06/01/2026
ক্ষমতা যখন আইনকে অপহরণ করে,
----------------
আবুল কাশেম "
আইন একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। আইনই নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এবং ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে। কিন্তু যখন ক্ষমতা আইনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার বা অপহরণ করে, তখন সেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ন্যায়বিচার থেকে সরে যায়—গণতন্ত্র পরিণত হয় একধরনের ছায়া ব্যবস্থায়।
ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হয় তখনই, যখন শাসকগোষ্ঠী আইনকে সমতার মানদণ্ড না রেখে নিজের নিরাপত্তা ও আধিপত্য রক্ষার হাতিয়ার বানায়। আইন প্রণয়ন হয় জনগণের কল্যাণের জন্য নয়, বরং ভিন্নমত দমন, প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা এবং ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য। এতে করে আইনের সামনে সমতার নীতি ভেঙে পড়ে—একই অপরাধে একের জন্য শাস্তি, অন্যের জন্য দায়মুক্তি।
আইন অপহরণের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো ন্যায়বিচারের অবক্ষয়। বিচার ব্যবস্থা যখন রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন আদালত ন্যায়ের আশ্রয়স্থল না হয়ে ক্ষমতার অনুমোদন সিল দেওয়ার কারখানায় পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ তখন আইনের ওপর আস্থা হারায়; জন্ম নেয় ভয়, নীরবতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি।
ক্ষমতা যখন আইনকে অপহরণ করে, তখন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। তারা জনগণের সেবক না হয়ে ক্ষমতার রক্ষীতে পরিণত হয়। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘন বাড়ে, সংবাদমাধ্যম সংকুচিত হয়, আর সুশীল সমাজ ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
তবে ইতিহাস বলে—আইনকে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা যায় না। নাগরিক সচেতনতা, স্বাধীন গণমাধ্যম, শক্তিশালী সুশীল সমাজ এবং নৈতিক নেতৃত্বই পারে আইনকে ক্ষমতার কবল থেকে মুক্ত করতে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা মানে ক্ষমতাকে আইনের অধীন করা, আইনকে ক্ষমতার অধীন নয়।
শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার ক্ষমতায় নয়, তার আইনে। আর সেই আইন যদি অপহৃত হয়, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরাই গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত।