15/06/2026
ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে সেই অর্থ কীভাবে বিনিয়োগ করা হয়? ইসলামী ব্যাংক কীভাবে সুদ ছাড়া আয় করে? মুরাবাহা, মুশারাকা, মুদারাবা, ইজারা—এত নামের ভিড়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, "আসলে এগুলো কী?"
চলুন দুই ব্যাংকার কায়সার ও ইকবালের কথোপকথনের মাধ্যমে বিষয়টি সহজভাবে জানি।
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল ভিত্তি হলো—সুদ (রিবা) নয়, বরং ব্যবসা, অংশীদারিত্ব, ভাড়া ও বাস্তব সম্পদভিত্তিক লেনদেন। অর্থকে অর্থের বিনিময়ে বাড়ানো নয়; বরং বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা।
প্রথম পর্ব: মুরাবাহা (Murabaha)
কায়সার: ইকবাল ভাই, ইসলামী ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি কোন মোড ব্যবহার হয়?
ইকবাল: মুরাবাহা। একে বলা যায় "ক্রয় করে মুনাফাসহ বিক্রয়" পদ্ধতি।
কায়সার: একটু সহজ করে বলুন।
ইকবাল: ধরো, একজন ব্যবসায়ীর ১০ লাখ টাকার কাপড় দরকার। ব্যাংক তাকে টাকা ধার না দিয়ে আগে নিজে কাপড় কিনবে। এরপর সেই কাপড় গ্রাহকের কাছে ১১ লাখ বা ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করবে। গ্রাহক কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করবে।
কায়সার: অর্থাৎ ব্যাংক পণ্যের মালিক হয়, তারপর বিক্রি করে?
ইকবাল: ঠিক তাই। এ কারণেই এটি সুদভিত্তিক ঋণ নয়; বরং একটি বৈধ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি।
দ্বিতীয় পর্ব: বাই-মুয়াজ্জাল (Bai-Muajjal)
কায়সার: তাহলে বাই-মুয়াজ্জাল কী?
ইকবাল: এটাও বিক্রয় চুক্তি। তবে এখানে মূল বিষয় হলো বাকিতে বিক্রি। উদাহরণ: ব্যাংক একটি মেশিন ৫ লাখ টাকায় কিনে গ্রাহকের কাছে ৬ লাখ টাকায় বিক্রি করল। গ্রাহক তিন বছরে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করবে।
তৃতীয় পর্ব: মুশারাকা (Musharaka)
কায়সার: আমি শুনেছি মুশারাকায় লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি হয়।
ইকবাল: একদম ঠিক। ধরো তুমি ও আমি মিলে একটি ব্যবসা শুরু করলাম। তুমি দিলে ৬ লাখ টাকা, আমি দিলাম ৪ লাখ টাকা। ব্যবসায় লাভ হলে আমরা চুক্তি অনুযায়ী ভাগ করব। আর ক্ষতি হলে মূলধনের অনুপাতে বহন করব।
কায়সার: অর্থাৎ ব্যাংকও এখানে ব্যবসার অংশীদার?
ইকবাল: হ্যাঁ। ইসলামী অর্থনীতিতে এটিই সবচেয়ে আদর্শ অংশীদারিত্বভিত্তিক মডেল হিসেবে বিবেচিত।
চতুর্থ পর্ব: ডিমিনিশিং মুশারাকা
কায়সার: বর্তমানে বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে কোন মোড বেশি ব্যবহৃত হয়?
ইকবাল: ডিমিনিশিং মুশারাকা। ধরো, একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৫০ লাখ টাকা। গ্রাহক দিলেন ১০ লাখ। ব্যাংক দিল ৪০ লাখ। এখন ফ্ল্যাটের মালিক দুজনই। প্রতি মাসে গ্রাহক ব্যাংকের অংশ ধীরে ধীরে কিনতে থাকবেন। ফলে ব্যাংকের মালিকানা কমবে এবং গ্রাহকের মালিকানা বাড়বে। একসময় পুরো ফ্ল্যাট গ্রাহকের হয়ে যাবে।
পঞ্চম পর্ব: মুদারাবা (Mudaraba)
কায়সার: মুদারাবা আর মুশারাকার মধ্যে পার্থক্য কী?
