26/02/2021
অসময়ি সময়
ঘড়িতে এলার্ম বাজছে। সকাল ৭.৩০ টা। প্রথমবার এলার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন মঞ্জুরুল আলম। ৫ মিনিট পর পুনরায় এলার্ম বাজা শুরু করল। এলার্ম বন্ধ করে এবার আড়মোড়া ভেঙে উঠলেন তিনি। স্ত্রী’কে বিছানায় দেখছেন না। দেখার কথাও না। স্ত্রী মেহজাবীন তাঁর আগেই প্রতিদিন বিছানা ত্যাগ করে। নিশ্চয়ই মেহজাবীন রান্নাঘরে আছে। ডাকাডাকির আর প্রয়োজন বোধ করলেন না মঞ্জুরুল আলম। ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে বসলেন। ইতিমধ্যে মেয়ে আয়াতও ঘুম থেকে উঠে গেছে। কিন্তু খাবার টেবিলে এখনো আসেনি। স্ত্রী সবকিছু তৈরি করে একসাথে বসলেন।
মঞ্জুরুল“আয়াত কোথায়? খাবে না?”
মেহজাবীন “ওর ক্লাস আজ দেরিতে, তাই আরেকটু পরে কলেজে যাবে। তাই নাস্তার তাড়া নেই।”
মঞ্জুরুল “ওর পড়াশোনা কেমন চলছে? খবর রেখ ঠিকমতো। আমি তো ব্যস্ততার জন্য খোঁজ-খবর নিতে পারিনা। কী এক চাকরি যে করি! মাসজুড়ে দৌড়ের মধ্যে থাকতে হয়। আজ এখানে তো কাল ওখানে। এনজিওতে মানুষ চাকরি করে! বছর না ঘুরতেই চাকরি হারানোর শঙ্কা, নতুন প্রকল্পের খোঁজার দুশ্চিন্তা!”
মেহজাবীন “জীবনের অনেকটা পথই তো পাড়ি দিয়েছো এই শঙ্কাযুক্ত ভেলাতে। তাই আর দুশ্চিন্তা করে কী করবা? এভাবেই চলে যাবে। এখনতো তুমি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। সমস্যা হবে না ইনশাল্লাহ। মেয়ের পড়াশোনা চলছে ভালোই। চট্টগ্রাম ইস্পাহানী কলেজতো পড়াশোনাতে ভালো। তাছাড়া কঠিন দু’টা সাবজেক্টে হোম টিউটর রেখে দিয়েছি। চাকরি এবং মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে এত চিন্তা করলে কানাডায় পাড়ি জমাতে যখন বলেছিলাম তখন তো রাজি হলে না।”
মঞ্জুরুল “হুম, চলে গেলেই মনে হয় ভালো হতো। এক বন্ধুর কথা শুনেই তো গেলাম না! যাইহোক, যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। মেয়ের দিকে খেয়াল রেখ। আমি অফিসে গেলাম।”
মেহজাবীন “আচ্ছা।”
অফিসে চলে গেলেন মঞ্জুরুল আলম। দুপুর ১২ টায় মেয়ে আয়াত তৈরি হলো কলেজে যাওয়ার জন্য।
“আম্মু, আজ আমার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস আছে। একটু দেরি হবে।”
“কত দেরি হবে? কয়টা বাজতে পারে মা?”
“আম্মু, বিকেল ৫টা বাজতে পারে।”
“আচ্ছা মা, যা, সাবধানে যাস। আর যখন ফিরবি তার আগেই কল করিস, ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিব।”
“ঠিক আছে আম্মু। আমি গেলাম।”
মঞ্জুরুল আলম অফিসে কাজ করছেন। আজ বিকেল ৩টায় একটা মিটিং আছে। তারই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পি. এ. নীরাকে ডাকলেন রুমে মিটিংয়ের আপডেট জানার জন্য।
মঞ্জুরুল “নীরা, খবর কী? মিটিংয়ের প্রস্তুতি কেমন? আমার পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশানটা তৈরি করেছেন?”
