10/04/2026
কুকুরটা বাঁচার জন্য ছটফট করছে মাজারের পুকুরে। কাছেই দারোয়ান টাইপের এই লোকটা সহ শতাধিক মানুষ ক্যামেরা হাতে এই দৃশ্য দেখছে। হঠাৎ মসজিদের মাইকে আজানের সুর শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু কিছুতেই কুকুরটা উপরে উঠে আসতে পারছে না। চাইলেই টেনে তোলা সম্ভব। তবে কেউই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো না। পৈশাচিক আনন্দ নষ্ট হয়ে যাবে যে!
কুমিরটা খুব ধীরগতিতে কুকুরটার দিকে এগিয়ে আসছে। তাঁর কোন তাড়া নেই। শিকার পালাতে পারবে না, সে জানে। কারণ সে এই ঘটনার সাথে অভ্যস্ত।
একবার নয়, দুবার নয়। হাজারবার। ধলাপাহাড়ের মৃত্যুর সময় বয়স নাকি হয়েছিলো ১০০ বছর। তাহলে বলা যায় প্রায় সহস্র-লক্ষাধিকবারেরও বেশী এসব রেডিমেড শিকারের স্বাদ গ্রহণ করেছে সে।
শেষ পর্যন্ত কুকুরটা আর পালাতে পারেনি। হয়তো ওর পা ভেঙ্গে কেউ এখানে ফেলে দিয়েছিলো। অথবা পা দড়ি দিয়ে বেঁধে। কিছু একটা করেছে। নয়তো সহজেই উঠে আসার কথা। পা বাঁধার কথাই অনেকে বলছে। ভিডিও দেখেও সিওর হতে পারিনি।
এক পর্যায়ে নিরীহ অবুঝ প্রাণীটার ঘাড় মটকে ধরে কুমির নিজের ক্ষুধা মিটায়। আশেপাশে থাকা শতাধিক নিষ্ঠুর মানুষগুলো এই দৃশ্য উপভোগ করলো।
২০২৬ সাল। অথচ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ডুবে আছে দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ।
কারো বিয়ে থেমে আছে, কারো ঘরে নেই সন্তান, কারো ঘরে দারিদ্র্যতা নাচে, কারো দাম্পত্যের অবসান। কারো ছেলে বই ছেড়ে দেয়, মন বসে না পড়ায়, কারো শরীর রোগে ভাঙে, দিন কাটে শুধু কষ্ট ছায়ায়।
কেউ মামলায় জড়িয়ে পড়ে, কেউ আবার জিতে যায়, জীবনের এই টানাপোড়েন, সবাই নিজের সমাধান চায়। আর সব সমস্যার একটাই সমাধান, মাজারের কালা...ধোলা পাহাড়দের করাতে হবে ভুঁড়িভোজ।
কখনো মুরগি, কখনো হাঁস, কখনো ছাগল বলি, যত সমস্যা, সব নাকি মেটে, এই বিশ্বাসেই বলে 'আমরা চলি'। জঙ্গলের কুমিরও পায় না এত রাজার ভোজ, এখানে শুধু মানতকারীর অন্ধ বিশ্বাসেই মিলে সমাধানের খোঁজ।
ফেসবুকে কিছু পেজই আছে। যাদের কাজ হচ্ছে প্রতিদিন বাগেরহাট খান জাহান আলী মাজারের কুমিরের মানতের জীবন্ত পশু প্রাণীর ভক্ষনের দৃশ্য ভিডিও করে।
আজকেও তেমনই একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়েছে। অত্যন্ত হৃদয় বিদারক দৃশ্য।
কিছুদিন আগে দেখলাম, একজন মা তাঁর ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। হাফেজ বানানোর মানত করেছেন। মানতের পশু কুমিরকে খাওয়াতে এসেছেন। যেন ছেলেকে হাফেজ বানাতে পারেন।
বেটি তুই তোর সন্তানকে হাফেজ বানাবি। কুরআনের পাখি বানাবি, ভালো কথা। সন্তানের মেধা বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ্ তায়ালার কাছে চা!
তুই মাজারের মৃত লাশের কাছে কেন চাইবি! তুই কেন কুমিরের কাছে চাইবি? তোদেরকে কী কেউ শিরক কী! শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে কখনও বলেনি?
মাজারপূজারীদেরকে নিয়ে লিখতে গেলে অনেকেই ক্ষ্যাপে যায়। ক্ষমার অযোগ্য গুনাহ! শিরক সম্পর্কে মানুষকে জানাতে, বুঝাতেও দিতে চায় না। তারা যা খুশি করুক। তাতে অন্যদের কী!
১৯৫৭ সালে সোভিয়েত যখন পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমবার মহাকাশে কোন প্রাণী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ নিরীহ কুকুর লাইকাকে যখন সু**সাইড মিশনে পাঠানোর সংবাদে তখন বিশ্বের প্রাণীপ্রেমীরা গিনিপিগ হিসেবে এই অভিযানের নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলো।
লাইকার আত্মহুতির মধ্য দিয়ে মানুষ স্পেসে গিয়েছে, চাঁদেও গিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানের জন্য কুকুর লাইকা হত্যার লজ্জার দাগ আজও মুছেনি।
অথচ খান জাহান আলী মাজারসহ নানান মাজারে মানতের নামে কয়েক যুগ ধরে চলে আসা কুমিরের কাছে জীবন্ত প্রাণী হ//ত্যার সংস্কৃতি আজও বন্ধ হয়নি। এই ব্যাপারে দেশের কোন মন্ত্রনালয়ের মাথা ব্যথা নেই।
দেশের People for Animal Welfare Foundation, Bangladesh (PAW), Bangladesh Animal Welfare Foundation (BAWF) এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোরও কী কিছুই করার নেই?
আজকের কুকুরের ঘটনাটি হয়তো কোন মানতের ঘটনা নয়। বদমাইশি করে কেউ ঘটিয়েছে। কিন্তু এই মাজার ব্যবসায়ীদের কাছে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। যুগের পর যুগ ধরেই কুমিরের ভুঁড়িভোজ তাদের কাছে উপার্জন ও বিনোদনের অংশ।
মাজারে মানতের নামে এই প্রাণী হত্যার ভন্ডামি বন্ধে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি!
কুমিরগুলোকে সুন্দরবনের মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা হোক।
- অন্তর মাশঊদ
https://www.facebook.com/100001032607659/posts/26898938349723888/?app=fbl