11/12/2022
জুমার খুতবাপূর্ব বয়ান কি বেদাত?
মাহফুয আহমদ
অনারব বহু দেশে প্রতি জুমাবার আরবি খুতবার আগে স্থানীয় ভাষায় বয়ান করবার একটি নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। আজকাল কোনো কোনো বন্ধু প্রশ্ন করছেন যে, এটি কি শরিয়ত সমর্থিত? তাদের কথা হলো, এইরকম বয়ানের প্রথাটি নব-আবিষ্কৃত। উপরন্তু এই পদ্ধতি নাকি সুন্নাহ পরিপন্থী!
বিভিন্ন দলিলের আলোকে জোর দিয়ে বলা যায় যে, তাদের এমন ধারণা সঠিক নয়। সম্মানিত পাঠকবর্গের সদয় জ্ঞাতার্থে এখানে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা পেশ করা হলো।
এক.
জুমার খুতবার পূর্বে পৃথক আলোচনার প্রমাণ সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়িগণের জীবনবৃত্তান্ত থেকেও মেলে। আসিম ইবনে মুহাম্মাদ তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, জুমার দিন আমি আবু হুরায়রা (রা.) কে দেখলাম মসজিদের মিম্বারের পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন যে, "আবুল কাসিম, আল্লাহর রাসূল; যিনি সত্যবাদী ও সত্যায়িত (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন..."। এভাবে ইমাম আসা পর্যন্ত তিনি হাদিস বর্ণনা করতে থাকতেন। (আল মুসতাদরাক; আবু আবদিল্লাহ আল হাকিম, ৩/৫৮৫, দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ)
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর শাসনকালে জুমাবার মসজিদে তামিম আদ দারি (রা.) প্রথমে আলোচনা করতেন। বস্তুত তিনি ওমরের কাছে এর জন্য আবেদন করেছিলেন এবং খলিফা তাঁর অনুরোধমত আলোচনার অনুমতি প্রদান করেছিলেন। পরবর্তী খলিফা উসমান (রা.) এর শাসনকালেও তামিম আদ দারি তাঁর অনুমতিক্রমে জুমাবার খুতবার পূর্বে এরকম আলোচনা করে থাকতেন। (আল মুসান্নাফ; আবদুর রাজ্জাক, ৩/২১৯, আল মাকতাবুল ইসলামি)
ইউসুফ ইবনুস সায়িব বর্ণনা করেন যে, সায়িব ইবনে ইয়াজিদ বলেন, 'জুমাবার নামাজের পূর্বে আমরা মসজিদে আলোচনার মজলিশে বসে থাকতাম।' (আল মুসান্নাফ; ইবনে আবি শায়বা, ১/৪৬৮, মাকতাবাতুর রুশদ) অন্য বর্ণনানুসারে, 'জুমাবার প্রথম আজানের পূর্বে আমরা মসজিদে আলোচনা শুনতে বসে থাকতাম। আর প্রথম আজান দেয়ার সময় মজলিশের সমাপ্তি ঘটতো। (তাবাকাতুল মুহাদ্দিসিন বিইসবাহান; আবুশ শায়খ, ৪/১৯০, মুয়াসসাসাতুর রিসালা)
আবুজ জাহিরিয়্যাহ বর্ণনা করেন, জুমাবার আমি আবদুল্লাহ ইবনে বুসর (রা.) এর মজলিশে বসে আলোচনা শুনতাম। ইমাম আসা পর্যন্ত তিনি নিয়মিত হাদিস বর্ণনা করতে থাকতেন। (আল মুসতাদরাক, ১/৪২৪, দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ) বিবৃত হয়েছে যে, সালমান আল ফারসি (রা.) জুমাবার জায়দ ইবনে সুহানকে নির্দেশ করে বলতেন, যাও! নিজের সমাজকে উপদেশ দাও। (আত তাবাকাতুল কুবরা; ইবনে সাদ, ৬/১৭৭, দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ)
মুয়াবিয়া ইবনে কুররা উল্লেখ করেন, আমি মুজায়না গোত্রের ৩০ জন সাহাবিকে দেখেছি যে, জুমাবার তাঁরা গোসল করতেন, উত্তম কাপড় পরিধান করতেন, স্ত্রীদের থেকে চেয়ে নিয়ে হলেও সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং তারপর মসজিদে আগমন করতেন। মসজিদে এসে প্রথমে তাঁরা ২ রাকাত নামাজ আদায় করতেন। অতঃপর ইমাম আসার আগ পর্যন্ত তাঁরা ধর্মীয় জ্ঞান ও সুন্নাহ নিয়ে আলোচনা করতে থাকতেন। (আল ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ; খতিব বাগদাদি, ২/২৭২, দারুবনিল জাওযি/ তারিখু দামেস্ক; ইবনে কাসির, ৫৯/২৬৯, দারুল ফিকর)
দুই.