নীরা “স্যার, অল ইজ ওয়েল। প্রিপারেশান ভাল স্যার। আর আপনার প্রেজেন্টেশানটাও অলমোস্ট ডান।”
মঞ্জুরুল “গুড নীরা। এই না হলে আমার অ্যাসিস্টেন্ট। বাকি কাজটুকু দ্রুত তৈরি করে ফেলুন। বাই দ্যা ওয়ে আপনি তো আমাকে দিন দিন অপরাধী বানিয়ে ফেলছেন। এখন কী করা?”
নীরা “কী বলেন স্যার? কী বলছেন আমি ঠিক বুঝলাম না স্যার?”
মঞ্জুরুল “কবি তো আর মিথ্যা বলেননি- ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সেকি মোর অপরাধ’। ঠিক একই কারণে আমি অপরাধী হচ্ছি। হা হা।”
নীরা “স্যার যে কী বলেন না।”
মুচকি হেসে লাজুক ভঙ্গিতে নীরা রুম থেকে বের হলো। মঞ্জুরুল আলমও স্মিত হাসি দিয়ে কাজ করতে লাগলেন পুনরায়। ক্ষণিকবাদে স্ত্রী মেহজাবীনের ফোন এলো-
মঞ্জুরুল “হ্যালো, বল।”
মেহজাবীন “শোন, আয়াত মাত্র কলেজে গেল, ওর ফিরতে আজ বিকেল ৫টা বাজবে। বিকেল ৪টায় তুমি গাড়ি পাঠিয়ে দিও।”
মঞ্জুরুল “ওকে। সমস্যা নেই। তবে আমার মিটিং শুরু হবে ৩ টা থেকে। আমাকে একটু ৩.৩০ টায় মনে করিয়ে দিও।”
মেহজাবীন “আচ্ছা।”
মিটিং শুরু হলো বিকেল ৩.১৫ মিনিটে। মঞ্জুরুল আলমের একটি বদঅভ্যাস আছে। গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গুরুত্বহীন মিটিং হোক ওনি মোবাইলের রিংটোন অফ করে দেন। কেউ ফোন করে তখন আর ওনাকে পান না। আজও একই কা- করলেন। ৩.১৫ মিনিটে রিংটোন অফ করে দিলেন। মিটিংয়ের ব্যস্ততায় গাড়ি পাঠানোর কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। ১৫ মিনিট পর, থেকে থেকে ফোন দিচ্ছেন স্ত্রী। দিতেই থাকলেন। কিন্তু ওনাকে রিচ করতে পারছেন না। ওদিকে মেয়ের কলেজ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো। বিকেল ৪টা। চলমান মিটিং, মোবাইলটা তখনো পকেটে, রিং বেজেই যাচ্ছে নিঃশব্দে। স্ত্রী মেহজাবীন ৪.৩০ পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর আর বাসায় বসে থাকতে পারলেন না। একটি উবার ট্যাক্সি ডেকে রওনা হলেন ইস্পাহানি কলেজ। হাজব্যান্ডকে অনবরত ফোন দিতে দিতে মেয়ের খবরই নিতে পারেননি। মেয়েও ফোন দেয়নি। মেয়ের অবস্থান জানা প্রয়োজন। আয়াতকে কল দিলেন। প্রথমবার নেটওয়ার্কের ভজকটে কল গেল না। দ্বিতীয়বার কল দিলেন। কিন্তু বিধি বাম! বেরসিক টেলিকম অপারেটর ঘোষণা দিচ্ছেন “আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, দ্যা নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়ালড্ ইজ আনরিচ্যাবল।” কয়েকবার ডায়াল করার পরও একই সুর বেজে