22/04/2025
সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাদুর নাম ‘বই পড়া’। আর কোনো জাদুর এমন সাধ্য নেই যে দু মলাটের ভেতরে অন্য এক পৃথিবীর সন্ধান দেয়। মলাটবন্দী, জাদুমাখা ছোট ছোট অক্ষরগুলো হয়ে ওঠে মুক্তির প্রতীক। কখনো এই অক্ষরে চেপে ঘুরে আসি লস এঞ্জেলস থেকে,কখনো বা নর্থ পোল। অতি পরিচিত বিছানায়, বালিশে হেলান দিয়ে কখনো ঝাঁপ দিচ্ছি পাহাড় থেকে, কখনো বা ডুব দিচ্ছি সাগরতলে। কখনো ছুটছি শত্রুর পেছনে কখনো বা বন্ধুর হাত ধরে।
মাটির উঠোনের এক প্রান্তে বসে কখনো ঘুরে বেড়াচ্ছি সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে কখনো বা সঙ্গী হচ্ছি মোগলদের। বাহাদুর শাহ পার্কে প্রহসনের বিচার দেখে বন্ধ করে ফেলছি চোখ। আবার শাহজাহানের সাথে হেঁটে হেঁটে দেখছি তাজমহলের নির্মাণযজ্ঞ। কখনো হাজির হচ্ছি দেশভাগ আর দাঙ্গার সময়ে। ব্যথাতুর হৃদয়ে দেখছি চিরচেনা মাটি,নদী,ঘর,প্রেম ছেড়ে মানুষের চলে যাওয়া। কখনোবা আতঙ্কে, অবিশ্বাসে চেয়ে চেয়ে দেখছি ধর্মের নামে মানুষ হ ত্যা।
দু’মলাট কখনো নিয়ে যাচ্ছে আরণ্যকের অরণ্যে, কখনো যাচ্ছি বুনো পশ্চিমের দুনিয়ায়। আরণ্যকে যেমন সবুজ আর সুন্দরের হাতছানি দেখে মুগ্ধ হচ্ছি,তেমনি বুনো পশ্চিম দেখাচ্ছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। সাই সাই করে ছুটছে বুলেট। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখছি গান ফাইট। ছলকে উঠছে বুকের রক্ত। আবার সবশেষে ঘোড়ায় চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছি পশ্চিমের বুনো সৌন্দর্যে।
কালো কালো অক্ষর কখনো হাতছানি দেয় রহস্য সমাধানের। তখন প্রাণ হাতে নিয়ে দুর্ধর্ষ সব অপরাধীর পেছনে ছুটতে হয়। সামলাতে হয় মুহুর্মুহু আক্রমণ। কিন্তু হাল ছাড়িনা কখনো। সমাধান করে তবেই ক্ষান্ত দেই। কখনো আবার এই অক্ষরগুলোই আটপৌরে যাপিত জীবনের গল্প শোনায়। যে আমি আগের বইয়ে পৃথিবীর বিরুদ্ধে হওয়া বিশাল চক্রান্ত বানচাল করে দিয়েছি সেই আমিই তখন যাপিত জীবনের চক্রে কুপোকাত হয়ে যাই।
অক্ষর আর বাক্যের হাত ধরে কখনো হাজির হই ৭১ এর বাংলাদেশে। ঐ তো টি-৩৩ বিমান নিয়ে ছুটছেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান৷ চোখ ফেরাতেই দেখি অপারেশন জ্যাকপটে ধ্বংস হচ্ছে একের পর জাহাজ। সেসব বিস্ফোরণের শব্দ বুকে এসে লাগে। বিস্মিত হয়ে দেখি ক্র্যাকপ্লাটুনের দস্যি ছেলেদের ঝটিকা অপারেশন। শঙ্কায় শুকিয়ে আসে মুখ। রাগে,ঘেন্নায় হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে রাজা-কারদের কর্মকাণ্ড দেখে। সবকিছুর শেষে সাক্ষী হই বিজয়ের৷
