25/10/2020
"লেখকের খোলা খাতায়-০২"
-জেবুন্নাহার জেবা
অপর্ণা সবেমাত্র কলেজ পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী। কঠিন এক সমাজের মধ্যেই সে একজন সচেতন ও দৃঢ় মনোবলের এক কিশোরী। তার ছোট ভাই সুবোধ, অষ্টম শ্রেণিতে উঠলো। বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর পড়াশোনায় সময় কাটিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জীবন চলছে। একদিন অর্পণা খেয়াল করলো, সুবোধ তার রুমে বসে চুপি চুপি কি যেন দেখছে, এবং যখন সে তার ভাই এর সম্মুখীন হলো, সুবোধ এক প্রকার হতভম্ব, গা-ঢাকা এবং অস্বীকারের মতো ব্যবহার করতে থাকে। তবে কিছুক্ষণ বুঝিয়ে অর্পণা সুবোধের থেকে জানতে পারলো সে কি দেখছে। জানার সাথে সাথেই অর্পণা বুঝতে পারলো যে সুবোধ পর্ণোগ্রাফি চিত্র দেখছিল। সুবোধকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তার মাঝে একরকম অপরাধবোধ এবং এড়িয়ে যাওয়ার মনোভাব দেখে, সাথে এক প্রকার ঘৃণ্য মানসিকতার বিদ্বেষী রূপ দেখে।
এই কাল্পনিক চরিত্রগুলোর ঘটনাটি কিন্তু আমাদের সমাজে অহরহ ঘটে আসছে। এক প্রকার "ওপেন সিক্রেট"-ই বললে চলে। “পর্ণোগ্রাফি” মূলত মানুষের যৌনতা ও সেক্সুয়াল রিলেশনশিপের এক প্রকার বিকৃত বিনোদনকেন্দ্রিক শিল্প যা মানুষের এবং আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে পুরুষদের সেক্সুয়ালিটি ও যৌন সম্পর্ককে একটি কুরূচিপূর্ণ এবং অপরাধী মনোভাব সৃষ্টিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
মূলত কেউই পর্ণোগ্রাফি সম্পর্কে আগে থেকেই জানে না। হয় আশেপাশের মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, নাহলে বর্তমানের ইন্টারনেট জগত থেকে এই বিষয় সম্পর্কে পরিচিত হয়ে থাকে। আমাদের সমাজে এই বিষয়টি এক প্রকার ট্যাবু বা নিষিদ্ধ একটি বিষয় যা নিয়ে কেউ কখনও কথা বলে না। তাই এই বিকৃত ব্যাপারটির জন্যে সকল পুরুষদের এক প্রকার কৌতূহল ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়। যার দরুন এই অজানা বিষয়ের প্রতি আকর্ষণের প্রভাবের পাশাপাশি উক্ত ট্যাবুর কারণে সঠিক জ্ঞানের অভাবে আমাদের পুরুষ সমাজের মাঝে একটি বিকৃত কাল্পনিক সেক্সুয়াল রিলেশনশিপকে বাস্তব হিসেবে বিশ্বাস করতে বাধ্য করতেই তুলে ধরা হয় এই পর্ণোগ্রাফি।
কিন্তু আসলেই পর্ণোগ্রাফিতে যা দেখানো হয়, যেভাবে মানুষের মধ্যকার যৌনসম্পর্ককে তুলে ধরা হয় তাই কি বাস্তব চিত্র? এক কথায় উত্তরটি হবে, “না!” সমগ্র বিশ্বের সকল মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করবেন যে, “পর্ণোগ্রাফি মানুষের মধ্যে এবং আমাদের সমাজের ক্ষেত্রে পুরুষ সমাজের ভেতর একটি বিকৃত জগতের সৃষ্টি করেছে।“
পর্ণোগ্রাফিতে নারীদের উপর জবরদস্তির চিত্রায়ন, কনসেন্ট বিষয়কে সম্পুর্ণরূপে অগ্রাহ্য করা, এবং সবথেকে বড় বিষয়, ধর্ষণের মনোভাবকে গড়ে তুলতে উসকে দেয়া হয়। সকল পর্ণোগ্রাফিতেই নারীদের হেয় করে চিত্রায়িত করা হয় যেখানে তাদেরকে নিচু চোখে দেখানো হয়, টক্সিক ম্যাস্কুলিনিটিকে গ্লোরিফাই করে। এমনকি বিকৃত বিষয়টি সকল ধর্মেও নিষিদ্ধ কেননা এটি ধ্বংসাত্বক। এই বিকৃত বিষয়টিই মূলত সমাজের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন অপরাধ বৃদ্ধির জন্যে অনেকাংশেই দায়ী।