যাচ্ছে ফোনে। চাপা আতঙ্ক ভর করেছে মেহজাবীনের মনে! কী হলো আয়াতের ফোনের? চার্জ-টার্জ শেষ হয়ে গেল না-কী অন্য কিছু? মনে মনে ভাবতে লাগলেন মেহজাবীন। ৫ টার কিছু পরে কলেজে পৌঁছালেন মেহজাবীন। কলেজ শেষ হলেও কোলাহল নিঃশেষ হয়নি এখনো। কিছু কিছু ক্লাসরুম খোলা আছে। বিজ্ঞান শাখার প্র্যাকটিক্যাল রুমের দিকে গেলেন মেহজাবীন। শিক্ষার্থী কাউকেই দেখলেন না। একজন পিয়নকে দরজা বন্ধ করতে দেখা যাচ্ছে। কাছে এগিয়ে গেলেন।
মেহজাবীন “ ক্লাস কখন শেষ হয়েছে? আমি আয়াতের আম্মু।”
পিয়ন “ও আচ্ছা, ম্যাডাম, ক্লাস তো শেষ হইছে আরো আধা ঘন্টা আগে।”
“কিন্তু ক্লাস তো ৫টায় শেষ হওয়ার কথা ছিল।”
“জ্বী ম্যাডাম, তবে একজন স্যার না আসায় ক্লাস আগেই শেষ হইয়া গেছে।”
চিন্তায় ভাজ আরো গাঢ় হতে লাগল। আয়াতের বন্ধুদের ফোন করা উচিত। দু’একজনের মোবাইল নাম্বার আছে। প্রথমেই আয়াতের বন্ধু সাইমাকে ফোন দিলেন মেহজাবীন।
“হ্যালো সাইমা, আমি আয়াতের আম্মু বলছি।”
“আন্টি স্লামালাইকুম, কেমন আছেন?”
“ওয়ালাইকুম সালাম, ভালো আছি, তোমার সাথে কী আয়াত আছে?”
“না আন্টি, আমরা তো কলেজ ছুটির পর সবাই যার যার বাসায় চলে এসেছি। আয়াত কি বাসায় যায়নি?
“না, ওর মোবাইল অফ পাচ্ছি। আচ্ছা দেখি।”
এই বলে ফোন রেখে দিলেন মেহজাবীন। তারপর আরেক বন্ধুকে ফোন দিলে একই উত্তর পেলেন। কিছুই ভাল লাগছে না। ঘড়িতে ততক্ষণে ৫.৩০ টা বাজে। হঠাৎ মঞ্জুরুল আলমের ফোন
মেহজাবীন “তোমার এতক্ষণে ফোন করার সময় হলো? তোমার দায়িত্বজ্ঞান কখনই আর হবে না।”
মঞ্জুরুল “আসলে মিটিংয়ের তাড়াহুড়োতে ভুলে গিয়েছিলাম গাড়ি পাঠাতে। আর রিংটোন অফ থাকার কারণে বুঝতে পারিনি। আমি এক্ষুণি গাড়ি পাঠাচ্ছি।”
মেহজাবীন “আর গাড়ি পাঠাতে হবে না, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। যত্তসব খামখেয়ালি।”
মঞ্জুরুল- “মানে? কী হয়েছে?”
মেহজাবীন “আয়াতকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, ওর মোবাইল বন্ধ। আমি আয়াতের কলেজে এসেছি।”
মঞ্জুরুল “কী বলছো এসব! পাওয়া যাচ্ছে না মানে কী? কী সর্বনাশের কথা বলছো! আমি আসছি তুমি ওখানেই থাকো।”
মঞ্জুরুল আলম রওনা দিলেন। আসতে আসতে আয়াতের মোবাইলে কল দিলেন কয়েকবার। লাভ হলো না। মোবাইল বন্ধ। এদিকে মেহজাবীন, আয়াতের বন্ধুদের যত নাম্বারই ছিল সবগুলোতে চেষ্টা করেছেন। বাসায়ও ফোন দিয়ে জেনেছেন। ফলাফল শূন্য। মেহজাবীনের চোখের কোণে অশ্রু ছলছল করছে। শুধু গাল বেয়ে নেমে আসার অপেক্ষা!
