03/02/2026
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ উপলক্ষে খেলাফত মজলিসের ৩৫ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। আমাদের আজাদীর আছে লম্বা ইতিহাস। দেশপ্রেমিক মানুষ যুগে যুগে আজাদীর জন্য জীবন দিয়েছেন। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যেমন আমরা বুক টান করে দাঁড়িয়েছি তেমনি পাকিস্তানের জুলুম ও চাপিয়ে দেয়া পরাধীনতার বিরুদ্ধে জীবনক্ষয়ী যুদ্ধে এক সাগর রক্তের মূল্য দিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি। এ জাতি কোন স্বৈরাচারকে মেনে নেয়নি। জুলুম শোষণের বিরুদ্ধে শহীদদের মিছিল লম্বা হচ্ছে। যদিও জনগণের প্রকৃত মুক্তি আজো স্বপ্নই থেকে গেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে জুলাই বিপ্লবের রক্ত সিঁড়ি পার হয়ে আমরা আবার দেশকে নিজেদের মতো গড়ার সুযোগ পেয়েছি। সমস্ত শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আমাদের বীরদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করছি। একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করা খেলাফত মজলিসের অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খেলাফত মজলিসের ৩৫ দফা নির্বাচনী ইশতিহার ঘোষণা করছিঃ
১. জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা:
খেলাফত মজলিস ইতোপূর্বে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের কাছে 'জুলাই সনদ' ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে এই সনদের আইনি ভিত্তি প্রদান করবো এবং এর আলোকেই আগামীর রাষ্ট্র সংস্কার সম্পন্ন করা হবে। জুলাই আন্দোলন সময়কালীন গণহত্যা, শাপলায় সংঘটিত গণহত্যা, বিগত সময়ের গুম, খুন, হত্যা, বিডিআর হত্যাযজ্ঞসহ ফ্যাসিবাদী দু:শাসনামলে সংঘটিত সকল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
আমরা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার করছি। কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন পাস না করা এবং দেশে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পর্যায়ক্রমে খেলাফত আ’লা মিনহাজিন নবুয়্যাহ'র আদলে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
২. আইনের শাসন ও জবাবদিহীতা:
আমরা সরকারের মূলে কার্যকর জবাবদিহীতা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই সরকার পরিচালনা করবে এবং সরকার তার সব কর্মকাণ্ড পরিচালনার ব্যাপারে জনগণের কাছে দায়ী থাকবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাদিহিতা, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
সরকার প্রধান ও রাষ্টপ্রধানের ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা হবে। সংসদ সদস্যদের কর্মপরিধি সুনির্দিষ্ট করে তা অবিলম্বে কার্যকর করা হবে। সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত যে কোন ব্যক্তির কাজে কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলে সরাসরি আইনী ব্যবস্থা নিতে পারবে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে এবং ক্রয় পদ্ধতি ব্যাপক সংস্কার করা হবে। পাবলিক সার্ভিসসহ সকল নিয়োগে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
৩. জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা:
সকল মানুষই জন্মগতভাবে এবং আইনের কাছে স্বাধীন ও সমান। কাউকে নির্যাতন, অমানুষিক অথবা অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তি ভোগে বাধ্য করা যাবে না। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, ভাষা, জাতীয়তা, জন্ম এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের সকল মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা হবে।
বৈষম্যমূলক, নিবর্তন ও নিপিড়ণমূলক আইনসমূহ বাতিল করা হবে। সমাজ থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাদকের বিস্তার রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে। সবার জন্য নিরাপদ বাড়ি এ প্রতিপাদ্যে সকলের নিরাপত্তার প্রতি নজর দেয়া হবে।
গুম, খুন এবং ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কঠোরভাবে বন্ধ করার অঙ্গীকার করছি। অমুসলিম নাগরিকদের উপাসনালয়, জান-মাল এবং সম্মানের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা হবে।
৪. স্বাধীন গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা:
সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের ওপর থেকে অহেতুক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হবে। সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, সাংবাদিকতার মানোন্নায়নে এবং সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ নেয়া হবে।