মাহদি ইবনে মায়মুন বলেন, আমি আবুল আ'লা, আল জারিরি, আবু নোমান আস সাদি, আবু নোমান আল হানাফি, মায়মুন ইবনে সিয়াহ এবং আবু নাদরা (রহ.); তাঁদের সবাইকে জুমাবার নামাজের পূর্বে সমবেত হয়ে ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করতে দেখেছি। বর্ণনাকারী বলেন, মাহদি ইবনে মায়মুন আরও কয়েকজন তাবেয়ির নাম উল্লেখ করেছিলেন। তবে নামগুলো আমার মনে থাকেনি। (আল ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ; খতিব বাগদাদি, ২/২৭৪, দারুবনিল জাওযি) স্মর্তব্য যে, উল্লিখিত নামসমূহ থেকেও তাবেয়িগণের সাধারণ কর্মপন্থা প্রস্ফুটিত হচ্ছে। তাঁরা ছিলেন শীর্ষস্থানীয় তাবেয়ি এবং সরাসরি সাহাবিগণের সাহচর্য লাভকারী মহান জ্ঞানতাপস।
তিন.
প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.) বর্ণনা করেন, জুমাবার আমি ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল কাত্তান, মুয়াজ ইবনে মুয়াজ এবং হাম্মাদ ইবনে মাসআদা (রহ.)-কে দেখেছি নামাজের পূর্বে জড়ো হয়ে জ্ঞানবিষয়ক আলোচনা করতে। এসময় আরও ৩০ জন মুসল্লি তাঁদের পাশে বসে আলোচনা শুনছিল। অবশ্য কিছু লোক ব্যক্তিগত আমল তথা নফল নামাজ ইত্যাদিতে মগ্ন ছিল। (আল জামি লি আখলাকির রাওয়ি; খতিব বাগদাদি, ২/৬৩, মাকতাবাতুল মাআরিফ)
ইবনুল কাসিম (রহ.) বলেন, জুমার দিন ইমাম যখন মিম্বারে চড়েছেন তখন আমি প্রত্যক্ষ করলাম যে, ইমাম মালিক (রহ.) মসজিদের ভেতর এক মজলিশে ছাত্রদের নিয়ে জ্ঞানবিষয়ক আলোচনা করছেন। ইমাম আসার পরই তিনি আলোচনা বন্ধ করে দেননি। বরং ইমাম যখন খুতবার জন্য দাঁড়ালেন তখনই ইমাম মালিক এবং তাঁর শিষ্যগণ ইমামের খুতবার প্রতি মনোযোগী হলেন। ইবনুল কাসিম আরও বলেন, ইমাম মালিক (রহ.) আমাকে অবগত করেছেন যে, পূর্ববর্তী আলেমগণও জুমাবার খুতবার আগে মসজিদে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। (আল মুদাওয়ানাতুল কুবরা; আত তানুখি, ১/১৪৮, দারু সাদির)
উপর্যুক্ত সাহাবি, তাবেয়ি ও মুহাদ্দিসগণের জীবনী থেকে উদ্ধৃত সবকটি তথ্যের আলোকে বলা যায় যে, জুমাবার খুতবার আগে ধর্মীয় জ্ঞানবিষয়ক বয়ান বা আলোচনা উম্মাহর নিরবচ্ছিন্ন কর্মপন্থায় চলে আসা একটি বিষয়। সুতরাং এটাকে বেদআত বা নবআবিষ্কৃত বলার কোনো অবকাশ নেই।
আর যে হাদিসে জুমাবার খুতবার পূর্বে বৈঠক করতে নিষেধ করা হয়েছে- সে সম্পর্কে হাদিস ব্যাখ্যাতাগণ স্পষ্ট বলেছেন যে, নিষিদ্ধ বৈঠক বলতে পার্থিব গল্পগুজবের জন্য সমবেত হওয়াকে বোঝানো হয়েছে। বস্তুত তেমন বৈঠক মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা থেকে বারণ করে এবং হৃদয়কে গাফিল বানিয়ে দেয়। অন্যদিকে একথা বলারও কোনো সুযোগ নেই যে, খুতবার আগে পৃথক বয়ান মুসল্লিদের জন্য ইবাদত থেকে ডিস্টার্বের কারণ হয়। কেননা বয়ানের সঙ্গে প্রত্যেক মসজিদেই সুন্নত আদায়ের সুযোগ থাকে। তাছাড়া এই বয়ানও তো ধর্মীয় জ্ঞানবিষয়ক একটি আলোচনা। সুতরাং এটি ডিস্টার্বের কারণ, বরং মানুষকে ইবাদত ও ইসলামি বিধিবিধান অনুসরণে অনুপ্রাণিত করবার একটি কার্যকরী ও ফলপ্রসূ মাধ্যম। বস্তুত এই আলোচনার দ্বারা বহু মানুষের জীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে- এমন অনেক সাক্ষী আমাদের সমাজে অনায়াসে খোঁজে বের করা যাবে।
সংক্ষিপ্ত এই লেখাটি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ (২৮.০৯.১৮) পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো।
©® শায়েখ Mahfuz Ahmad হাফিযাহুল্লাহ।