দুশ্চিন্তার মেঘ ভিড় করেছে মনের আকাশে। কত ধরনের বিপদই তো হতে পারে! মঞ্জুরুল আলম কলেজে পৌঁছেছেন। কলেজের গেইটেই মেহজাবীনকে পেলেন। স্বামীকে দেখে হাওমাও করে কান্না জুড়ে দিলেন।
“আমার মেয়েকে খুঁজে দাও, আমি কিছু জানি না, আমার মেয়েকে আমার কাছে এনে দাও।”
স্বামীকে জড়িয়ে ধরে কান্নারত অবস্থায় কথাগুলো বললেন মেহজাবীন।
মঞ্জুরুল “কোথায় কোথায় খুজেছো বলো?”
মেহজাবীন “আয়াতের কোনো বন্ধুকেই বাদ দেইনি, বাসায়ও নেই। আমার অনেক চিন্তা হচ্ছে।”
মঞ্জুরুল “আচ্ছা, দাঁড়াও। আমি দেখছি। তুমি একটু শান্ত হও। আরেকটু দেখবো না-কী পুলিশে খবর দিব, বুঝতে পারছি না।”
মেহজাবীন “আর দেরি করো না, তাড়াতাড়ি পুলিশে খবর দাও।”
মঞ্জুরুল “ওকে। আমার বন্ধু আছে, নাম কামরুল, পুলিশের এস.পি.। দাঁড়াও ওকে জানাই।”
পুলিশকে জানানো হলো, পাশের থানায় একটি জি.ডি. করা হলো। খোঁজাখুঁজি শুরু হলো হাসপাতালগুলোতে। চারদিকে লোকজন লাগিয়ে মঞ্জুরুল দম্পতি বাসার দিকে গেলেন। নিকট আত্মীয়-স্বজনরা বাসায় উপস্থিত হয়েছে খবরটা জেনে। সকলেই চিন্তিত। সাধ্যমতোন সবাই পরামর্শ দিয়ে চলেছেন কীভাবে নিখোঁজ সংবাদটা আরো প্রচার করা যায়। কেউ বলেছেন টেলিভিশনে নিউজ দেয়ার জন্য তো কেউ বলছেন সংবাদপত্রে সংবাদ ছাপানোর জন্য। সবার কথাই রাখলেন আয়াতের বাবা-মা। তবে দু’জনেরই মনে একটাই শঙ্কা এবং প্রার্থনা যেন কোনো কিডন্যাপারের ফোন না আসে। সেই ভয়ে ভয়ে মোবাইল ফোনগুলো সদা জাগ্রত। টিক টিক করে সময় গড়াচ্ছে তবে কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না আয়াতের। রাত নেমেছে ধরায়, পারদ বাড়ছে চিন্তার! রাত গভীর হচ্ছে ধীরে ধীরে। উৎকণ্ঠা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এভাবেই রাত পোহাল। সন্তানের অপেক্ষায় বাবা-মা’র প্রতীক্ষমাণ দীর্ঘতম রজনী। পরদিন সকাল, নিখোঁজ প্রচারণার ব্যাপ্তি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সেলক্ষ্যে নিখোঁজ সংবাদখানা লিফলেট আকারে ছাপিয়ে প্রচারণার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। লিফলেট পোঁছে দেয়া হয়েছে চট্টগ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। পতেঙ্গা হতে হাটহাজারী পর্যন্ত লিফলেট পৌঁছান হলো। এবার শুধু অপেক্ষার পালা।
মোবাইলে কল আসা শুরু হয়েছে। তবে সেসব ফোনকল পরিচিতজনের। সবাই জানার জন্য কল করছে যে আয়াত কে পাওয়া গেছে কী না। হঠাৎ একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন। ফোনটা ধরবে কী ধরবে না চিন্তা করছে মেহজাবীন। কিন্তু তর সইছে না। দুদ- অপেক্ষা না করেই কল ধরলো মেহজাবীন। অপর প্রান্ত থেকেঃ
“আপনি কি আয়াতের মা বলছেন?”
“জ্বী বলছি, কে বলছেন?”
“আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল থেকে ডাক্তার নুসরাত জাহান বলছি। আয়াত এখানে ভর্তি আছে।”
“কী বলেন? আয়াত কেমন আছে? ও ওইখানে গেল কীভাবে? ওর শরীর কেমন?”
