20/10/2025
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে।
ঢাকা শহরের ট্রাফিকজ্যামে গাড়িগুলো ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। জানালার কাঁচে টোকা পড়ল টুং করে-
“ভাই একটু দান করেন, আল্লাহ ভরসা।”
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একজন হিজরা - চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লালচে রঙ, কিন্তু চোখ দুটো নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো নিস্তেজ। চালকের আসনে বসা মানুষটি বিরক্ত হয়ে জানালা তুলে দিলেন। গাড়ির পেছনে বসা শিশু চুপ করে তাকিয়ে রইল সেই মুখটার দিকে, যে আসলে হাসছে, কিন্তু চোখের ভেতরে ভাঙা কাচের মতো ব্যথা লুকিয়ে আছে।
তার নাম রুহি। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। ছোটবেলায় বুঝতেই পারেনি, সে অন্যদের মতো নয়। স্কুলে সবাই তাকে নিয়ে হাসত, শিক্ষক তাকে আলাদা বেঞ্চে বসাতেন। একদিন তার বাবা বলেছিলেন,
“তোর জন্য আমাদের মুখ দেখানো দায় হয়ে গেছে।”
সেদিনই রুহি ঘর ছেড়ে চলে যায়। তারপর থেকে রাস্তাই তার বাসা, ট্রেনের কামরাই তার আশ্রয়।
আমরা প্রতিদিনই এমন দৃশ্য দেখি - রাস্তা, বাজার, দোকান কিংবা গাড়ির জানালায় হিজরাদের চাঁদা দাবি, হাততালি, গালাগাল। আমরা বিরক্ত হই, মুখ ফিরিয়ে নিই। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি, তারা কেন এমন পথে যেতে বাধ্য হয়?
সমাজ তাদের জায়গা দেয়নি।
নারী ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন - এসব কথার মাঝে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো পড়ে থাকে পরিত্যক্ত হয়ে।
শিক্ষা, দক্ষতা, চাকরি - সব জায়গায় বঞ্চিত তারা।
আমরা যদি ভেদাভেদ না করে তাদেরকে সুযোগ দিতাম, তাহলে তারা মানুষকে হয়রানি ও চাঁদাবাজির পথে যেতে বাধ্য হতো না।
🌿 মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থার আলো: হায়্যা ‘আলাল ফালাহ’ প্রকল্প
এই অবহেলিত মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছে মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা - “হায়্যা ‘আলাল ফালাহ’ প্রকল্প”।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো, সমাজের প্রতিটি স্তরে “ফালাহ” অর্থাৎ কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।
এখানে মসজিদ আর কেবল নামাজের স্থান নয় - এটি হচ্ছে সমাজের কেন্দ্রবিন্দু, একটি সম্পূর্ণ কমিউনিটি সিস্টেম।
এই প্রকল্পের আওতায় এখন প্রতিটি মসজিদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে:
👉 শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র
👉 বয়স্কদের সেবাকেন্দ্র
👉 আর নতুন সংযোজন হিসেবে “তৃতীয় লিঙ্গ পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র।”
রুহির জীবনে আলো ফেরে এই কেন্দ্রের হাত ধরেই।
একদিন মসজিদের ইমাম সাহেব তাকে রাস্তা থেকে ডেকে নেন। রুহি ভয় পায় - ভাবল, হয়তো তাড়িয়ে দেবে।
কিন্তু ইমাম হাসলেন, বললেন,
“তুমি মানুষ। আল্লাহর সৃষ্টি। এখানে তোমার জায়গা আছে।”
রুহিকে পাঠানো হলো কেন্দ্রটিতে।
সেখানে সে শিখলো সেলাই, হস্তশিল্প, ডিজাইন।
তার মতো আরও দশজন তৃতীয় লিঙ্গ নারী সেখানে কাজ শিখছে -
কেউ খাবার রান্না করে, কেউ শিখছে কম্পিউটার অপারেশন, কেউ আবার স্থানীয় স্কুলে শিশুদের গান শেখায়।
মসজিদ থেকে সংগৃহীত দানের অর্থ - সমাজের ধনী শ্রেণি যেটি স্বেচ্ছায় দেয় - এই কেন্দ্রগুলোর খরচ চালায়।
কিন্তু এই দান শুধুই করুণা নয়।
এটি এক বিনিয়োগ - একটি নিরাপদ, নৈতিক, শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের বিনিয়োগ।
কারণ আজ যে মানুষ সমাজচ্যুত, যদি তাকে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া যায়, সেই কাল সমাজের জন্য কল্যাণের দূত হয়ে দাঁড়াবে।
আজ রুহি আর রাস্তায় হাততালি দেয় না।
সে এখন নিজের বানানো কাপড় বিক্রি করে।
মসজিদের পাশে এক ছোট্ট ঘরে তার নিজস্ব টেইলার্স দোকান। নাম দিয়েছে “আল-ফালাহ ক্রিয়েশনস।”
প্রতিদিন নামাজ শেষে ছোট্ট শিশুদের হাসির শব্দ ভেসে আসে, রুহি মাথা তুলে বলে -
“আগে আমি শুধু টোকা দিতাম মানুষের জানালায়, এখন টোকা দিই নিজের ভাগ্যের দরজায়।”
এই হল হায়্যা ‘আলাল ফালাহ’ প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য।
এটি শুধু নামাজের আহ্বান নয়, এটি এক আহ্বান -
সমাজের প্রতিটি মানুষকে সঙ্গে নেওয়ার,
অবহেলিতদের প্রতি হাত বাড়ানোর,
আর আল্লাহর সৃষ্টি প্রতিটি প্রাণকে মর্যাদার আসনে বসানোর।
যেদিন আমাদের প্রতিটি মসজিদ এমন হবে,
সেদিন রুহির মতো কেউই আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে “চাঁদা” চাইবে না।
তারা নিজের সম্মানেই বাঁচবে, নিজের শ্রমেই গড়বে নিজের “ফালাহ্” - নিজের কল্যাণ। 🌿
একটি কাল্পনিক গল্প-
তবু এমন গল্প সত্যি করতেই আমরা কাজ করি।
Waheed Electricians' Welfare Foundation.
সোমবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৫
২৬ রবিউস সানি ১৪৪৭ হিজরী
৪ কার্তিক ১৪৩২