ইকবাল: মুশারাকায় উভয় পক্ষ মূলধন দেয়। কিন্তু মুদারাবায় একজন মূলধন দেয়, অন্যজন শ্রম ও দক্ষতা দেয়। উদাহরণ: ব্যাংক ২০ লাখ টাকা দিল। উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনা করলেন। লাভ হলে চুক্তি অনুযায়ী ভাগ হবে।ক্ষতি হলে (যদি উদ্যোক্তার অবহেলা না থাকে) মূলধনের ক্ষতি ব্যাংক বহন করবে।
ষষ্ঠ পর্ব: ইজারা (Ijarah)
কায়সার: ইজারা কি লিজিংয়ের মতো?
ইকবাল: হ্যাঁ। ধরো একটি ট্রাকের প্রয়োজন। ব্যাংক ট্রাক কিনবে এবং গ্রাহককে ভাড়ায় ব্যবহার করতে দেবে। গ্রাহক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভাড়া দেবেন। মেয়াদ শেষে মালিকানা হস্তান্তরও হতে পারে।
সপ্তম পর্ব: HPSM
কায়সার: HPSM এত জনপ্রিয় কেন?
ইকবাল: কারণ এটি বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসায়িক সম্পদ ক্রয়ে খুব কার্যকর। এখানে ব্যাংক ও গ্রাহক যৌথভাবে সম্পদের মালিক হয়। গ্রাহক ব্যবহার করেন এবং ধীরে ধীরে ব্যাংকের অংশ কিনে নেন।
অষ্টম পর্ব: বাই-সালাম
কায়সার: কৃষকদের জন্য কোন মোডটি বেশি উপযোগী?
ইকবাল: বাই-সালাম। ধরো একজন কৃষক ধান উৎপাদনের জন্য অর্থ চান। ব্যাংক আগে থেকেই ধানের মূল্য পরিশোধ করবে। ফসল উৎপাদনের পর কৃষক ব্যাংকের কাছে ধান সরবরাহ করবেন।
নবম পর্ব: ইস্তিসনা
কায়সার: বড় বড় নির্মাণ প্রকল্পে কী হয়?
ইকবাল: সেখানে ইস্তিসনা ব্যবহৃত হয়। ধরো একটি জাহাজ বা কারখানা তৈরি করতে হবে। ব্যাংক নির্মাণের অর্ডার দেবে এবং ধাপে ধাপে অর্থায়ন করবে। নির্মাণ শেষ হলে সম্পদ হস্তান্তর করা হবে।
দশম পর্ব: কার্ড-এ-হাসান
কায়সার: ইসলামী ব্যাংকে কি সম্পূর্ণ সুদমুক্ত ঋণ আছে?
ইকবাল: আছে। এর নাম কার্ড-এ-হাসান। এখানে ব্যাংক শুধুমাত্র মূল অর্থ ফেরত নেয়। সাধারণত চিকিৎসা, শিক্ষা বা মানবিক প্রয়োজনে দেওয়া হয়।
একাদশ পর্ব: ওয়াকালা
কায়সার: ওয়াকালা কী?
ইকবাল: প্রতিনিধি নিয়োগ। গ্রাহক ব্যাংককে বলেন—"আমার পক্ষে আপনি বিনিয়োগ পরিচালনা করুন।"
ব্যাংক একটি নির্ধারিত ফি গ্রহণ করে সেই কাজ করে।
দ্বাদশ পর্ব: সুকুক (Sukuk)
কায়সার: ইসলামী বন্ড বলতে কী বোঝায়?
ইকবাল: সেটিই সুকুক। প্রচলিত বন্ড সুদভিত্তিক হলেও সুকুক বাস্তব সম্পদের মালিকানা বা আয়ভিত্তিক অংশীদারিত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। সাধারণত বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়।
আলোচনা শেষে কায়সার বললেন, "এখন বুঝতে পারছি, ইসলামী ব্যাংকিং শুধু সুদকে অন্য নামে চালানো নয়; বরং পণ্য, সম্পদ, ব্যবসা, অংশীদারিত্ব ও বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করেছে।"
হেসে ইকবাল উত্তর দিলেন, "ঠিক তাই। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল দর্শন হলো—ঝুঁকি ভাগাভাগি, বাস্তব সম্পদের সাথে সম্পৃক্ততা এবং ন্যায্য মুনাফা অর্জন। অর্থের বিনিময়ে অর্থ নয়; বরং অর্থের মাধ্যমে উৎপাদন, ব্যবসা ও উন্নয়ন।"