21/04/2026
আসাম বঙ্গীয় সারস্বত মঠের ১১৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী পরমহংসদেব শিবসাগর জেলার জোড়হাটে এক খন্ড জমি নেন এবং ১৩১৯ বঙ্গাব্দের (১৯১২ সালে) বৈশাখ মাসের অক্ষয় তৃতীয়ায় সেখানে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এটাকে বলা হতো "শান্তি আশ্রম" বা সারস্বত মঠ, যা পরবর্তীকালে আসাম-বঙ্গীয় সারস্বত মঠ নামে পরিচালিত হয়ে আসছে।
সারস্বত মঠ জোড়হাটের ছয় মাইলের মধ্যে এক দারুণ তৃণভূমির কোলে আশ্রিত ছিল। মঠের এক পাশে ছিল এক উপজাতীয় গ্রাম আর এর তিন দিক গভীর বনে ঘেরা ছিল। মারিয়ানি-জোড়হাট রেলপথ উপজাতীয় গ্রামটির মধ্য দিয়ে কোকিলামুখ পর্যন্ত গিয়েছে। হিমালয় পর্বতমালা এ জায়গার উত্তরে, উদয়গিরি পূর্বে এবং নাগা পর্বত দক্ষিণে অবস্থিত। আশ্রমের দৃশ্য প্রাচীনকালের আশ্রমের দৃশ্য মনে করিয়ে দিত। পাশ্ববর্তী জঙ্গল এবং জায়গাটির নির্জনতা ধ্যানের অত্যন্ত অনুকূল ছিল। ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও ধ্যানের সাথে সাথে গবাদি পশু চরানো, ঘাস খাওয়ানো এবং এদের জন্য শুকনো খাদ্য সংগ্রহ ছিল আশ্রমের ব্রহ্মচারীদের উপর অর্পিত কাজ।
স্বামী নিগমানন্দ কর্তৃক সম্পাদিত "সারস্বত গ্রন্থাবলী"র কাজ এই মঠের প্রেস হতে প্রকাশিত হয়েছিল। আর্য দর্পণ নামের ধর্মীয় মাসিক পত্রিকা এখান হতে মুদ্রিত হওয়া অব্যাহত ছিল। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে আশ্রমটিতে মুদ্রণ, অন্যান্য শিল্প যেমন কাঠের কাজ, কামারের কাজ এবং হস্তচালিত তাঁত চালু করা হয়েছিল। দাতব্য ঔষধালয়টি মঠের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পরিণত হয়েছিল যেখানে গরীব রোগীদের ঔষধসহ চিকিৎসা সেবা দেয়া হতো। ছাত্রদের যোগ শিক্ষা দেয়ার জন্য ঋষি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
ঠাকুর মহারাজ মহান শঙ্করাচর্যের আদেশে "সরস্বতী"র ঐতিহ্যে তাঁর দশ জন ধর্মপ্রাণ শিষ্যকে সন্ন্যাসে দীক্ষা দেন, যাদের মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন "স্বামী নির্বাণানন্দ সরস্বতী" এবং "স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ সরস্বতী"। স্বামী প্রজ্ঞানানন্দকে সারস্বত মঠ ও আশ্রম প্রতিষ্ঠানসমূহের ট্রাস্টি এবং মোহন্ত হিসেবে কর্মরত হন।
মঠের মাহাত্ম্য নিয়ে ঠাকুর মহারাজের অমৃত বাণী -
