29/04/2026
এই অসুখে জ্বর আসে না,
কোটি প্রাণে ঘর আসে,
চোখে না পড়লে সমস্যা নেই, এই ভাবনাটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
রাত তিনটে। ঢাকার কোনো একটা ফ্ল্যাটে একজন জেগে আছে। সকালে তার অফিস আছে, পরের দিন আছে পরীক্ষা , কিন্তু চোখে ঘুম আসে না। মাথার ভেতর একটা চাপা অস্থিরতা, একটা ফাঁকা অনুভূতি। এদিকে কাউকে বলতেও পারছে না।
বললে কী হবে?
কেউ বলবে, "এত ভাবিস কেন?"
কেউবা বলে ফেলবে, "এগুলো সমস্যাই না।" কেউ হয়তো পরের দিন থেকে একটু দূরে সরে যাবে।
তাই সে চুপ করে থাকে।
এই চুপ থাকাটাই বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সবচেয়ে বড় রূপ। এটা হইচই করে আসে না, প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের ভেতরে ধীরে ধীরে গেঁথে বসে, নিঃশব্দে।
সংখ্যাগুলো যা বলে:
একটি জাতীয় সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৮.৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, শহর ও গ্রামে এই হার প্রায় সমান। জনসংখ্যার হিসাবে সংখ্যাটা কোটি ছাড়িয়ে যায়। শুধু বড়রা নন, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ১৮ শতাংশও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। অর্থাৎ স্কুলব্যাগ কাঁধে নেওয়া বাচ্চাটাও এই ভার বহন করছে।
এই বিশাল সংখ্যার বিপরীতে চিকিৎসক কতজন?
সারা দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ আছেন মাত্র ২২০ জন। আর ঢাকায় এই সেবার ঘনত্ব দেশের বাকি অঞ্চলের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ শতাংশ কখনো কোনো চিকিৎসা নেন না, শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৯৪ শতাংশ।
'পাগল', একটি শব্দের বেড়াজাল :
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই শব্দের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও, বাংলাদেশে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষকে এই পরিচয়েই দেখা হয়। মানসিক সমস্যার কলঙ্ক শুধু ওই একজনের নয়, পুরো পরিবারের গায়ে লেগে যায়, বিশেষত বিয়ে ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই প্রভাব সবচেয়ে তীব্র। ফলে মানুষ কষ্ট বুকে চেপে রাখে, "এমনিই ঠিক হয়ে যাবে" ভাবে। কিন্তু ঠিক হয় না।
সমাধান আছে, তবে সদিচ্ছা লাগবে:
শুধু সচেতনতামূলক পোস্টে এই সংকট কমবে না। গবেষকরা কিছু সুনির্দিষ্ট পথের কথা বলছেন যেগুলো বাস্তবে কাজ করে।
পরিবারকে সত্যিকারের আশ্রয় হতে হবে। "সময় দেওয়া" আর "সত্যিকারের পাশে থাকা" এক কথা নয়।
বাংলাদেশের বহুপ্রজন্মের যৌথ পারিবারিক কাঠামো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি শক্তিশালী সুরক্ষা বলয় হতে পারে, কারণ এটি সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও সহায়তার বৃহত্তর নেটওয়ার্ক তৈরি করে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে গবেষণা বলছে, আবেগীয়ভাবে সংবেদনশীল অভিভাবকত্ব এবং শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্থিতিস্থাপকতার অন্যতম প্রধান নিয়ামক।
কিন্তু একই পরিবার যখন "চুপ কর" বলে, তখন সেই বলয়টাই দেয়াল হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ফ্যামিলি থেরাপি ক্লিনিকের গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের পারিবারিক সম্পর্ক মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে গভীরভাবে যুক্ত এবং পারিবারিক থেরাপি এই প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে।
ধর্ম: শক্তির উৎস:
মানুষের কথা বলতে গেলে ধর্মের কথা আসবেই, এটা এড়িয়ে যাওয়া সততা নয়। নামাজে মন হালকা লাগে, দোয়ায় শান্তি মেলে, এটা অনেকের সত্যিকারের অভিজ্ঞতা। গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় কোপিং মেকানিজম, বিশেষত ইসলামিক বিশ্বাস, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
কুরআনে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়ের প্রশান্তি।" (সূরা রা'দ, ১৩:২৮) ধর্ম মানুষকে ভেতর থেকে শক্তি দেয়, আর চিকিৎসা মানুষকে সারিয়ে তোলে। দুটো একসাথে হতে পারে, বরং হওয়াটাই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর।
সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে:
বিশেষজ্ঞের কাজের একটি অংশ প্রশিক্ষিত সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে হস্তান্তরের এই টাস্ক-শেয়ারিং পদ্ধতি বাংলাদেশের মতো দেশে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ চিকিৎসায় কার্যকর বলে প্রমাণিত। বিশেষজ্ঞ রাতারাতি বাড়বে না, কিন্তু প্রশিক্ষিত মানুষ বাড়ানো সম্ভব।
কমিউনিটিভিত্তিক সেবা ও টেলিহেলথ বিস্তার ঘটাতে হবে। SAJIDA ফাউন্ডেশনের "প্রশান্তি" প্রকল্প কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মডেলে কাজ করছে এবং WHO ২০২৪ সালে এটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উদ্ভাবনী উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গ্রামীণ টেক হাবগুলোকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা চালু করলে দূরত্ব ও খরচ দুটো বাধাই একসাথে কমানো সম্ভব।
স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং ধর্মীয় নেতাদের
সম্পৃক্ততা:
কমিউনিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যশিক্ষা যুক্ত করলে মানুষ সমস্যা আগেভাগে চিনতে পারে এবং সময়মতো সাহায্য নেয়। ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ ইতোমধ্যে কিছুটা কার্যকর ফল দিচ্ছে। মসজিদকেন্দ্রিক কার্যক্রম গ্রামীণ বাংলাদেশে বিশেষভাবে প্রভাবশালী হতে পারে।
সরকারি বাজেট বরাদ্দ বাড়াতেই হবে:
বাংলাদেশে জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ। এই সংখ্যাটাই বলে দেয়, রাষ্ট্র এই সংকটকে এখনো কতটা হালকাভাবে নিচ্ছে।
এখন আপনি যা করতে পারেন:
পাশের কেউ চুপচাপ হয়ে গেলে জিজ্ঞেস করুন, "সত্যি বলো, কেমন আছো?" কেউ মানসিক সমস্যার কথা বললে "পাগলামি" বলার আগে একটু থামুন। নিজে ভালো না থাকলে সাহায্য নিতে লজ্জা পাবেন না। এবং এই লেখাটা শেয়ার করুন, কারণ একটা শেয়ারও কারো কাছে পৌঁছে দিতে পারে এই বার্তা যে সে একা নয়।
তথ্যসূত্র: National Mental Health Survey, Bangladesh (2018–19) | BJPsych International (2021) | WHO Special Initiative for Mental Health, Bangladesh (2020) | SAJIDA Foundation Mental Health Programme (2024) | Frontiers in Global Women's Health (2024) | Journal of Marital and Family Therapy, University of Dhaka Study (2025) | World Social Psychiatry: Community-Based Mental Health Services in Bangladesh (2022) | Cambridge Global Mental Health: Mental Illness Stigma in Bangladesh (2023) | National Mental Health Policy, Bangladesh (2022)