“আয়াত ভাল আছে, এত প্রশ্ন না করে আপনারা চলে আসুন দ্রুত।”
মঞ্জুরুল“আয়াতকে পাওয়া গেছে! দাও, আমাকে ফোনটা দাও।”
এই বলে মেহজাবীনের কাছ থেকে ফোন নিয়ে ডাক্তারের সাথে ৩০ সেকেন্ডের মতো কথা বললেন মঞ্জুরুল। ডাক্তার একই কথা বললেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যালে দ্রুত যেতে বললেন। গেলেই নাকি সবকিছু সবিস্তারে জানা যাবে। বাবা-মা’র চোখে একইসাথে খুশি ও উৎকন্ঠার ছাপ। মঞ্জুরুল ও মেহজাবীন তড়িৎ তৈরি হয়ে রওনা দিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। জামালখান রোডের বাসা থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যেতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লেগে গেল। মেডিক্যাল সেন্টারে পোঁছানো মাত্রই ডাক্তার নুসরাত জাহানের দেখা পেলেন। ডাক্তার তাদের আয়াতের কাছে নিয়ে গেলেন। মাথায় ব্যান্ডেজ করা আয়াত কেবিনে শুয়ে আছে। শব্দ পেয়ে ঘুম ভাঙল আয়াতের। বাবা-মাকে দেখে আনন্দে কেঁদে ফেললো আয়াত। মেহজাবীন গিয়ে আয়াতকে জড়িয়ে ধরলো। দেহে প্রাণ ফিরে পেলেন মেয়েকে দেখে। মঞ্জুরুল আলমের চোখেও অশ্রু ছলছল করছে। ডাক্তারকে উদ্দেশ করে বললেন
“আমার মেয়ে এখানে কীভাবে এলো? ওর কী হয়েছে?”
ডাক্তার “ভয় পাবেন না, আয়াতের তেমন কিছুই হয়নি। তবে অনেক বিপদই হতে পারতো! আয়াতের মুখ থেকেই শুনতে পাবেন।”
মেহজাবীন “কীভাবে হলো, বল তো মা।”
আয়াত “ আগে বল আমাকে বকবে না, তাহলে বলবো।”
মেহজাবীন“ঠিক আছে, বকবো না, তুই বল।”
আয়াত বলা শুরু করলো
“আম্মু, গতকাল ক্লাস শুরুর পর জানতে পারি আমাদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস হবে না। তারমানে আমরা ১ঘণ্টার মতো সময় পাচ্ছি। তাছাড়া গতকাল তেমন গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসও ছিল না। তখন আমাদের ক্লাসে একদম নতুন ভর্তি হওয়া একজন মেয়ের সাথে পরিচয় হলো। ওর বাসা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নং গেইটের দিকে। কথা প্রসঙ্গে ও বললো যে ওদের এলাকা নাকি অনেক সুন্দর, পাহাড়ে ঘেরা আবাসিক এলাক। ও বললো ঘুরে আসার জন্য। আমারও ইচ্ছে হচ্ছিল ঘুরে আসার। তাই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে দু’জন বাসে উঠে পড়লাম। মনে মনে ইচ্ছে ছিল ওর এলাকাটা ঘুরে বিকেল ৫টার মধ্যেই আবার কলেজে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু সেটা আর হয়নি। বাস যখন ১নং গেইট পৌঁছালো তখন বাস থেকে আমি প্রথমে নামছিলাম। এক পা মাটিতে নামিয়ে যখনই আরেক পা মাটিতে রাখতে যাবো তখনই পেছন থেকে সিএনজি’র ধাক্কা! ধাক্কায় আমি কিছুদূর গিয়ে ছিটকে পড়ি। হাত থেকে ব্যাগ পড়ে যায়। মাথা গিয়ে পিচঢালা রাস্তায় আঘাত হানে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার নতুন বন্ধু ও অন্যান্যরা মিলে আমাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যালে নিয়ে আসে এবং এখানে ভর্তি করায়। মাথায় আঘাত বেশি পাওয়ার কারণে ওইদিন আর জ্ঞান ফেরেনি আমার। ব্যাগের সাথে সাথে মোবাইলটিও হারিয়ে যায়। তাই কারো সাথে যোগাযোগ সম্ভব করতে পারেননি ডাক্তার। আজ সকালে তোমাদের লিফলেট পেয়ে একজন তোমাদের মোবাইল নাম্বার ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসে। তখন ডাক্তার তোমাদের সাথে যোগাযোগ করেন। আমি বুঝতে পারিনি এতকিছু হয়ে যাবে। আমি দুঃখিত আম্মু। আমাকে ক্ষমা করে দিও।” কথাগুলো বলতে বলতে চোখে পানি চলে এলো আয়াতের। কান্না শুরু করল আয়াত।
মেহজাবীন “দূর বোকা, কান্না করিস না।”এই বলে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।
মঞ্জুরুল “ডাক্তার সাহেব, আমরা কখন আয়াতকে বাসায় নিতে পারবো?”
