05/10/2026
বিশ্ব বসতি দিবস: সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ
শেখ রাশেদুল ইসলাম চৌধুরী ওইজার
ভূমিকা:
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার সারা বিশ্বে পালিত হয় বিশ্ব বসতি দিবস (World Habitat Day)। জাতিসংঘ ১৯৮৫ সালে এই দিবসটি ঘোষণা করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি কথাই মনে করিয়ে দেওয়া — "বাসস্থান মানুষের মৌলিক অধিকার"। এ বছরের প্রতিপাদ্য "সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ" বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বজনীন বাসস্থান মানে কী?
সর্বজনীন বাসস্থান মানে শুধু মাথার উপর একটি ছাদ নয়। এর মানে হলো:
১. নিরাপদ আশ্রয়: যা ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প সহনশীল।
২. সাশ্রয়ী: যা একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে একজন চাকরিজীবী, সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে।
৩. মর্যাদাপূর্ণ: যেখানে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ এবং আলো-বাতাসের ব্যবস্থা আছে।
আজও ঢাকা-চট্টগ্রামের বস্তিতে লাখ লাখ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে, যাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। তাদের জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করাই হলো সর্বজনীন বাসস্থানের মূল কথা।
টেকসই নগরায়ণ কেন জরুরি?
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২% হারে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসছে। ২০৫০ সালে দেশের ৫০% এর বেশি মানুষ শহরে বাস করবে। কিন্তু আমাদের শহরগুলো কি সেই জন্য প্রস্তুত?
আমাদের নগরায়ণ এখনো টেকসই নয়। এর লক্ষণগুলো আমরা প্রতিদিন দেখি:
- চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা: সামান্য বৃষ্টিতেই আগ্রাবাদ, মুরাদপুর ডুবে যায় কারণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপরিকল্পিত।
- বায়ু দূষণ: ইটভাটা আর কালো ধোঁয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রামের বাতাস বিষাক্ত।
- সবুজের অভাব: একটি আদর্শ শহরে ২৫% সবুজ থাকা দরকার, আমাদের শহরে আছে ৫% এরও কম।
টেকসই নগরায়ণ মানে এমন শহর গড়া, যে শহর পরিবেশকে ধ্বংস করে না, বরং পরিবেশের সাথে মিলেমিশে থাকে।
টেকসই নগরায়ণের জন্য ৪টি করণীয়:
১. উল্লম্ব আবাসন (Vertical Housing): জমি কম, মানুষ বেশি। তাই পাশে নয়, উপরে বাড়তে হবে। সরকারি উদ্যোগে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য বহুতল বিশিষ্ট ফ্ল্যাট প্রকল্প বাড়াতে হবে।
২. সবুজ ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণ: বিল্ডিং কোড মেনে ভবন তৈরি, ছাদে বাগান, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সোলার প্যানেল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: শহরের ময়লা-আবর্জনাকে বোঝা না ভেবে সম্পদ ভাবতে হবে। বর্জ্য থেকে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সময়ের দাবি।
৪. সবার জন্য শহর: শুধু ধনীদের জন্য নয়, শহর হতে হবে হকার, রিকশাচালক, পোশাক শ্রমিক সবার জন্য। তাদের যাতায়াত, কাজের জায়গা এবং বাসস্থান একই পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।
উপসংহার:
বিশ্ব বসতি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নগরায়ণ মানে শুধু বিল্ডিং তোলা নয়, মানুষের জীবনমান উন্নত করা। একটি টেকসই শহর হলো সেই শহর, যেখানে আমার সন্তান নিরাপদে হাঁটতে পারে, বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারে এবং সবার জন্য একটি ঘর থাকে।
আসুন, এই দিবসে আমরা শপথ করি — আমরা এমন কোনো উন্নয়ন করবো না, যা আগামী প্রজন্মের বাসস্থানকে হুমকির মুখে ফেলে।