"অক্ষয়তৃতীয়ার যে দিন যোরহাট কোকিলামুখ সারস্বত মঠের আসন প্রতিষ্ঠা হয়, সেইদিন ঠাকুর আমাদের সকলকে আসনের সম্মুখে একত্র দাঁড়া করায়ে বলেছিলেন- তোমরা চিন্তা কর যে, 'তোমাদিগের হৃদপিণ্ড ছিন্ন করে আমি এই আসন প্রতিষ্ঠা করলাম। আমি ( স্বরূপানন্দজী), বোধানন্দ, যোগানন্দ, চিদানন্দ, প্রেমানন্দ, রমা প্রসন্ন, সরু রাম, প্রভৃতি উপস্থিত ছিলাম। আমি দেখিলাম-- আমাদের প্রত্যেকের ভিতর হইতে উল্কাপিন্ডের ন্যায় জ্যোতি রাশি নির্গত হয়ে সমস্ত আসনে বিলীন হইল।
"শান্তি আশ্রম টি আমার জীবন ব্যাপী সাধনার ফল, আশ্রমের কাছে আমার প্রাণটা তুচ্ছ-ঐ আশ্রমের জন্য আমি শতবার আমার প্রাণ বিসর্জন দিতে পারি। আশা আছে, ঐ আশ্রম হইতে কালে শত শত নিগমানন্দের বিকাশ হইবে। বৎস ! তোরা আমার সেই আশ্রমের রক্ষক, আশা আছে আমার প্রাণ তুল্য আশ্রমকে অবহেলা করিয়া তোরা কেহ আমার প্রাণ হন্তারক হবি না।"
"তোমাদের পাঁচজনের মঙ্গলের দরুন এবং উদ্দেশ্য সিদ্ধির অনুকূল ক্ষেত্র রূপেই এই মঠাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে ব্যক্তিগত সাধনার চেয়ে সংঘবদ্ধ সাধনার প্রয়োজন বেশি। কাজেই এখানে যারা আছ, তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার দিকে লক্ষ্য না করে, আত্মসমর্পণের পথ ধরেই চলতে হবে।"
জগদ্-গুরু আসন
"এটা হ'ল আসন-ঘর। এই আসন জগদ্গুরুর আসন। এখানে তোমরা যেমন প্রণাম করতে পার, তেমনি আমিও পারি। একদিন অক্ষয় তৃতীয়ায় আমি নিজ হাতে জগদ্গুরুর ঐ আসন প্রতিষ্ঠা করেছি। ঐ আসন তোমাদের অন্তর্দ্দেবতার আসন, আর এই আসনে আমি আমার দেহ ধারণ পর্যন্ত স্থূল দেহে বিদ্যমান থাকব। কারণ বাইরে ঘোরাফেরা - থাকা সে আমার বাসাবাড়ীর মত, আর এটা আমার নিজের বাড়ী। কাজেই এখানে আমি দেহধারণ পর্যন্ত স্থূলদেহে তো থাকবই, পরন্তু আমার দেহরক্ষার পরও যিনি এই আসনে গুরু হয়ে বসবেন, তাঁর মধ্যেও থাকব। "
ঠাকুর মহারাজ জগদ্-গুরু আসনে নিরাকার পরমব্রহ্মের শক্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি অক্ষয় তৃতীয়ার এই পূর্ণ তিথিতে জগদ্-গুরু আসন প্রতিষ্ঠা করেন কারণ এই দিনে যেকোনো কিছু কাজ করলে তা অক্ষয় হয়ে যায়। এই সকল ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সমান ভাবে পূজনীয় কারণ নিরাকার পরমব্রহ্ম ভেদাভেদ করে না। এই আসন এক অসীম শক্তির আধার, এই শক্তি হল ব্রহ্ম শক্তির অনুভূতি।
মঠের উদ্দেশ্য/ব্রত ছিল সনাতন ধর্ম ব্যাপকভাবে প্রচার, প্রকৃত শিক্ষা বিস্তার এবং ঈশ্বর সম্পর্কে সত্য জ্ঞানের প্রসার ও প্রচার করা, গুরুর কাজ করার জন্য আধ্যাত্মিক প্রাপ্তি অর্জনের জন্য বন্দীদের প্রস্তুত করা, সকলকে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি হিসেবে সেবা করা।
🌼জয়গুরু জয়গুরু জয়গুরু 🌼
সদ্-গুরু নিগমানন্দ পরমহংসদেব