10/08/2026
ক্যাশ কাউন্টারের কাজ প্রায় শেষ। হঠাৎ হাতে একটি সংবাদপত্র নিয়ে ম্যানেজারের কক্ষে ঢুকলেন সিনিয়র অফিসার রাশেদ।
রাশেদ: স্যার, একটা খবর দেখেছেন?
রোকন: কী খবর, রাশেদ?
রাশেদ: বরিশালের এক কৃষক প্রায় দুই লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। কিন্তু বাড়িতে রাখা সেই টাকা ইঁদুর আর উইপোকা কেটে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে!
রোকন: আহা! একজন কৃষকের সারাজীবনের সঞ্চয়… চোখের সামনে এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া সত্যিই খুব কষ্টের।
রাশেদ: স্যার, কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে। ওই টাকাগুলো কি তাহলে পুরোপুরি মূল্যহীন?
রোকন: না, সবসময় তা নয়। এখানেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—ক্ষতিগ্রস্ত নোট মানেই মূল্যহীন নোট নয়।
রাশেদ: মানে ইঁদুরে কাটা নোটও বদলানো যেতে পারে?
রোকন: কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই। তবে নোটের অবস্থা, কতটুকু অংশ অবশিষ্ট আছে, নোটটি আসল কি না—এসব বিষয় নির্ধারিত নিয়মে যাচাই করা হবে।
রাশেদ: তাহলে প্রথমে কোথায় যেতে হবে? ধরুন, একজন গ্রাহকের ১,০০০ টাকার নোট ইঁদুরে কেটে ফেলেছে। তিনি কী করবেন?
রোকন: প্রথম কাজ—নোটটি ফেলে দেবেন না।
যে কোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় নিয়ে যেতে পারেন। ব্যাংক নোটটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় নিতে পারে এবং দাবিযোগ্য নোট হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পাঠাবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ব্যাংক শাখাগুলোকে ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোটের বিনিময় এবং দাবিযোগ্য নোটসংক্রান্ত সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রাশেদ: অর্থাৎ গ্রামের একজন মানুষকে ঢাকায় ছুটে যেতে হবে—এমন নয়?
রোকন: একদম ঠিক। স্থানীয় তফসিলি ব্যাংকের শাখা থেকেই প্রক্রিয়াটি শুরু করা যেতে পারে।
রাশেদ: স্যার, এই জায়গাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, ১,০০০ টাকার নোটের ৯৫ শতাংশ অংশ অক্ষত আছে। তাহলে?
রোকন: যদি নোটটি একক ও অবিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে থাকে এবং ৯০ শতাংশের বেশি অংশ বিদ্যমান থাকে, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী নোটের সম্পূর্ণ মূল্যমান পরিশোধ করা হতে পারে।
রাশেদ: অর্থাৎ ১,০০০ টাকার নোট হলে ১,০০০ টাকা?
রোকন: হ্যাঁ—নিয়মের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে।
রাশেদ: আর যদি ৮০ শতাংশ থাকে?
রোকন: তাহলে ৭৫ শতাংশ মূল্য। অর্থাৎ ১,০০০ টাকার নোট হলে ৭৫০ টাকা।
রাশেদ: আর ৬০ শতাংশ?
রোকন: তাহলে ৫০ শতাংশ মূল্য—অর্থাৎ ৫০০ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রবিধানে একক, অবিচ্ছিন্ন নোটের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশের বেশি অংশ থাকলে পূর্ণ মূল্য, ৭৫–৯০ শতাংশ থাকলে ৭৫ শতাংশ এবং ৫১–৭৫ শতাংশ থাকলে ৫০ শতাংশ মূল্য দেওয়ার বিধান রয়েছে। ৫১ শতাংশের কম থাকলে দাবি প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।
রাশেদ: কিন্তু নোট যদি কয়েক টুকরো হয়ে যায়?
স্যার, ইঁদুর তো আর নিয়ম মেনে নোট কাটে না! যদি ১,০০০ টাকার নোটটি দুই-তিন টুকরো হয়ে যায়?
