সময় বিপজ্জনক বা হিংস্র হয় । কিন্তু তথ্য বলছে, সঠিক চিকিৎসায় থাকলে তারা মোটেও বিপজ্জনক নয় এবং বরং সাধারণ মানুষের চেয়ে তারাই বেশি সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে । অন্য একটি ভুল ধারণা হলো এটি "স্প্লিট পার্সোনালিটি" বা দ্বৈত ব্যক্তিত্ব । আসলে এটি ব্যক্তিত্বের বিভাজন নয়, বরং এটি মনের বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা। অনেকে মনে করেন এই রোগ কখনো সারে না, কিন্তু বাস্তবতা হলো সঠিক চিকিৎসায় আক্রান্তদের বড় একটি অংশ সুস্থ ও স্বাভাবিক কর্মজীবন অতিবাহিত করতে পারে ।
চিকিৎসা ও করণীয়-
সিজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ এবং এর জন্য বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিতসকের পরামশ অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন । সিজোফ্রেনিয়া চিকিৎসার জন্য মূলত সাইকোট্রপিক বা মনোরোগের ঔষধ ব্যবহার করা হয়, যা রোগীর মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে । প্রধানত অ্যান্টি-সাইকোটিক ঔষধ এবং কাউন্সেলিং বা থেরাপির মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা হয় । বাংলাদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসার বিশাল ঘাটতি রয়েছে; প্রায় ৯২.৩% আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো চিকিৎসায় আসে না । এর প্রধান কারণ সামাজিক লজ্জা বা লোকলজ্জার ভয় ।
কোথায় যাবেন চিকিৎসার জন্য?
বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক এই রোগের চিকিৎসা করে থাকেন। সিজোফ্রেনিয়া রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে: ১. জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), ঢাকা: ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি মানসিক রোগের প্রধান রেফারাল সেন্টার ২. পাবনা মানসিক হাসপাতাল: দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বিশেষায়িত হাসপাতাল । ৩. দেশের প্রায় সকল সরকারি হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগে বহিঃবিভাগ সেবা চালু রয়েছে ৪. দি ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন অব মেন্টাল হেলথ অব বাংলাদেশ এর ঢাকাস্থ বঃহি বিভাগ সেবা আছে, এবং পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে ।
সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের প্রতি ঘৃণা নয়, বরং সহমর্মিতা প্রয়োজন। পরিবার ও সমাজের সঠিক সহায়তা থাকলে তারা সমাজের মূলধারায় অবদান রাখতে সক্ষম । আসুন, এই বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবসে আমরা শপথ করি— কুসংস্কারমুক্ত হয়ে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার প্রতি আস্থা রাখব এবং মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করব।