হ্যা, পর্ণ দেখার ফলে প্রত্যেকের মাঝে এক অবাস্তব ও অনৈতিক সেক্সুয়াল রিলেশনশিপের মনোভাব গড়ে ওঠে। এর ফলে পুরুষদের মাঝে নারীদের প্রতি সম্মান এবং সংবেদনশীল বা কনসেনসুয়াল রিলেনশিপের গুরুত্ব লোপ পায়। তারা পর্ণের মাধ্যমে যৌন সম্পর্ককে একটি গর্বের বিষয় ও সহিংস কাজ হিসেবে মনে করে। দেখা যায়, ধর্ষণের মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে শুধুমাত্র এই পর্ণোগ্রাফির ফলে প্রভাবিত বিকৃত মানসিকতা। সৃষ্টি করে সকল প্রকার সেক্সুয়াল ভায়োলেন্সের মনোভাব। এই সকল বিষয়ের মাঝে একটি মস্তিষ্ক থাকলে উক্ত ব্যক্তির মানসিকতা, নারীদের প্রতি মনোভাব বিকৃত, সহিংস, অনৈতিক ও অমানবিক হবে এটা অনুমানযোগ্য। যার প্রভাবে দেশে ধর্ষণের এবং নারী নির্যাতনের হার ক্রমশই বৃদ্ধি পেয়ে যাচ্ছে। পর্ণোগ্রাফি কখনোই "Healthy Sexual Realationship"- কে তুলে ধরে না। এটি কখনোই পুরুষদের সঠিক সেক্সুয়াল এডুকেশন প্রদান করে না। সর্বোপরি এটি কখনোই একজন মানুষের সুস্থ মানসিকতা তৈরি করতে দেয় না। বরং এটি পুরুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়কে আরো তরান্বিত করে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো এরকম কেন হয় এবং এটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কিভাবে গড়ে তোলা যায়?
১. প্রধানত যে কারণে পুরুষরা পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে যায় সেটি হলো সঠিক সচেতনতার অভাব। আমাদের সমাজে সেক্স এডুকেশন এবং যৌনতা সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা প্রদান করাটা সম্পূর্ণরূপে অবহেলা করা হয়। মূলত এক প্রকার নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে একে দেখা হয় এবং এই বিষয়টি সম্পর্কে কোনো পরিবারই তাদের সন্তানদের, বিশেষত ছেলে সন্তানদের কাথে কথা বলতে অপরাগ। এজন্য সমাজে সেক্স এডুকেশন, পর্ণোগ্রাফির কুফল এবং নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষাটি প্রদান করতে হবে ছোট বয়স থেকেই। সচেতনতাই হলো এই অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
২. আমরা যদি আমাদের শুরুর কাল্পনিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই উদাহরণ দেই, অর্পণা যখন সুবোধকে দেখলো, সে এইসকল পর্ণো চিত্র দেখছে এবং তার মানসিকতার কু-পরিবর্তন আসছে, সে তাকে পর্ণোগ্রাফির কুফল এবং বিকৃত মানসিকতা সম্পর্কে সচেতন করলো। এইসব বিষয় কতটা জঘন্য এবং খারাপ তা নিয়ে বুঝালো। এভাবে তার পরিবার তার পাশে থেকে সঠিক শিক্ষা এবং সঠিক সেক্স এডুকেশন দিতে পারলে সে এই দূষিত এবং অসৎ সঙ্গ হতে সরে আসতে পারবে। একই সাথে সে তার পরিচিত ছেলে বন্ধুদের এসকল বিষয় থেকে সরিয়ে আনতে পারবে সচেতনতা তৈরি করে।
এভাবে একজন আরো অনেককে সচেতন করলে এবং সঠিক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে গাছের শেকড়ের মতো সকল পুরুষের মাঝে সুস্থ মানসিকতা এবং সুবোধের তৈরি করে একটি সুস্থ এবং সুন্দর সমাজের শক্ত ও জীবিত গাছের বেড়ে ওঠা দেখতে পারব।