সংবাদ মাধ্যমের অপব্যবহার রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সরকারি সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা এবং অন্যায় ও অযৌক্তিক কাজের প্রতিবাদ করা যাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক চর্চা অবাধ করা ও নেতিবাচক চর্চার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সাইবার অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো যেসব আইন মানুষের কণ্ঠ রোধ করে এবং মুক্ত চিন্তার অন্তরায়, সেগুলো বাতিল বা সংস্কার করা হবে এবং আইনবিদদের মতামত নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ আইন প্রনয়ণ করা হবে। সকল রাজনৈতিক দলের শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা আনয়ন এবং জনগণের তথ্য অধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে। এটি পরিষ্কার যে, "মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে ইসলাম, আল্লাহ, রাসুল (সা.) এবং ধর্মীয় অনুভূতির অবমাননা করা নয়।" অর্থাৎ, আমরা এমন কোনো বক্তব্য বা প্রচারণাকে সমর্থন করি না যা ধর্মীয় অবমাননা হিসেবে গণ্য হয়।
৫. বিচার বিভাগ:
সামাজিক ন্যায়বিচার ও সামগ্রীকভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত সুবিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হবে; যা একটি উন্নত বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে মামলা-মোকাদ্দমার দ্রুত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও আধুনিকায়ন করা হবে।
একটি কার্যকর, স্বাধীন, সুদক্ষ ও গতিশীল বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিম্নআদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রীম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা হবে। বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় থাকবে। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সততা, দক্ষতা, আমানতদারিতা ও নৈতিকতার বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হবে।
৬. অর্থনীতি ও আর্থিক সুশাসন:
সুদ ব্যবস্থার অবসান এবং যাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হবে, যাতে সমাজের কেউ অভুক্ত না থাকে এবং কোথাও কোনো অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে না উঠে। এতে ধনী গরীবের মাঝে কোন বৈষম্য থাকবে না আমরা ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই।
বাংলাদেশে এমন একটি অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যা জনগণের উৎপাদন ক্ষমতার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের সাথে সাথে সম্পদের সুষম বণ্টনও নিশ্চিত করবে। সব ধরণের দুর্নীতি কঠোর হস্তে দমন করা হবে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১২% এ নিয়ে যাওয়া হবে। সকল অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। আর্থিক খাতে সব ধরণের দ্বৈত কর্তৃত্বের অবসান ঘটানো হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্বশাসন নিশ্চিত করা হবে। সকল আর্থিক খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করা হবে।
ব্যাংকিং নীতি, মুদ্রানীতি ব্যাপক সংস্কার করা হবে। ঋণ খেলাপীদের তালিকা তিন মাস পরপর জাতীয়ভাবে প্রকাশ করা হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হবে। ব্যাংক রেজুলেশন এক্টকে প্রয়োজনীয় সংশোধনী দিয়ে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা হবে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। বিনিয়োগে কোন জ্বালানী সংকট থাকবে না। বেসরকারিখাতকে সর্বোচ্চ সহযোগীতা করা হবে। রপ্তানী ও আমদানী নীতি আমূল পরিবর্তন করা হবে। অর্থপাচার ও যাবতীয় চাাঁদাবাজি কঠোর হস্তে নির্মূল করা হবে। দেশকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যাংক ব্যবস্থার নৈরাজ্য ও অস্থিরতা বন্ধ করে স্থিতিশীল ও উন্নত পদ্ধতি চালু করা হবে।
উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ প্রযুক্তির উন্নয়ন, মানসম্পন্ন মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপন এবং উপকূলীয় জেলেদের জন্য ব্লু ইকোনমির আওতায় বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ চালু করা হবে।
ইকো-ট্যুরিজম বা পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, সামুদ্রিক পর্যটন স্পট উন্নয়ন এবং সামুদ্রিক বন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। সমুদ্রের তলদেশে খনিজ সম্পদ ও গ্যাস অনুসন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সামুদ্রিক শ্যাওলা চাষের মত নতুন খাত তৈরি করা হবে। ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, প্লাস্টিক দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন, এবং ব্লু ইকোনমির টেকসই উন্নয়নের জন্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও গবেষণা জোরদার করা হবে। উপকূলীয় যুবকদের জন্য সামুদ্রিক পেশায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
৭. শিক্ষা:
