11/10/2024
⇲ শহীদ আবরার ফাহাদ : ফ্যাসিবাদ পতনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে যার শাহাদাতে ⇱
| ঘটনার সারসংক্ষেপ |
৭ অক্টোবর ২০১৯। সকালের দিকেই বুয়েটে একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর জানা যায়। রাতে তাকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর ফজরের দিকে হলের সিঁড়িতে লাশ পাওয়া যায়। এটা নিয়ে বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। শুরুতে প্রমাণ লোপাট করতে ষড়যন্ত্র করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ যাতে নষ্ট করতে না পারে সেজন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করে তা সংগ্রহ করে। সিসিটিভি পর্যালোচনায় বেরিয়ে আসে হত্যার আসল রহস্য। রাতে ডেকে নিয়ে একটি রুমে সারারাত নির্যাতন করে হত্যা করার চিত্র ফুটে ওঠে সিসিটিভির ফুটেজে। ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবিতে স্লোগানে ফুঁসে ওঠে সারাদেশের সকল ক্যাম্পাস। হ্যাশট্যাগে সারাদেশের মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সংহতি জানায়। সারাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
| শিবির ট্যাগিং সংস্কৃতি |
বিগত সাড়ে পনের বছরে বিরোধী দল ও মত দমনে ‘শিবির ট্যাগিং’সহ আরো কিছু ট্যাগিং সংস্কৃতি চালু করেছিল স্বৈরাচার সরকার। শিবির করলেই তাকে নির্যাতন, এমনকি মেরে ফেলা জায়েজ করা হয়েছিল এই ট্যাগিং সংস্কৃতির মাধ্যমে। ছাত্রশিবিরের ওপর যে নির্যাতন-নিপীড়ন তারা চালিয়েছিল এই ট্যাগিং সংস্কৃতির মাধ্যমে, তা নিয়ে একটা সময় পর্যন্ত জাতি নির্বিকারছিল। কিন্তু ফ্যাসিবাদ তার সীমা বাড়াতে বাড়াতে একসময় সাধারণ মানুষকেও এই ট্যাগিং ব্যবহার করে নির্যাতন করা শুরু করে। ততক্ষনে এদেশের মানুষ বয়লিং ফ্রগ সিন্ড্রমে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় শিবির ট্যাগিং দিয়ে হত্যা করা হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিশ্বজিতকে। আবরার হত্যার পরও আবরারের বাবাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আবরার আসলেই শিবির করত কিনা? বড়ই আশ্চর্যের বিষয়! যেন, শিবির করলে আবরারের হত্যা জায়েজ হয়ে যেত! জাতির জন্য চরম হতভাগ্যের বিষয় যে, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এজাতি ফ্যাসিবাদ সরকার থেকে মুক্তি পেলেও ফ্যাসিবাদের শিবির ট্যাগিং সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি মুক্তি পায়নি।
| দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক আদর্শ নাগরিকের মডেল শহীদ আবরার ফাহাদ |
আবরার ফাহাদকে যে ইস্যুতে হত্যা করা হয়, তা মূলত ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর কিছু ফেসবুক পোস্ট। তিনি নিয়মিতই দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিষয়ে লেখালেখি করতেন। তাঁর ফেসবুক একাউন্টে এখনো সেগুলো দৃশ্যমান। যেরকম মানুষ গঠন হলে এদেশ সমৃদ্ধি লাভ করবে, এদেশ নিরাপত্তা লাভ করবে এবং সোনার বাংলাদেশে পরিণত হবে, সেরকম মানুষেরই এক মূর্ত প্রতীক ছিলেন শহীদ আবরার ফাহাদ। তাঁর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে জানতে পারা যায়, তিনি ছিলেন আল্লাহর একজন বিশ্বাসী বান্দার অন্তর্ভুক্ত। যেমন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, তেমন চরিত্রবান। বন্ধুদের সাথে মোয়ামেলাতও (আচার-আচরন, চলাফেরা) ছিল অসাধারণ। তিনি আমাদের পরবর্তী জেনারেশনের (Zen-G, Zen-alpha) হিরো। ছাত্রশিবির সারাদেশে তার মতো সৎ, দক্ষ, চরিত্রবান, দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরির ভিশন নিয়েই কাজ করছে।
| ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম ওপেন সিক্রেট থেকে ওপেন |
সারাদেশে ফ্যাসিবাদ কায়েমের একটি অন্যতম অস্ত্র ছিল শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাসের হাতিয়ারের মুখে জিম্মি করা। তা বাস্তবায়নে কাজ করে আওয়ামীলীগের স্বসস্ত্র সন্ত্রাসী ছাত্রসংগঠন 'ছাত্রলীগ'। আওয়ামীলীগের ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে লেজুড়বৃত্তি করা এই সংগঠনটি পুরোপুরি একটি সন্ত্রাসী সংগঠনে রূপ নেয়। খুন, ধর্ষণ, হলের মেয়েদের জোর করে দেহব্যবসায় বাধ্য করা, মাদক বাণিজ্য, চোরাকারবারি, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, প্রক্সি বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষক লাঞ্ছনা, অভিভাবক লাঞ্ছনা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ এহেন কোনো খারাপ কাজ নেই যা ছাত্রলীগ করেনি। এসব প্রকাশ্যে করলেও তা নিয়ে কথা বলা যেত না। আবরার ফাহাদের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে মানুষের মাঝে সাহসের সঞ্চার হয়। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে। শুধুমাত্র ছাত্রলীগের নিষিদ্ধ চাওয়া তাদেরই সরকারের কাছে শক্তিশালী গ্রাউন্ড পেতো না, ফলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সোচ্চার হয়। এরই প্রেক্ষিতে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। ছাত্রলীগের কারণে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে ট্রমায় ভুগছে তা এখনো বিদ্যমান।
**
| শহীদ আবরার ফাহাদ থেকে শহীদ আবু সাঈদ |
বিগত সাড়ে ১৫ বছরে যে ফ্যাসিবাদের জগদ্দল পাথর আমাদের মাথার ওপর চেপে বসেছিল, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু হয় ফ্যাসিবাদ কায়েমের শুরু থেকেই। ফ্যাসিস্ট কায়দায় বিরোধী দল-মত দমনের যে প্রক্রিয়া তারা শুরু করেছিল, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় এদেশের মুক্তিকামী কিছু সচেতন নাগরিক। দিনে দিনে ফ্যাসিজম বিস্তৃতি লাভ করেছে আর সেই মিছিলে সমবেত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। যে মিছিল তিলে তিলে গড়ে উঠেছিল, শহীদ আবরারের শাহাদাতের ঘটনায় তা বিক্ষোভে রূপ নেয়। এরপর বিভিন্ন ইস্যুতে ছাত্রদের নানা আন্দোলন গড়ে ওঠে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ছিল এর অন্যতম। সর্বশেষ জুলাই বিপ্লবে আবরার ফাহাদ শাহাদাতের শক্তি নিয়ে ফিরে এসেছিল শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মীর মুগ্ধ হয়ে। হাজারো শহীদ প্রাণ দিয়েছে আবরারের দেশপ্রেমের চেতনাকে ধারণ করে।
এদেশের বুকে আবরার বেঁচে থাকলে কখনো ফ্যাসিবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এদেশের নতুন জেনারেশন হয়ে উঠুক একেকজন আবরার ফাহাদ।