রোকন: হ্যাঁ, সেক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে। নোটের খণ্ডগুলো একই আসল নোটের অংশ কি না, নোটের বৈশিষ্ট্য ও নিরাপত্তা চিহ্ন শনাক্ত করা যাচ্ছে কি না—এসব দেখা হবে। বিশেষ করে খণ্ডিত নোটের ক্ষেত্রে সিরিয়াল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় অংশ ও নোটের সত্যতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রবিধানে একাধিক খণ্ডের বিশেষ পরিস্থিতির জন্য আলাদা বিধান রয়েছে।
রাশেদ: অর্থাৎ টুকরোগুলো ফেলে দেওয়া যাবে না?
রোকন: কখনোই না! একটি টুকরোও যদি থাকে, সেটি সংরক্ষণ করুন এবং ব্যাংকে নিয়ে যান। তবে সব নষ্ট নোটের টাকা পাওয়া যাবে না।
রাশেদ: স্যার, তাহলে কি যে কোনো ছেঁড়া নোট দিলেই টাকা পাওয়া যাবে?
রোকন: না। এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটা মানুষ করে।
নোটটি আসল হতে হবে এবং এর বৈশিষ্ট্য যাচাইযোগ্য হতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে কাটা, ছেঁড়া বা ছিদ্র করা নোটের দাবি প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। আবার নোটের বিভিন্ন অংশ ভিন্ন নোটের সঙ্গে জোড়া লাগানো বা নোটের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও দাবি বাতিল হতে পারে।
রাশেদ: অর্থাৎ ইঁদুরে কাটা আর মানুষ ইচ্ছা করে কাটা—দুটো এক বিষয় নয়?
রোকন: ঠিক তাই। প্রকৃত দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত নোটের জন্য নিয়ম আছে; কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে নোট নষ্ট করে টাকা দাবি করার সুযোগ নেই।
🐀 এবার ফিরে আসি বরিশালের কৃষকের ঘটনায়।
রাশেদ: স্যার, তাহলে ওই কৃষক কী করবেন?
রোকন: তিনি তার কাটা নোটগুলো যতটা সম্ভব অক্ষত অবস্থায় সংগ্রহ করে কোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় নিয়ে যেতে পারেন। ব্যাংক নোটগুলো পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দাবির জন্য পাঠাতে পারে। আর যদি নোটগুলো দাবিযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মূল্য ফেরতের সিদ্ধান্ত হবে।
রাশেদ: তাহলে তার দুই লাখ টাকা থেকে কত টাকা ফেরত আসবে—এটা কি এখনই বলা যাবে?
রোকন: না। নোটের প্রতিটি খণ্ড পরীক্ষা না করে নির্দিষ্ট অঙ্ক বলা সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি নোটের কতটুকু অংশ অক্ষত আছে, নোটের নম্বর ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা যাচ্ছে কি না এবং নোটটি আসল কি না—এসব যাচাইয়ের পর সিদ্ধান্ত হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—সময়।
রাশেদ: স্যার, দাবি করার পর কি সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাওয়া যায়?
রোকন: সব ক্ষেত্রে নয়। দাবিযোগ্য নোটের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রয়োজনে নোটের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ মতামতও নেওয়া যেতে পারে।
রাশেদ: অর্থাৎ একটু সময় লাগতে পারে?
রোকন: অবশ্যই। কারণ এখানে শুধু টাকা দেওয়া নয়—আসল নোট, নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য এবং ক্ষতির মাত্রা যাচাই করা হয়।
রাশেদ: স্যার, সাধারণ মানুষ তো শুধু নোটের ছবি আর নম্বর দেখে। ব্যাংকাররা কী কী দেখে?
রোকন: অনেক কিছু। নোটের কাগজের বৈশিষ্ট্য, সিরিয়াল নম্বর, নিরাপত্তা সুতা, জলছাপ, ইন্টাগ্লিও প্রিন্টিং, রং পরিবর্তনকারী কালি, মাইক্রোটেক্সটসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা হতে পারে।
রাশেদ: তাহলে নোট যত বেশি ছেঁড়া হবে, যাচাই তত গুরুত্বপূর্ণ?