মাতৃভাষা, যার যার ধর্মীয় ভাষা এবং আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজী ভাষা শিক্ষা সর্বত্র বাধ্যতামূলক করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতি নৈতিকতার ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংস্কার করা হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধুনিক তথ্য- প্রযুক্তি শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। শিক্ষার লক্ষ্য হবে একটি উন্নত নৈতিক মানসম্পন্ন, বিজ্ঞান মনস্ক, যোগ্য ও দক্ষ জাতি গড়ে তোলা। বিনামূল্যে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
ইচ্ছা, আগ্রহ, সামর্থ ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে যাদের জন্য প্রজোয্য তাদেরকে কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় স্থানান্তর করে কর্ম জীবনে প্রবেশের সাধারণ একটি সহজ ও সাধারণ ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। মাধ্যমিক শিক্ষা হতে ক্যারিয়ার নির্ভর পৃথক গ্রুপের প্রচলন করা হবে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে উন্নত মান সংরক্ষণ ও পর্যাপ্ত গবেষণার ব্যবস্থা করা হবে।
উচ্চ শিক্ষায় মেধার মূল্যায়নে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আলিয়া ও কাওমী মাদ্রাসা শিক্ষাকে যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদানসহ এর মানকে আরো উন্নত করা হবে। মক্তব শিক্ষাকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হবে। ইমাম, মুয়াজ্জিন ও বিভিন্ন ধর্মীয় পুরোহিতদের সামাজিক শিক্ষা ও প্রেষণায় নিয়োগ করা হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে আরো কার্যকর ও গতিশীল করা হবে তবে শিক্ষাকে ব্যবসায়িক পণ্য তৈরী করতে দেয়া হবে না। বৃত্তিমূলক ও কর্মসংস্থানমূখী শিক্ষার উপর যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা হবে।
শিক্ষকদের বেতন কাঠামো সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে। উপযুক্ত শিক্ষক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। শিক্ষা উপকরণ সহজলভ্য করা হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতকেও সহযোগীতা করা হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণ করা হবে। মূল্যায়ন ও পরীক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণের কমিটি গঠন প্রক্রিয়াসহ পরিচালনা নীতিমালা সংস্কার করা হবে। জাতীয় বাজেটের ৫% শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হবে।
৮. প্রশাসনক ও আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা:
একটি সৎ, দক্ষ ও গণমুখী প্রশাসন উন্নত জাতি গঠনের জন্যে অপরিহার্য। তাই দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক এবং জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সকল মিথ্যা ও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করা হবে।
বিনা ওয়ারেন্টে/সাদা পোষাকে গ্রেফতারের কোন বিধান থাকবে না। পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি দক্ষ, পেশাদার ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পুলিশ হবে জনগণের সেবক, কোনো নির্দিষ্ট দলের হাতিয়ার নয়। পুলিশের ঝুঁকি ভাতা বৃদ্ধিসহ সামগ্রীক জীবনমান উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হবে। সততা, দক্ষতা, নৈতিক ও মানবিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
৯. মুক্তিযুদ্ধ:
‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে’ ঐতিহাসিক মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের এই আদর্শ নিশ্চিতকরণ ও তৎসঙ্গে জনগণের ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ এবংযাবতীয় আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসী তৎপরতার মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একটি সঠিক তালিকা তৈরীর উদ্যোগ নেয়া হবে এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের উপযুক্ত মূল্যায়ন করা হবে।
১০. বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি:
জনগণের মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ প্রতিষ্ঠিত করা হবে। বেকারত্ব সম্পূর্ণরূপে দূর করা হবে। ডিজিটাল হাব তৈরী ও ফ্রীল্যান্সিংসহ বিভিন্ন উপায়ে এক কোটি চাকুরী ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। বাংলাদেশকে ব্যবসা বান্ধব করে গড়ে তোলা হবে। বিভিন্ন সেক্টরে নতুন নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরী করা হবে। উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও উদ্যোগে সরকারি সাপোর্ট ও তদারকির ব্যবস্থা করা হবে।
“বড় নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের মতো বিভাগীয় শহরগুলোতেও নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। সরকারি কর্মকমিশনের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে সরকারি সকল চাকুরীর নিয়োগ পরীক্ষা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।