নুসরাত জাহান “আপনারা আজকেই ওকে নিয়ে যেতে পারবেন। তবে আপনার মেয়ে কিন্তু মানসিকভাবে অনেক শকড্। কিছু ওষুধ দিচ্ছি, নিয়মিত কিছুদিন খাওয়াতে হবে।”
মঞ্জুরুল “আচ্ছা।”
হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ঘণ্টা দু’য়েক পর আয়াতকে বাসায় নিয়ে আসা হলো। সবাই এখনো ট্রমাটাইজড্। দুশ্চিন্তা কাটছে না। কত বড় বিপদ থেকেই না সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে রক্ষা করেছেন। এই চিন্তা থেকেই মেহজাবীন তাঁর স্বামীকে কোরআন খতম ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতে বললেন। মঞ্জুরুল সাহেব সেমতেই ব্যবস্থা করতে লাগলেন। সেদিন সন্ধ্যায় কোরআন খতম ও মিলাদের ব্যবস্থা করা হলো। আত্মীয়-স্বজন সবাই আসলেন। প্রাণভরে দোয়া করা হলো। আয়াত ঘুমাচ্ছে। ওকে কেউ ডাকলো না। ওর ওপর অনেক ধকল গেছে। অনুষ্ঠান শেষ করে মঞ্জুরুল দম্পতি স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললেন। গতকাল থেকে ঘুম নেই কারো। সবকিছু শেষ করে ঘুমাতে গেলেন মঞ্জুরুল দম্পতি। সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত না হলেও মোটামুটি প্রশান্তি নিয়ে ঘুমাতে পেরেছেন তাঁরা। সকালে উঠেই আয়াতের খোঁজ নিলেন মঞ্জুরুল আলম।
মঞ্জুরুল “আয়াত কেমন আছে? ও কী করছে?”
মেহজাবীন “হ্যাঁ, আয়াত ভালো আছে, ও নাস্তা শেষ করে বই পড়ছে।”
মঞ্জুরুল “ওর বিশ্রাম প্রয়োজন, ওকে বাসায় রেস্ট নিতে বল। আমি অফিসে যাচ্ছি।”
মেহজাবীন “ঠিক আছে।”
মঞ্জুরুল সাহেব অফিসে চলে গেলেন। মেহাজাবীন বাসায় সারাদিন আয়াতের কাছাকাছিই ছিলেন। একা থাকতে দেননি আয়াতকে। নিঃসঙ্গতা কোনভাবেই যেন আয়াতকে না পায় সেভাবেই চেষ্টা করছেন মেহজাবীন। অফিসে দীর্ঘক্ষণ থাকেননি মঞ্জুরুল সাহেব। আজ তাড়াতাড়িই ফিরেছেন বাসায়। বিকেলে একসাথে সবাই নাস্তা করতে বসলেন। আয়াতকে প্রাণবন্ত রাখতে বাবা-মা’র প্রচেষ্টা। খাওয়া-দাওয়ার মাঝখানে মেহজাবীনের ফোনে রিং বেজে উঠলো। খাবারের মাঝখানে ফোনটা রিসিভ করলেন না মেহজাবীন। দ্বিতীয়বার রিং বেজে উঠায় ফোনটা ধরলেন মেহজাবীন। অপর প্রান্ত থেকে-
“ এটা কী আয়াতদের বাসা?”