রোকন: ঠিক তাই। কারণ ব্যাংকের দায়িত্ব শুধু গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করা নয়; একই সঙ্গে মুদ্রার নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও রক্ষা করা।
রাশেদ: তাহলে বাড়িতে টাকা রাখা কি নিরাপদ? স্যার, একটা কথা বলুন—এত বড় অঙ্কের টাকা বাড়িতে রাখা কি ঠিক?
রোকন: এটাই এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
ধরুন, একজন কৃষক বছরের পর বছর পরিশ্রম করে ২ লাখ টাকা জমালেন। তিনি ভাবলেন— “বাড়িতেই থাকুক, দরকার হলে হাতের কাছে পাব।” কিন্তু এক রাতে ইঁদুর এসে কয়েক হাজার টাকার নোট কেটে দিল।
আর উইপোকা এসে কয়েক মাসের সঞ্চয়ের ওপর চালিয়ে দিল তার দাঁত!
রাশেদ: তাহলে টাকা শুধু চোরের কাছ থেকেই নয়—ইঁদুরের কাছ থেকেও ঝুঁকিতে!
রোকন: হা হা… ঠিকই বলেছ। তবে বিষয়টি হাসির নয়, রাশেদ। টাকা যত কষ্টে অর্জিত, সংরক্ষণও তত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়িতে প্রয়োজনীয় অল্প নগদ রাখা যেতে পারে। কিন্তু বড় অঙ্কের সঞ্চয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপদে রাখা অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত।
রোকন:রাশেদ, একটা কথা মনে রেখো— “ছেঁড়া নোট মানেই টাকা শেষ নয়, কিন্তু সঞ্চয় বাড়িতে রেখে ঝুঁকিতে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।” আজ যে কৃষকের দুই লাখ টাকা ইঁদুর-উইপোকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার ঘটনা আমাদের জন্য শুধু একটি সংবাদ নয়। এটি একটি আর্থিক সচেতনতার শিক্ষা।
নোট নষ্ট হলে—
১. নোটের কোনো অংশ ফেলে দেবেন না।
২. নিজে থেকে টুকরোগুলো জোড়া লাগিয়ে পরিবর্তন করার চেষ্টা করবেন না।
৩. নিকটস্থ তফসিলি ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করুন।
৪. নোটের সত্যতা ও ক্ষতির মাত্রা যাচাই করতে দিন।
৫. দাবিযোগ্য হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় দাবি উপস্থাপন করুন।
৬. আর বড় অঙ্কের নগদ টাকা দীর্ঘদিন বাড়িতে না রেখে নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রাখুন।
রাশেদ: স্যার, আজকের আলোচনার পর একটা কথাই মনে হচ্ছে— “টাকা উপার্জন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, টাকাকে নিরাপদে রাখাও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ।”
রোকন: একদম ঠিক। কারণ— একটি নোট হয়তো কাগজ, কিন্তু তার পেছনে লুকিয়ে থাকে কোনো কৃষকের ঘাম, কোনো শ্রমিকের পরিশ্রম, কোনো বাবার সন্তানের ভবিষ্যৎ, কোনো মায়ের সঞ্চয়ের স্বপ্ন।
রাশেদ: আর সেই স্বপ্ন যেন ইঁদুরের দাঁতে, উইপোকার ক্ষুধায় কিংবা অসতর্কতার কারণে হারিয়ে না যায়।
রোকন: এই তো আসল ব্যাংকিং শিক্ষা। “সঞ্চয় করুন—কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, সঞ্চয়কে নিরাপদে রাখুন।”
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের Bangladesh Bank Note Refund Regulations, 2025 এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের নোট প্রত্যর্পণ প্রবিধান তালিকাভুক্ত রয়েছে।
নোট: ক্ষতিগ্রস্ত নোটের মূল্য ফেরত পাওয়া স্বয়ংক্রিয় বা নিশ্চিত নয়; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নোটের অবস্থা, সত্যতা, অবশিষ্ট অংশ ও প্রযোজ্য বিধানের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নেবে।