03/10/2026
🕌 হযরত মখদুম আলাউদ্দিন আলী আহমদ সাবির পাক কালিয়ারী (রহঃ)
দরগাহ হযরত সাবির-ই-পাক
পীরান কালিয়ার শরীফ, রুরকি, উত্তরাখণ্ড–২৪৭৬৬৭, ভারত
হযরত মখদুম আলাউদ্দিন আলী আহমদ সাবির কালিয়ারী (রহঃ) ত্রয়োদশ শতাব্দীর একজন প্রসিদ্ধ সুফি সাধক হিসেবে পরিচিত। তিনি সাবির পাক, বাবা সাবির, মখদুম-উল-আলম, আলী আহমদ, চেরাগ-এ-চিশত প্রভৃতি নামে পরিচিত।
তাঁর দরগাহ ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের হরিদ্বারের নিকটবর্তী পিরান কালিয়ার শরীফে অবস্থিত। মুসলিম সমাজে এই দরগাহ বিশেষ শ্রদ্ধার স্থান হিসেবে পরিচিত।
🌿 পরিচিতি
নাম: মখদুম আলাউদ্দিন আলী আহমদ সাবির কালিয়ারী (রহঃ)
উপাধি: সাবির-ই-পাক, মখদুম-উল-আলম, বাবা সাবির, চেরাগ-এ-চিশত
তরিকাহ: চিশতিয়া
পীর ও মুর্শিদ: হযরত শেখ ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকর (রহঃ)
মাতা: হযরত জামিলা খাতুন (রহঃ)
পিতা: হযরত আব্দুর রহিম (রহঃ)
মাজার শরীফ: পিরান কালিয়ার, রুরকি, উত্তরাখণ্ড, ভারত
ইন্তেকাল: ৬৯০ হিজরি / ১২৯১ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ রবিউল আউয়াল
তাঁকে চিশতিয়া তরিকার সাবিরিয়া শাখার অন্যতম প্রধান সাধক হিসেবে স্মরণ করা হয়।
🌙 বংশপরিচয় ও শৈশব
বর্ণিত আছে, হযরত সাবির পাক (রহঃ) ছিলেন হযরত বাবা ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকর (রহঃ)-এর ভাগ্নে। তাঁর মাতা হযরত জামিলা খাতুন (রহঃ) ছিলেন বাবা ফরিদের বোন।
শৈশবেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করলে তিনি ও তাঁর মা আর্থিকভাবে কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েন। কথিত আছে, তাঁর মা অত্যন্ত সংযম ও আল্লাহভীতির সঙ্গে তাঁকে লালন-পালন করেন।
পরবর্তীতে তাঁর মাতা তাঁকে তাঁর মামা হযরত শেখ ফরিদউদ্দিন গঞ্জেশকর (রহঃ)-এর কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষার জন্য পাঠান। সেখানে তিনি তাসাউফের শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর পীরের হাতে বায়আত গ্রহণ করেন।
🍞 ১২ বছর লঙ্গরখানার দায়িত্ব
হযরত বাবা ফরিদ (রহঃ) তাঁকে লঙ্গরখানার খাবার বিতরণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
কথিত আছে, সাবির পাক (রহঃ) দীর্ঘ ১২ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নিজে লঙ্গরের খাবার গ্রহণ না করে রোজা রাখতেন এবং বনে গিয়ে বুনো ফল ও পাতা খেয়ে জীবনযাপন করতেন।
দীর্ঘদিন পর তাঁর দুর্বলতা দেখে বাবা ফরিদ (রহঃ) কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন—
“আপনি আমাকে লঙ্গরখানা দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন; কিন্তু সেখান থেকে খাবার খাওয়ার অনুমতি দেননি।”
তাঁর এই জবাব শুনে বাবা ফরিদ (রহঃ) তাঁর ধৈর্য ও আনুগত্যে সন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে “সাবির” নামে অভিহিত করেন বলে প্রচলিত আছে।
সেই থেকেই তিনি সাবির পাক নামে প্রসিদ্ধ হন।
✨ সাবির পাক (রহঃ)-এর জালাল ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব
সুফি ঐতিহ্যে হযরত সাবির পাক (রহঃ)-কে অত্যন্ত জালালি প্রকৃতির সাধক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তাঁর জীবনের সঙ্গে বহু অলৌকিক কারামতের কাহিনি লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে।
তাঁর অনুসারীদের কাছে তিনি ছিলেন তাকওয়া, ধৈর্য, ইবাদত ও আত্মসংযমের প্রতীক।
🌹 কথিত কারামতসমূহ
১. জন্মের সময় কারামত
কথিত আছে, জন্মের সময় ধাত্রী তাঁকে অজু ছাড়া কোলে নিলে তাঁর শরীরে জ্বালা-পোড়া অনুভূত হয়েছিল। এই ঘটনাকে তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদার প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
২. ১২ বছর লঙ্গরের খাবার গ্রহণ না করা
দীর্ঘ ১২ বছর লঙ্গরখানার দায়িত্ব পালন করেও তিনি সেখানকার খাবার গ্রহণ করেননি—এটি তাঁর অসাধারণ সংযম ও আনুগত্যের অন্যতম প্রসিদ্ধ কাহিনি।
৩. কাজী তবারকের সঙ্গে ঘটনা
কথিত আছে, কালিয়ারে অবস্থানকালে কাজী তবারকের সঙ্গে তাঁর একটি ঘটনা ঘটে। তাঁকে সাধারণ ফকির মনে করে অসম্মান করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
এরপর তাঁর জালালি অবস্থার সঙ্গে কালিয়ার শহরের ধ্বংসের একটি কাহিনি প্রচলিত হয়েছে।
৪. কালিয়ার শহর ধ্বংসের কাহিনি
লোকমুখে প্রচলিত আছে, কাজী তবারকের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে সাবির পাক (রহঃ) বলেছিলেন—
