28/02/2026
যে জীবন শাহাদাতে উদ্দীপ্ত
সে জীবন বাঁধা মানে না।
ঈমানের অগ্নি পরীক্ষয় উত্তীর্ণ: কিশোর সাজ্জাদ ভাইয়ের অমলিন স্মৃতি
ইতিহাসের কিছু দিন আছে যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং রক্তে লেখা স্মৃতি। তেমনই এক দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
বিশ্ববরেণ্য মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ.) কে ন্যায়ভ্রষ্ট বিচারে ফাঁসির রায় ঘোষণার প্রতিবাদে সারাদেশের তাওহীদী জনতার ঢল নেমেছিল রাজপথে। সে দিন কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, কক্সবাজার জেলার আহ্বানে কক্সবাজারের আপামর জনসাধারণ প্রতিবাদ ও কর্মসূচিতে শামিল হয়। উত্তাল রাজপথের সেই তরঙ্গে যোগ দিয়েছিল আমাদের প্রিয় কিশোর শহিদ মো. সাজ্জাদ হোসাইন ভাই।
মাত্র পনেরো বসন্ত অতিক্রম করা এক কোমল প্রাণ এসএসসি পরীক্ষার প্রাঙ্গণে যার কলমের কালিতে ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচিত হওয়ার কথা ছিল, সেই হঠাৎ ইতিহাসের নির্মম অধ্যায়ে নিজের রক্তের অক্ষরে লিখে গেল শাহাদাতের এক লাল অধ্যায়। ঈমানের অগ্নি-পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি শামিল হলেন শহীদের কাফেলায়। পরীক্ষার খাতা তিনি শেষ করতে পারেননি, কিন্তু জীবনের মহাপরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন এমন এক মর্যাদায়, যা দুনিয়ার কোনো সনদে মাপা যায় না।
১২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ পূর্ব মেহেরনামার মাটির ঘরে জন্ম নেওয়া সেই শিশুটি বড় হয়েছিল সরলতার আলোয়, দারিদ্র্যের ছায়ায়, কিন্তু ঈমানের দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে। কৃষক পিতা জামাল আহমেদ ও স্নেহময়ী জননী ছফুরা বেগমের আদরের সন্তান শহিদ সাজ্জাদ। যার ঘর ছিল মাটির দেয়াল আর টিনের ছাউনি দিয়ে গড়া; যার স্বপ্ন ছিল আকাশসম, অথচ পায়ের তলা ছিল মাটির মতোই দৃঢ়।
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ বিকাল প্রায় তিনটা। পেকুয়া বাজারের রাজপথে হঠাৎ নেমে ফ্যাসিবাদের পুলিশবাহিনী ও জালিম হাসিনার ভ্যানগার্ড আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগের হিংস্রতা। গর্জে উঠল অস্ত্রের নিষ্ঠুর শব্দ। একটি বুলেট শহিদ সাজ্জাদ ভাইয়ের বাম ভ্রুর উপর বিদ্ধ হয়ে পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে গেলো সাথে নিয়ে গেল তার কিশোর মস্তিষ্কের রক্তিম অংশ, পিচঢালা রাস্তায় পড়ে রইলো স্বপ্নবাজ তরুণের মস্তিষ্ক। মানবতার বিভৎস একটি দৃশ্য করে খুনিরা, কেড়ে নিলো একটি সবুজ প্রাণ কিন্তু নিতে পারল না তার ঈমান, তার অটলতা, তার আদর্শ। ঘটনাস্থলেই সে লুটিয়ে পড়ল কিন্তু তা ছিল না পতন; ছিল আরশের দিকে উত্তরণ।
সে দিন তার এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র অপূর্ণ রয়ে গেলো, কিন্তু পূর্ণ হলো শাহাদাতের সনদ। পার্থিব শিক্ষার অধ্যায় থেমে গেলো, কিন্তু আখিরাতের চিরন্তন অধ্যায় শুরু হলো নূরের অক্ষরে।
নিজ গ্রাম পূর্ব মেহেরনামার ছোট্টএকটি মসজিদের নির্জন কবর তাকে আগলে রেখেছে। মাটির নিচে শায়িত সে কিশোর, কিন্তু ঈমানদারদের হৃদয়ে সে জাগ্রত। তার বৃদ্ধ দাদি আজো চোখ মুছতে পারেন না; পিতা জমির আইলে দাঁড়িয়ে নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন; মাতা সন্তানের শৈশবের স্মৃতি বুকে চেপে কান্না লুকান। ভাইবোনেরা সাদিয়া, সাইয়্যেম, তানিয়া, তামান্না, তানিম প্রতিদিন বড় হচ্ছে, কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে চিরদিন ছোট্ট হয়ে আছে তাঁদের শহীদ ভাই।
আমরা গেলেই শহিদ সাজ্জাদ ভাইয়ের মতো করেই আদর দিয়েই আমাদের বরণ করে, মেহমানদারি করে। তাঁরা যেন ইসলামী ছাত্রশিবিরে দায়িত্বশীল ও জনশক্তিদের মাঝেই খুঁজে পান প্রিয় সাজ্জাদ ভাইকে।
আজ তার শাহাদাতবার্ষিকীতে আমরা তাকে স্মরণ করছি এবং দোয়া করি
হে আল্লাহ! শহিদ সাজ্জাদ ভাইকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন, তাঁর কবরকে জান্নাতের নূরে আলোকিত করুন এবং তাঁর পরিবারকে সবর ও ইস্তিকামাত দান করুন।
★ ব্যক্তিগত তথ্য:
• নাম : মো. সাজ্জাদ হোসাইন
• পেশা : এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন।
• জন্মতারিখ ও বয়স : ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৭; বয়স ১৫ বছর।
• আহত হওয়ার তারিখ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।
• আহতের ধরন ও পরবর্তী অবস্থা : বাম ভ্রুর ওপর গুলি বিদ্ধ হয়ে পেছন দিক দিয়ে মগজসহ বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
• আহত হওয়ার স্থান : পেকুয়া বাজার।
• শাহাদাতের তারিখ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বিকাল ৩টা।
• দাফন : পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
• স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম—পূর্ব মেহেরনামা; ডাকঘর—পেকুয়া; থানা—পেকুয়া; জেলা—কক্সবাজার।
★ পারিবারিক তথ্য:
• পিতা : জামাল আহমেদ। পেশা: কৃষক
• মাতা : ছফুরা বেগম। পেশা: গৃহিণী
• ভাইবোন : তিন ভাই ও দুই বোন