৩. শুধু যে আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগেই সব সম্ভবাপর তা কিন্তু নয়। রাষ্ট্রেরও দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এ বিষয়কে প্রতিরোধ করতে। বর্তমানে “পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন” যা ২০১২ সালে গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধের চেষ্টা চলে আসছে। উক্ত আইনানুযায়ী পর্নোগ্রাফি উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, বহন, সরবরাহ, ক্রয়-বিক্রয় ও প্রদর্শন বেআইনি ও নিষিদ্ধ। এই নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদনের জন্য শাস্তির বিবিধ বিধান রাখা হয়েছে। এ আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য এবং অজামিনযোগ্য। এই আইনে বলা হয়েছে,”যে কোনো ব্যক্তি পর্নোগ্রাফি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে কোনো নারী, পুরুষ বা শিশুকে প্রলোভন দিয়ে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে স্থির, ভিডিও বা চলচ্চিত্র ধারণ করলে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে।“ যা অত্যন্ত কঠোর এবং যুক্তিসম্পন্ন আইনের প্রয়োগ বটেই।
৪. শুধু অপরাধের শাস্তি প্রদানের মাধ্যমেই এরকম সামাজিক অবক্ষয়কে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। উক্ত আইনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে নতুন প্রজন্ম এবং দেশের পুরুষ সমাজের জন্যে যথার্থ সেক্স এডুকেশন প্রোগ্রাম, পর্ণোগ্রাফির আসক্তির শিকার ব্যক্তিদের জন্য সঠিক রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রামের সৃষ্টি, নারী অধিকার বাস্তবায়ন এবং সকল প্রকার নারীদের প্রতি নিপীড়ন ও নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা। অর্থাৎ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সচেতন নাগরিকদের সকলেরই একত্রে সমাজের এই হেন্য বিষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে হতে হবে সচেতন। ছেলেদেরকে পারিবারিক, সামাজিক এবং সাংগঠনিক পর্যায়ে সেক্স এডুকেশন, কনসেন্ট এবং নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা এবং মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। তবেই আমরা একটি সুস্থ, সুন্দর এবং নিরাপদ দেশের অধিকারী হবো এবং দেশের সকলের মাঝে সমতার ঐক্য খুঁজে পাব এবং সহিংসতামুক্ত সুন্দর আগামী সুনিশ্চিত করতে পারবো।
#প্রতিবাদ_হোক_কলমের_সাথে নিজেকে যুক্ত করে আমি প্রতিবাদ করছি আমার লেখনীর মাধ্যমে। আপনারাও এগিয়ে আসুন আপনাদের আঁকা বা লেখার মাধ্যমে ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে। আপনি চাইলে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা কিংবা আপনার আশেপাশে ঘটে যাওয়া নির্যাতন এবং সেই সম্পর্কে সচেতন করতে আমাদের কাছে লেখা পাঠাতে পারেন এই ই-মেইলেঃ ([email protected])। অথবা আমাদের মেসেজ পাঠাতে পারেন Superwoman এর ফেসবুক পেইজেঃ
https://www.facebook.com/superwomanbd/
লেখকের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে চাইলে আপনি নিজের নাম গোপন রাখতে পারেন। হতে পারে আপনার একটি লেখা পড়ে অনেকের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হবে যা আমাদের সকলের সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই আপনার আঁকা ও লেখা দিয়ে “ Against Rape” ইভেন্টে অংশগ্রহণ করতে রেজিস্ট্রেশন করুন:
https://l.facebook.com/l.php...
ইভেন্ট লিংক: https://fb.me/e/i2JUna7YQ
চলুন একসাথে পথচলি, সুন্দর আগামী গড়ি।
#প্রতিবাদ_হোক_কলমের_সাথে