“সব ধ্বংস হোক।”
এরপর এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে কালিয়ার শহরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে কিংবদন্তিতে বর্ণিত আছে। একটি গাছ অক্ষত ছিল এবং সেই গাছের সঙ্গে সাবির পাক (রহঃ)-এর স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলেও প্রচলিত আছে।
৫. হারিয়ে যাওয়া ছাগলের ঘটনা
আরেকটি প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, কাজী তবারক তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্য হারিয়ে যাওয়া একটি ছাগলের কথা জানতে চান।
সাবির পাক (রহঃ)-এর নির্দেশে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর সামনে উপস্থিত হয় এবং তাঁদের পেটে থাকা ছাগলের অবশেষ থেকে ছাগলের কথা শোনা যায়—এমন একটি অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা লোকমুখে রয়েছে।
৬. বিবাহের কাহিনি
সাবির পাক (রহঃ)-এর বৈরাগ্য ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্নতার সঙ্গে তাঁর বিবাহিত জীবনের একটি কিংবদন্তিও প্রচলিত আছে। বর্ণনাটি বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্নভাবে পাওয়া যায়।
৭. নিজের জানাজা নিজে পড়ার কাহিনি
কথিত আছে, ইন্তেকালের আগে তিনি তাঁর ভক্তদের বলেছিলেন যে তাঁর মৃত্যুর পর একজন ব্যক্তি সাদা ঘোড়ায় এসে তাঁর জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করবেন।
পরবর্তীতে একজন সাদা ঘোড়ায় এসে তাঁর জানাজা ও দাফন করেন এবং চলে যাওয়ার সময় তাঁর মুখের কাপড় সরালে তাঁকে সাবির পাক (রহঃ) হিসেবে দেখা যায়—এমন একটি অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে।
৮. মাজার শরীফ পাহারা দেওয়ার কাহিনি
সাবির পাক (রহঃ)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর মাজার শরীফকে ঘিরে বিভিন্ন অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত হয়েছে।
কথিত আছে, তাঁর রওজা শরীফের চারপাশে দীর্ঘ সময় বিশেষ জালালি প্রভাব ছিল এবং একটি সিংহ ৪০ দিন পর্যন্ত মাজার পাহারা দিয়েছিল।
পরবর্তীকালে তাঁর মাজার শরীফ সর্বসাধারণের জিয়ারতের জন্য উন্মুক্ত হয় বলে বর্ণনা করা হয়।
৯. জিন-পরীদের সঙ্গে সম্পর্কিত কাহিনি
আরেকটি লোকপ্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, তাঁর মাজার শরীফের ওপর দিয়ে কোনো জিন বা পরী অতিক্রম করলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
এসব ঘটনা মূলত তাঁর ভক্তদের মধ্যে প্রচলিত কারামতের বর্ণনা হিসেবে পরিচিত।
🕋 পিরান কালিয়ার শরীফ
হযরত সাবির পাক (রহঃ)-এর মাজার শরীফ ভারতের উত্তরাখণ্ডের পিরান কালিয়ার এলাকায় অবস্থিত।
এটি ভারতীয় উপমহাদেশের সুফি ঐতিহ্যের একটি পরিচিত তীর্থস্থান। প্রতি বছর বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আসেন।
দরগাহ শরীফকে ঘিরে মুসলিম সমাজে বিশেষ শ্রদ্ধা ও ভক্তির পরিবেশ রয়েছে।
📍 কোথায় অবস্থিত?
পিরান কালিয়ার শরীফ
রুরকি, উত্তরাখণ্ড–২৪৭৬৬৭
ভারত
এটি রুরকি শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে এবং হরিদ্বারের নিকটবর্তী কালিয়ার অঞ্চলে অবস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়।
🚆 কীভাবে যাবেন?
পিরান কালিয়ার শরীফ যাওয়ার জন্য নিকটবর্তী প্রধান রেলওয়ে স্টেশন হলো রুরকি রেলওয়ে স্টেশন।
রুরকি রেলওয়ে স্টেশন থেকে স্থানীয় অটো, ট্যাক্সি বা অন্যান্য যানবাহনের মাধ্যমে সহজেই কালিয়ার শরীফের দিকে যাওয়া যায়।
🌿 সাবির পাক (রহঃ)-এর শিক্ষা
হযরত সাবির পাক (রহঃ)-এর জীবনকাহিনিতে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়গুলো ফুটে ওঠে তা হলো—
ধৈর্য, ইবাদত, আত্মসংযম, আনুগত্য, আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস থেকে দূরে থাকা।
তাঁর নামের মধ্যেই রয়েছে “সাবির” — অর্থাৎ ধৈর্যশীল।
তাই তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা হতে পারে—
“আল্লাহর পথে চলতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়, নিজের নফসকে সংযত করতে হয় এবং প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হয়।”
🤲 আল্লাহ তাআলা হযরত মখদুম আলাউদ্দিন আলী আহমদ সাবির পাক কালিয়ারী (রহঃ)-এর প্রতি রহমত নাজিল করুন এবং তাঁর জীবন ও শিক্ষা থেকে আমাদের উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সংগৃহীত।