১১. প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্রপ্রহরী দেশপ্রেমিক প্রতিরক্ষা বাহিনীসমূহকে সকল দিক থেকে আরও শক্তিশালী করে বিশ্বের আধুনিক ও উন্নত বাহিনীর উপযোগি রূপে গড়ে তোলা হবে। দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মজবুত ও ভারসাম্যপূর্ণ করা হবে। অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। উন্নত সমরাস্ত্র তৈরীতে মনযোগ দেয়া হবে। গোটা জাতিকে প্রতিরক্ষা কাজে প্রস্তুত রাখার উদ্দেশ্যে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীসহ সব সক্ষম নাগরিকদের দুই বছর মেয়াদী সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
১২. নারী ও শিশু অধিকার:
দেশে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। নারী সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হবে। যৌতুক প্রথাসহ নারী নির্যাতনমূলক সকল প্রকার কার্যকলাপকে কঠোরভাবে দমন করা হবে। সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হবে। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র নারীর সম্মান ও স্বাতন্ত্র নিশ্চিত করা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হবে। শিশু নির্যাতন, শিশু শ্রম বন্ধ করে শিশুদের উপযুক্ত শিক্ষা ও সহজাত বিকাশের মাধ্যমে আগামী দিনের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
১৩. মানবসম্পদ ও তরুণ সমাজ:
একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্যে দেশে নৈতিকগুনসম্পন্ন দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রথম ধাপ হিসেবে খেলাফত মজলিস শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের কথা বলে। সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে একটি সমন্বিত একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা, যেখানে ধর্মীয় নৈতিকতা ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় থাকবে। তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। যেন তরুনরা কেবল ডিগ্রিধারী না হয়ে বাস্তব কর্মমুখী জ্ঞান অর্জন করতে পারে।
নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। সাথে সাথে দেশ জুড়ে কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্প বিস্তারে উদ্যোগ গ্রহণ এবং ঋণ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হবে। সকল স্তরের পাঠ্যপুস্তকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানো, যাতে মেধাবী হওয়ার পাশাপাশি তরুণরা দেশপ্রেমিক ও সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। তরুণদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে খেলার মাঠ এবং জিমনেসিয়ামের ব্যবস্থা করা হবে।
তরুণদের সুস্থ রাজনীতিতে উৎসাহিত করা এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির পরিবেশ তৈরি করা হবে। তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন এবং গবেষণামূলক কাজে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হবে।
১৪. প্রবাসী কল্যাণ:
বিদেশে শ্রমবাজারকে শক্তিশালী করা হবে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের স্বার্থ সংরক্ষণে একটি বিশেষ সেল সারা বছর মনিটরিং ও ফিডব্যাক দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকবে। প্রবাসীদের ভোট দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। বিদেশ গমনেচ্ছুদের বিনামূল্যে সেক্টর ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। ২০ বছরের অধিক সময়ে প্রবাসে অবস্থানকারীগণ আগ্রহী থাকলে দেশে কর্মঅভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাদের কাজের ক্ষেত্র তৈরী করা হবে। বিদেশে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি করা হবে।
১৫. ভাষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি:
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মাতৃভাষাই জ্ঞান অর্জন ও ভাব বিনিময়ের সর্বোত্তম বাহন। তাই বাংলা ভাষা এবং বাংলা সাহিত্যের উন্নয়নের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সরকারি কাজে বাংলাভাষা ব্যবহারের বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হবে। শিল্প, কলা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে সৃজনশীলতার মূল্য দেয়া হবে। সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ, সুন্দর রুচিশীল বিনোদন ও খেলাধূলার প্রসার এবং উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হবে। নৈতিকতাবর্জিত অসুস্থ-অপসংস্কৃতি নির্মূলে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ক্রীড়া সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করে শক্তিশালী করা হবে।
১৬. অমুসলিম ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী:
বাংলাদেশে বসবাসরত সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়, পাহাড়ি ও সমতলের সকল নৃ-গোষ্ঠীসমূহের মৌলিক, মানবিক, ধর্মীয়, সামাজিক, নাগরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারসমূহ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলোকে চিহ্নিত করে এগিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। সমাজে সকল ধর্ম বর্ণের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সুনিশ্চিত করা হবে।