“জ্বী, আপনি কে বলছেন?”
“আমি মাসুদ বলছি, আপনারা যে লিফলেট দিলেন সে কারণেই ফোন দেয়া। আপনাদের মেয়ে আয়াতকে খুঁজে পাওয়া গেছে!!!”
কথা শুনে মেহজাবীন আকাশ থেকে পড়লেন।
“আপনি কী বলছেন এসব! আয়াতকে তো আমরা পেয়ে গেছি। আপনার হয়তো ভুল হচ্ছে।”
“কী বলেন? তাহলে আমাদের সামনে যে মেয়েটি আছে সে কে?”
“আপনাদের সামনে কে আছে?”
“আপনাদের লিফলেটে যে মেয়েটির ছবি দেয়া আছে সে মেয়েটিই আমাদের সামনে আছে।”
কিংকর্তব্যবিমূঢ় মেহজাবীন ভয়ে ফোন কেটে দিলেন। মঞ্জুরুল সাহেবকে ফোনের কথা বললেন। মঞ্জুরুল সাহেবও হতবাক! মোবাইল ফোনে আবার সেই নাম্বার থেকে কল এলো। মঞ্জুরুল সাহেবের মনে হঠাৎ শঙ্কা জাগলো যে এটা কোনো টোপও হতে পারে। কেউ কোনো ফন্দিফিকিরও করতে পারে। ফোন রিসিভ করে বুদ্ধি করে ওনাকে বাসায় আসতে বললেন। পাশাপাশি পুলিশকেও জানিয়ে রাখলেন। ঘণ্টাখানেক পর মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী হাজির হলেন বাসায়। দরজা খুলে দেয়ার পর ওঁনারা প্রবেশ করলেন। মাসুদ ও মাসুদের স্ত্রী’র সাথে প্রবেশ করলো আরেক আয়াত!! মঞ্জুরুল দম্পত্তির বেহুশ হওয়ায় উপক্রম। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সুতোয় আরও প্যাঁচ লাগলো যখন আগন্তুক আয়াত বলে উঠলো- “আম্মু, বাবা, তোমরা এখানে কী করছো? আর তোমাদের পাশে আমার মতোই দেখতে ওই মেয়েটা কে?”
কে কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। মঞ্জুরুল দম্পত্তি যখন সব খুলে বললেন তখন মাসুদ ও মাসুদের স্ত্রীও নির্বাক হয়ে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতা চলল। কিন্তু কোনো সমাধানে পৌঁছানো যাচ্ছে না। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো যে আগন্তুক আয়াত মঞ্জুরুল সাহেবের বাসাতেই থাকবে যতক্ষণ না অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী বিদায় নিলেন। বাসায় এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হলো। আগন্তুক আয়াতকে আলাদা রুমে থাকতে দেয়া হলো। খাবারের পর ঘুমানোর আগে মঞ্জুরুল ও মেহজাবীন বহুক্ষণ আলাপ করলেন। কোনো কূল-কিনারা করতে পারলেন না। শেষতক চিন্তা করলেন যে সকালে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অথবা বিজ্ঞানীর কাছে পরামর্শ নেয়ার জন্য যাবেন। ঘুমাতে গেলেন তাঁরা। ঘুম কী আর আসে? কী এক অভূতপূর্ব সমস্যায় পড়ে গেলেন তাঁরা। যাইহোক, ভাঙাভাঙা ঘুমে রাত ফুরালো। সকালে উঠেই আয়াতের চিন্তা মাথায় এলো মেহজাবীনের। প্রথমে নিজের মেয়ের রুমে গেলেন মেহজাবীন। এখনো ঘুমাচ্ছে। ডাকলেন নাস্তা খাবার জন্য। পরে গেলেন আগন্তুক আয়াতের রুমে। বিছানায় পেলেন না আয়াতকে। বাথরুমে