মলাটবন্দী অক্ষরগুলো কখনো নিয়ে যায় সুদূর থেকে সুদূরে। ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঘামতে ঘামতে, ঠিকই পৌঁছে যাই তিব্বতের কোনো গুম্ফায়। এদিকে কপালের ঘাম মুছি তো ওদিকে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা কমানোর জন্য পান করি থুকপা। কখনোবা সিলেটের ছোট্ট এক গ্রাম থেকে পৌঁছে যাই আইসল্যান্ড বা নরওয়েতে। হাঁ হয়ে দেখি অরোরার সৌন্দর্য। গলার মাফলারটা ভালো করে পেছিয়ে নিতে ভুল করিনা একদম।
দু মলাটের পৃথিবী কখনো আবার একেবারে পৃথিবীর বাইরে অন্য গ্রহে নিয়ে যায়। নতুন গ্রহে কেমন করে মানুষ বাঁচবে সেই লড়াই দেখি। আবার কখনো একটানে পৌঁছে যাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। স্তম্ভিত হয়ে দেখি বোমাগুলো সবার আগে পড়ছে মানুষের হৃদয়ে। ধ্বসে পড়তে দেখি পারস্পরিক বিশ্বাস,সম্প্রীতি আর সহমর্মিতার মজবুত দেয়াল।
কখনো দেখা যায় হাতে তুলে নিয়েছি একটা আত্মজীবনী। তন্ময় হয়ে নিচ্ছি জীবনের শিক্ষা। আমার হাতের মুঠোয় তখন কেবল বই নয়। হাতের মুঠোয় তখন একটা মানুষের গোটা জীবন,অভিজ্ঞতা,উত্থান পতন,স্বপ্ন আর বেদনার আখ্যান। একটা গোটা জীবন দু মলাটে আর কে দিতে পারে আমায়?
কখনো আবার ডুব দিয়েছি মানুষের শুরুর ইতিহাসে। দেখেছি আমাদের পূর্বপুরুষদের গুহার দেয়ালে ছবি আঁকতে। ঐ তো, সারাদিনের শিকার শেষে অন্ধকারকে ভয় পেয়ে গুটিসুটি মেরে গুহার ভেতর ঘুমিয়ে পড়লেন তারা। তাদের টিকে থাকার লড়াই আমায় জানিয়ে দেয়, কেবলমাত্র অভিজ্ঞরাই এখানে টিকে থাকবে। তাদের ইতিহাস জানান দিচ্ছে,সংঘবদ্ধ থাকার শক্তির ব্যাপারে। বিশ্বাস রাখতে বলছে একতায়।
আর কোন জাদু আমার পূর্বপুরুষের কাছে পৌঁছে দিত পারতো আমায়? কোন জাদু আমাকে একটানে নিয়ে যেতে পারে ইস্তানবুল, প্যারিস, হিমালয় কিংবা আমাজনের গভীরে? আর কোন জাদুবলে আমি ঘুরে বেড়াতে পারি গোটা পৃথিবীময়? আর কোন জাদুতে আমি দর্শক হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারি ইতিহাসের পাতায় পাতায়? কোন জাদু আমার চোখে এনে দিতে পারে এমন বিস্ময়,আনন্দে ভরিয়ে তুলতে পারে মন খারাপের দিনগুলো? একমাত্র বই সেটা পারে। সেজন্যই বই পড়ার চেয়ে বড় জাদু আর হয়না। নতুন বইয়ের ঘ্রাণের চেয়ে মাদকতাময় ঘ্রাণ ও আর পাওয়া যাবে না কোথাও।
অনেকে জিজ্ঞেস করে, বই পড়ি কেন। উঁহু, একদমই জ্ঞান লাভের জন্য নয়। পড়তে ভালো লাগে তাই পড়ি। এইসব ভ্রমণ ভালো লাগে তাই পড়ি। চরিত্রগুলো বন্ধুর মতো আগলে রাখে তাই পড়ি। ছোট্ট একটা গ্রামে বসে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে পৌঁছে যেতে পছন্দ করি, তাই পড়ি। আর মুফতে কিছু জ্ঞান লাভ হলে সেটা বাড়তি পাওনা হিসেবে যোগ হয়। সবাইকে বিশ্ব বই দিবসের শুভেচ্ছা। বই হোক সবসময়ের সঙ্গী।
©Sarafat Noor Chowdhury