31/05/2026
সর্বজনীন পেনশন স্কিম: প্রেক্ষিত ও প্রস্তাবনা
সরকারের সর্বজনীন পেনশন স্কিম একটি ভালো উদ্যোগ, যার মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। এ স্কিমের আওতায় ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী নাগরিকরা অংশগ্রহণ করতে পারেন এবং বিশেষ বিবেচনায় ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে নাগরিকরাও নিরবচ্ছিন্ন ১০ বছর চাঁদা প্রদান সাপেক্ষে পেনশন সুবিধা লাভ করতে পারেন। প্রবাসীদের জন্য প্রণোদনা, সহজ চাঁদা প্রদান ব্যবস্থা, কর রেয়াত, অনলাইন নিবন্ধনসহ নানা সুবিধা এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বর্তমানে প্রগতি, সমতা, প্রবাস ও সুরক্ষা—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে, যা বিভিন্ন পেশা ও আয়ের মানুষের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে।
তবে আমার মতে, বিদ্যমান এই চারটি স্কিমের কাঠামো সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—যেমন কৃষক, গার্মেন্টস শ্রমিক, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী ও প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য এ স্কিম বাস্তবসম্মত নয়।
প্রথমত, অনেক নাগরিকের আয় অনিয়মিত হওয়ায় নির্ধারিত উচ্চ হারে মাসিক চাঁদা প্রদান তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। যেমন, একজন ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসায়ী শুরুতে বেশি পরিমাণ চাঁদা দিতে পারলেও পরবর্তীতে আর্থিক সমস্যার কারণে তা চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে করণীয় বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই।
দ্বিতীয়ত, দেশের অর্থনীতিতে কৃষক ও শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকরা খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করেন এবং গার্মেন্টস শ্রমিকরা রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বর্তমান স্কিম কাঠামোয় তাদের পক্ষে পেনশন সুবিধা ভোগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখলেও বাস্তবতায় তারা অনেকেই আর্থিকভাবে সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারেন না। প্রবাস জীবনের পর দেশে ফিরে তারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। তাই তাদের জন্য সহজ ও কার্যকর পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে আরও বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনা প্রদান করা হলো—
১. সরকারি বেতন স্কেলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করা যেতে পারে।
২. নির্ধারিত সীমার মধ্যে নাগরিকগণ তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারবেন।
৩. পেনশন নির্ধারণে জমাকৃত অর্থের মাসিক গড় ও জমার মোট সময়কাল বিবেচনা করা হবে।
৪. ১০ বছর চাঁদা প্রদান করলে একটি নির্দিষ্ট হারে পেনশন নির্ধারণ করা হবে এবং পরবর্তী প্রতিটি বছরের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত করা যেতে পারে।
৫. ১০ বছরের কম সময় চাঁদা প্রদান করলে আনুপাতিক হারে পেনশন নির্ধারণ করা যেতে পারে।
৬. সর্বনিম্ন ৫ বছর চাঁদা প্রদানকে পেনশন প্রাপ্তির যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
৭. ৫ বছরের কম সময় চাঁদা প্রদান করলে বা কোনো কারণে চাঁদাদাতা অপারগ হলে, জমাকৃত অর্থ মুনাফাসহ এককালীন ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
পরিশেষে, উল্লিখিত প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়ন করা হলে সর্বজনীন পেনশন স্কিম আরও কার্যকর, নমনীয় ও জনবান্ধব হবে এবং দেশের সকল শ্রেণির নাগরিক এর সুফল ভোগ করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।