১৭. পররাষ্ট্রনীতি:
পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হবে জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার, রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে সমতা, শ্রদ্ধাবোধ ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন। “সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়” এ নীতি-নিষ্ঠার সাথে পালন করা হবে। ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশসমূহের সাথে বিশেষ সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে ফলপ্রসু সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হবে। আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের বিরোধিতা, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মজলুম জাতিসমূহের পক্ষাবলম্বন এবং তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন থাকবে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সংকট সমাধান করে তাদের নিজ ভুমিতে সম্মানের সাথে প্রত্যাবর্তনের শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া হবে। আটকে পড়া পাকিস্তানী ইস্যু সমাধান করা হবে।
১৮. কৃষি ও ভুমি ব্যবস্থাপনা:
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক গবেষণার উদ্যোগ নেয়া হবে। কৃষিজমি সংরক্ষণ ও ভূমির ঊর্বরতা অনুয়ায়ী কৃষি জমির শ্রেণিবিন্যাস করা হবে। কৃষি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিবর্তে কৃষকদের জন্য 'করজে হাসানা' বা বিনা সুদে দীর্ঘমেয়াদী কৃষি ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা, সার, বীজসহ কৃষি উপকরণ ও বীজ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। প্রান্তিক কৃষকদের এসব সুবিধা পাওয়া নিশ্চিত করা হবে।
জাকাত বণ্টনে কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হবে। দেশে সমৃদ্ধ বীজভান্ডার গড়ে তোলা হবে। কৃষকদের ভালো মানের বীজ যথাসময়ে সরবরাহ করা হবে। যথাযথ পরীক্ষার পরই কেবল বাইরের বীজ দেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে। ইসলামী ভূমি আইনের আলোকে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে খাস জমি বণ্টন এবং চাষযোগ্য কোনো জমি অনাবাদি না রাখার নীতি গ্রহণ, নতুন জেগে উঠা চর ও সরকারি খাস জমি ভূমিহীন ও ছিন্নমূল চাষীদের মধ্যে বণ্টন নিশ্চিত করা হবে।
ক্ষেতমজুরদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে। মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি/বেসরকারি পর্যায়ে পণ্য কেনার ব্যবস্থা করা এবং প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিরাজমান দুর্নীতি ও জটিলতা দূর করা হবে এবং ভূমির মালিকানা সংশ্লিষ্ট আইনী প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করা হবে। পোলট্র্রি ও গবাদি পশু পালনে ব্যাপক উৎসাহমূলক পদক্ষেপ নেয়া হবে। গ্রাম পর্যায়ে ভ্যাটিরিনারি হাসপাতাল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। মৌসুমি ফসল (যেমন- আলু, পেঁয়াজ, টমেটো) সংরক্ষণের জন্য প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত হিমাগার নির্মাণ করা হবে।
১৯. শিল্প ও বিনিয়োগ:
দীর্ঘমেয়াদী ২০ সালা পরিকল্পনা নেয়া হবে। অঞ্চলভিত্তিক কাঁচামাল ও জনশক্তির সহজলভ্যতা ও পরিবহন ব্যবস্থা বিবেচনা করে শিল্প কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হবে। আমদানী নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানীমূখী শিল্প প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেয়া হবে। সহজে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে। জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যে প্রয়োজনবোধে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার ব্যবস্থা রেখে বেসরকারি সেক্টরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে।
দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য পরিবেশ-পরিস্থিতি ও পদ্ধতি অনুকুল করা হবে। দেশের শিল্পায়ন ও শিল্প-কারখানা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থানুকূল নীতি-পলিসি অনুসরণ করা হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে রপ্তানী কার্যক্রমকে সহজ করা হবে। শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এক কথায় দ্রুত দেশকে একটি আধুনিক শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
২০. গ্রাম উন্নয়ন:
