19/09/2026
সম্পর্কের সমাপ্তি হোক, হিংস্রতার নয়
এই পৃথিবীতে প্রতিটি সম্পর্কেরই একদিন না একদিন সমাপ্তি আছে। কোনো সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, আবার কোনো সম্পর্ক শেষ হয় বিচ্ছেদের মাধ্যমে।
যখন কেউ কোনো সম্পর্ক থেকে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ধরে নিতে হয়—হয়তো সে সেই সম্পর্কটিকে টিকিয়ে রাখতে রাখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, অথবা তার অনুভূতিতে পরিবর্তন এসেছে, কিংবা সে অন্য কারও সন্ধানে মগ্ন। আবার কখনো কখনো দুটি মানুষের সুন্দর সম্পর্কও তৃতীয় কোনো মানুষের হিংসা, ষড়যন্ত্র কিংবা কু-নজরের কাছে পরাজিত হয়।
একজন স্বামী-স্ত্রী ১০ বছর, ২০ বছর কিংবা তারও বেশি সময় একসঙ্গে কাটিয়ে দিতে পারেন। একসময় তারা ছিলেন একে অপরের পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষ। একে অপরের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, একে অপরের নির্ভরতার জায়গা।
কিন্তু যখন কোনো একসময় তাদের মধ্যে ভালোবাসা, বিশ্বাস কিংবা পারস্পরিক অনুভূতির অবসান ঘটে, তখন কেন তাদের কেউ কেউ হিংস্র হয়ে ওঠেন?
এই হিংস্রতার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। কেউ বিচ্ছেদকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না। কেউ আবার নিজের সঙ্গীর ওপর অত্যাচার করে তাকে বোঝাতে চান যে, এই সম্পর্ক আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আবার কেউ কেউ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন, যেন সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সমস্ত দায় অন্য পক্ষের।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন হিংস্রতাকে বেছে নেয়? হিংস্রতাই কি একমাত্র পথ?
একটি সম্পর্ক শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেই সম্পর্কের মানুষটির প্রতি সম্মান কি শেষ হয়ে যাবে?
দুজন মানুষের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে কি একটি সম্পর্কের সুন্দর সমাপ্তি ঘটানো যায় না? বিচ্ছেদ মানেই কি অপমান, প্রতিশোধ, নির্যাতন কিংবা রক্তপাত?
আর একটা বিষয় আমাদের মনে রাখা উচিত—সম্পর্কের সমাপ্তিই সব সময় একমাত্র সমাধান নয়। আজ যে মানুষটিকে আপনার সহ্য হচ্ছে না, মাত্র দুই দিন আগেও হয়তো সেই মানুষটিই ছিল আপনার পৃথিবীর সবচেয়ে আপনজন। যার সঙ্গে আপনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন, যার হাত ধরে জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছেন।
আজ হয়তো কোনো কারণে সেই সম্পর্ক আর চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। হয়তো ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে, হয়তো বিশ্বাস ভেঙে গেছে, কিংবা দুজনের পথ আলাদা হয়ে গেছে।
কিন্তু তাই বলে কি সেই মানুষটির প্রতি আপনার সমস্ত মানবিকতা শেষ হয়ে যাবে?
কারও প্রতি ভালোবাসা না থাকতেই পারে, কিন্তু ভালোবাসা না থাকার অর্থ এই নয় যে তার ওপর অন্যায় করার অধিকার আপনি পেয়ে গেছেন।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, যখন কারও প্রতি আমাদের অনুভূতি শেষ হয়ে যায়, তখন অনেক সময় তার কষ্ট, তার কান্না, তার অসহায়ত্ব আমাদের ভেতরে আর কোনো অপরাধবোধ তৈরি করে না। আমরা ভুলে যাই, একসময় এই মানুষটিই আমাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কিন্তু অনুভূতির পরিবর্তন কখনোই নির্যাতনের বৈধতা হতে পারে না। সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে, মানুষ দূরে সরে যেতে পারে, ভালোবাসা শেষ হয়ে যেতে পারে—কিন্তু মানবিকতা যেন কখনো শেষ না হয়।
বিচ্ছেদ হোক, কিন্তু তা হোক সম্মানের সঙ্গে। দূরত্ব তৈরি হোক, কিন্তু তা হোক নিরাপত্তা ও মর্যাদা বজায় রেখে।
কারণ একটি সম্পর্ক শেষ হওয়া দুঃখজনক হতে পারে, কিন্তু সেই সম্পর্কের সমাপ্তিকে হিংস্রতায় পরিণত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভালোবাসতে না পারলে সরে যান। একসঙ্গে থাকতে না চাইলে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিন। কিন্তু কাউকে নির্যাতন করে, অপমান করে কিংবা ভয় দেখিয়ে নিজের অনুভূতির পরিবর্তন বোঝানোর চেষ্টা করবেন না।
মনে রাখবেন—
সম্পর্কের শেষ মানেই মানুষের শেষ নয়।
একজন মানুষ আপনার জীবনের অংশ না-ও থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি মানুষ হিসেবে তাঁর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকারের অধিকারী থাকবেন।
ভালোবাসার সমাপ্তি হোক, কিন্তু মানবিকতার নয়।
বিচ্ছেদ হোক, কিন্তু হিংস্রতার মাধ্যমে নয়।