খুঁজলেন। সেখানেও নেই। ব্যাপার কী? গেল কোথায়? তারপর সম্পূর্ণ বাড়ি খুজঁলেন, ডাকলেন। না, পাওয়া যাচ্ছে না। আশ্চর্য! মেয়েটা গেল কোথায়? বাড়ির আশেপাশে সবজায়গায় খোজাঁ হলো। কোথাও পাওয়া গেল না। কিন্তু রাতে শোবার দরজা যেভাবে ছিল, সকালে মেহজাবীন ঠিক সেভাবেই পেল। এমনকি মশারিটাও টাঙানো ছিল একই ভাবে! ধাঁধায় পড়ে গেলেন মঞ্জুরুল ও মেহজাবীন। বিকেল পর্যন্ত খুঁজে না পেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী এস এম মনিরুল হাসান’র দ্বারস্থ হলেন উনারা। বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান বিজ্ঞানী মনিরুল হাসান। সময় ও ধৈর্য সহকারে সবকিছু শুনলেন তিনি। শুনে বেশ খানিকক্ষণ ভাবলেন এবং কিছু বইপত্র ঘাটলেন। তারপর উনি বলা শুরু করলেন।
“সময়, অসময়ি সময়! মাঝে মাঝে কিছু সময় ভুল সময়ের মধ্যে প্রবেশ করে। এখানেও এমনিই হয়েছে। আপনাদের বুঝতে একটু সমস্যা হবে। তারপরও বুঝিয়ে বলছি। বিজ্ঞানের ভাষায় বুঝতে হবে। বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা একটি বিষয়ের ওপর গবেষণা করছেন, তা হলো এই বিশ্বব্রহ্মা-ের মতো আরও কয়েকটি বিশ্বব্রহ্মা- থাকতে পারে। সেখানে আমাদের পৃথিবীর মতো আরো পৃথিবী রয়েছে, রয়েছে আমাদের মতোই মানুষ, জীবজন্তু। ধারণা করা হয় অন্য সেসব পৃথিবীতে আমরাই রয়েছি, কিন্তু ভিন্ন সময়ের আবর্তনে। মানে হলো আপনি যদি এখানে ২০২০ সাল অতিবাহিত করছেন অন্য পৃথিবীতে হয়তো ২০২২ সালে আছেন অথবা ২০১৮ সালে আছেন। এমনকি ২০১০ সালেও থাকতে পারেন! এই বিশ্বব্রহ্মা-গুলো মাঝে মাঝে একে অপরকে অতিক্রম করার চেষ্টা করে। সময়ের পরিক্রমা অতিক্রম করার চেষ্টা। তখন সময়ের চাদর ভেদ করে মাঝে মাঝে কেউ অন্য পৃথিবীতে চলে আসে। তখন সময়ের সাথে নিজেকে কখনো মেলাতে পারে না। আপনারা হয়তো খেয়াল করবেন যে, কখনো আপনি নতুন কোনো জায়গায় গেলেন, কিন্তু আপনার মনে হবে যে এখানে আপনি আগেও এসেছেন। আপনি কিন্তু জানেন যে আপনি সেখানে আগে যাননি। আবার কখনো মনে হবে যে ৫ সেকেন্ডের কোনো কাজ বা ঘটনা আপনি নতুন করছেন, কিন্তু মনে হবে ঠিক এই কাজ বা ঘটনাটি আপনার আগে হুবহুভাবে ঘটেছে। ভুল করে চলে আসা মানুষগুলো আবার হঠাৎ করেই তাঁদের নিজস্ব পৃথিবীতে চলে যায়। আয়াতের ক্ষেত্রে ঠিক এরকমই ঘটেছে বলে ধারণা করছি। আয়াত চলে গেছে ওর নিজের পৃথিবীতে। ওকে আর পাওয়া যাবে না। এই ব্যাখ্যাগুলোর আপনি দালিলিক প্রমাণ পাবেন না। তবে তা ঘটে থাকে।”
বিজ্ঞানী মনিরুল হাসানের বক্তব্য মঞ্জুরুল ও মেহজাবীন বিশ্বাস করলেন কী-না তা বোঝা যায়নি। তবে আগন্তুক আয়াতকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি এ ধরায়।