গ্রামই বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের বাস গ্রামে। অবহেলিত গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে শহরমুখী জনস্রোত ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গ্রামের উন্নয়ন হলে বাংলাদেশের ৯০ ভাগ উন্নয়ন হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। শিক্ষা, চিকিৎসা, তথ্য ও যোগাযোগসহ সার্বিক সুবিধা শহরের সমান্তারালে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে। গ্রামীণ উন্নয়নের লক্ষ্যে গ্রামে গ্রামে উন্নত মানের কৃষি, মৎস্য ও গবাদিপশু খামার, কৃষি নির্ভর শিল্প, কুটির শিল্প প্রভৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হবে।
গ্রামের পরিবেশ ও প্রকৃতির স্বকীয়তা অক্ষুন্ন রেখে প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পানিসহ সকল নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। গ্রামে বসে ফ্রিল্যান্সিং করে সক্ষম নারী ও পুরুষ যাতে সম্মানজনক আয় করতে পারে সে প্রশিক্ষণ ঘরে ঘরে দেয়া হবে।
২১. শ্রমিক অধিকার:
সকল শ্রেণীর শ্রমিকদের সম্মানজনক জীবনধারণের উপযোগী ন্যূনতম বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তৎসঙ্গে তাদের বাসস্থান ও চিকিৎসা সুবিধা, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ ইত্যাদিরও ব্যবস্থা করা হবে। দুর্ঘটনাকবলিত বা অসুস্থ শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একটি কেন্দ্রীয় 'শ্রমিক কল্যাণ তহবিল' গঠন। শিল্প-কারখানার মালিকানায় শ্রমিকদের অংশীদারিত্বের ব্যবস্থা থাকলে শিল্পক্ষেত্রে শুভ ফল বয়ে আনবে।
শ্রমিক-মালিক বিরোধে যাতে উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ না হয় আবার শ্রমিকদের ন্যায়সংগত অধিকারও যাতে আদায় হয় তার জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যাবতীয় শ্রম শোষণ বন্ধ করা হবে এবং সুস্থ গঠনমূলক ট্রেড ইউনিয়নকে উৎসাহিত করা হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের জন্য সম্মানজনক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হবে। বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশুশ্রম পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা এবং দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
২২. জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ:
তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানী খাতের উন্নয়ন করা হবে। বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকারি/ বেসরকারি উদ্যোগে কয়লা ও গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। বিদ্যুতের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা হবে। বিদ্যুতের সিস্টেমলস রোধ ও বিদ্যুৎ খাতের যাবতীয় দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। জীবাশ্ম জ্বালানীর উপর চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানী খাতে বিপ্লব ঘটানো হবে।
দেশের সর্বপ্রকার খনিজ সম্পদের মালিক জনগণ। এই সম্পদকে বিদেশীদের লুটপাট থেকে রক্ষা ও দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণে যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। দেশের প্রতিটি খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহারের জন্যে জাতীয় খনিজ নীতি প্রণয়ন করা হবে। দেশে নতুন নতুন খনিজের অনুসন্ধান ও জরিপের উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
২৩. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা:
সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো হবে এবং স্বাস্থ্য রক্ষায় যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্যে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে উন্নত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। ঔষধ শিল্পের প্রকৃত মান নিশ্চিত করা হবে।
স্বাস্থ্যখাতে সকল অনুদান প্রকৃত প্রাপকদের হাতে যথাযথ ভাবে পৌঁছানো হবে। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণাঙ্গ ২০০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তর করা হবে।
অঞ্চলভিত্তিক বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকবে যেখানে সরাসরি ইউনিয়ন কেন্দ্র থেকে রোগী রেফার করা যাবে। জরুরী ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোগী স্থানান্তর করা হবে। প্রতিবন্ধী ও সিনিয়র সিটিজেনদের বিভাগভিত্তিক হাসপাতালে বিনামূল্যে পরিপূর্ণ চিকিৎসা দেয়া হবে।
২৪. মাদকাসক্তি ও মাদকদ্রব্য নির্মূল:
সামাজিক অবক্ষায় রোধে যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণীদের মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উপরে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হবে। মাদকাসক্তদের সামাজিক ও ধর্মীয় মোটিভেশনের ব্যবস্থা করা হবে। ভয়াবহ ও মারাত্মকব্যাধি মাদকাসক্তি নির্মূলে সব ধরনের মাদকদ্রব্য উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহ রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
২৫. সামাজিক নিরাপত্তা:
সমাজের সকল মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। সামাজিক নিরাপত্তার জাল বিস্তার করা হবে। যার অভিভাবক নেই রাষ্ট্রই তার অভিভাবক- এ নীতির ভিত্তিতে ইয়াতিম, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বিধবা, শারীরিক প্রতিবন্ধী, মানসিক প্রতিবন্ধী (অটিস্টিক), পথশিশু ও নি:স্ব মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত করা হবে।
পারিবারিক সহিংসতা রোধ করতে, বিবাহ সংক্রান্ত কলহ রোধসহ সামগ্রীকভাবে পারিবারিক জীবনকে শান্তিময় করতে বিশেষ হেল্পলাইন চালু করা হবে। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করে সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয় রোধ এবং ছোটদের স্নেহ, বড়দের সম্মান ও পিতা-মাতার অধিকার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
২৬. কর ব্যবস্থাপনা:
রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে কর। কর ব্যবস্থাপনাকে স্বচ্ছ করা হবে। সব ধরনের করের আওতা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যৌক্তিক হারে কর নির্ধারণ করা হবে এবং ক্ষেত্র বিশেষে কমানো হবে। অপ্রয়োজনীয় ও জুলুমমূলক কর বাদ দেয়া হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কোন ভ্যাট থাকবে না। মানুষের করের ভীতি দূর করা হবে।
২৭. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি:
বর্তমান বিশ্বে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তনশীল। দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, কৃষি, বাণিজ্য, প্রশাসন, প্রতিরক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে গতিশীলতা বৃদ্ধি, উন্নয়ন ও স্বচ্ছতার জন্যে আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। একটি জ্ঞান ভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে তথ্য প্রযুক্তির নেতৃত্ব দানে সক্ষম বড় একটি জনগোষ্ঠী তৈরী করা হবে।
২৮. নিরাপদ সড়ক ও যোগাযোগ :
সারাদেশের সড়ক, নৌ, বিমান ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিস্তৃত ও নিরাপদ করার যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। মহাসড়ক ও মহানগরগুলোকে ট্রাফিক জ্যামমুক্ত করা হবে। ২০১৮ সালের শিশু কিশোর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ৯ দফাকে সমন্বয় করে আইন সংস্কার করা হবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, চালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ করা হবে।
কম খরচে অধিক টেকসই রাস্তা নির্মাণ করা হবে। রাজধানী ঢাকা থেকে সকল বিভাগীয় সদরে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে। জানজট নিরসনে রাজধানী ঢাকার পার্শবর্তী শহরগুলোকে মেট্রোরেলের আওতায় আনা হবে। রেলপথ ও নৌপথকে ব্যাপক বিস্তৃত করা হবে। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক, নিরাপদ ও সুলভ করা হবে।
২৯. স্থানীয় সরকার:
দেশের সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। জাতীয় বাজেটের ১০% স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে ব্যয় করা হবে। জেলা পরিষদে জনগনের প্রত্যক্ষ ভোট হবে। নির্বাচিত ও কার্যকর ক্ষমতার অধিকারী সকল পর্যায়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের ক্ষমতায়ন করা হবে।
৩০. পরিবেশ ও জলবায়ু:
বৈশ্বিক আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সামগ্রিক উষ্ণতা বেড়েই চলছে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা ভবিষ্যৎ পৃথিবী ও মানব জাতির জন্যে এক মারাত্মক হুমকী। এ অবস্থা মোকাবেলায় কার্বণ নির্গমনের হার কমানো, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং এ উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক ফোরামে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গবেষণা ও কর্মসূচী একসাথে চলমান রাখা হবে। বনায়নের কর্মসূচী শক্তিশালী করা হবে। শহর অঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর করা হবে। হারিয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধার করে আধুনিক করা হবে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের নদীগুলোতে লোনা পানির অনুপ্রবেশ রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় জলাভূমি ও হাওর সংরক্ষণের গুরুত্ব দেওয়া হবে।
৩১. নদী সুরক্ষা:
৫৪ টি অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হবে। ভারত কর্তৃক একতরফা পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হবে। যদি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হয়, তবে বিষয়টি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক আদালতে উত্থাপন করার অঙ্গীকার রয়েছে। গঙ্গা পানি ইস্যুতে নেপালকেও অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে। তিস্তা প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
প্রভাবশালী নদী দখলদারদের হাত থেকে নদী ও এর তীরবর্তী ভূমি উদ্ধার করে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। শিল্প-কারখানার বিষাক্