21/11/2025
হেরে যাওয়া এক বাবার আর্তচিৎকার। দু’হাত আকাশের দিকে তুলে ফুঁপিয়ে বলে ওঠে “হে ভগবান ওর পরিবার যেন বজ্রাঘাতে মরে, ওদের ধ্বংস করে দিও। তার এই আর্তনাদ শুনলে মনে হয় যেন কোনও সিনেমার সংলাপ, বরং তা নয়, হৃদয় ভেঙে যাওয়া এক পিতার বাস্তব বুকফাটা কান্না। এমন দৃশ্য ঝিনাইদহ ডিসি কোর্ট প্রাঙ্গণে।
এই দৃশ্যের কেন্দ্রে যিনি তিনি হরিণাকুন্ডুর গোবিনাথপুর গ্রামের গোপাল চন্দ্র শর্মার একমাত্র মেয়ে অন্তি শর্মা। কলেজপড়ুয়া অন্তির জীবনে ফেসবুকের মাধ্যমে গড়ে ওঠে মুসলিম ধর্মের এক যুবক রাকিব হোসেনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক। সম্পর্ক ধীরে ধীরে পরিণতির দিকে এগোয়। প্রেমিক-প্রেমিকা সিদ্ধান্ত নেন বিয়ের মাধ্যমে একসাথে ভবিষ্যৎ গড়বেন।
গত ২ অক্টোবর। স্থানীয় মসজিদে এক হুজুরের সামনে কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করেন অন্তি শর্মা; নতুন পরিচয়ে হয়ে ওঠেন হিরা খাতুন মালা। তারপর ১০ অক্টোবর ঝিনাইদহ কোর্টে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন ও তিন লাখ টাকা কাবিনে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়।
ঘটনা জানতে পেরে অন্তির পরিবার স্তব্ধ হয়ে যায়। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়ে থানায় জিডি করে পরিবার। পুলিশ মেয়েকে পরিবারের জিম্মায় রাখে। অন্যদিকে স্বামী রাকিব হোসেন স্ত্রীকে ফিরে পেতে আদালতের দ্বারস্থ হন। অধিকতর শুনানির দিন আদালত জনাকীর্ণ। সবাই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষায় মালা কোন পথ বেছে নেবেন? ম্যাজিস্ট্রেট মালাকে যখন তাকে প্রশ্ন করেন, তুমি বাবার কাছে ফিরবে, নাকি স্বামীর কাছে? তখন এক মুহূর্ত নীরবতা। এরপর দৃঢ় কণ্ঠে মালা উচ্চারণ করেন, আমি স্বামীর বাড়িতে ফিরে যেতে চাই।
মুহূর্তেই আদালত কক্ষে শোকাবহ নীরবতা নেমে আসে। ম্যাজিস্ট্রেট রায় দেন স্বামীর পক্ষেই। আর সে রায় উচ্চারিত হতেই ভেঙে পড়েন অন্তির বাবা-মা। আদালত প্রাঙ্গণ যেন শোকে আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। জনতার ভিড়ের মধ্যেই পিতা দু’হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজস্ব ভাষায় ব্যথা আর বেদনার বিস্ফোরণ ঘটান, যেন আর্তনাদ ছাপিয়ে ওঠে অভিশাপে।
অন্যদিকে মালানহরিণাকুন্ডুর শ্রীপুর গ্রামের রাকিব হোসেনের সহধর্মিণী নির্বিকার দৃঢ়তায় নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। ধর্ম, প্রথা, সমাজের নিয়ম সবকিছু ছাপিয়ে ভালোবাসাকে বেছে নেন তরুণী।
কিন্তু যে বাবা-মা তাকে দশ মাস গর্ভে ধারণ করেছিলেন, শৈশব থেকে বড় করেছেন, সেই বাবা-মায়ের চোখে যেন মুহূর্তেই পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল। তাদের ফেলে যাওয়া ক্ষত, আর মেয়ের সিদ্ধান্ত কোনও সিনেমার মতো হলেও এটি নিখাদ বাস্তব।
আদালত সেখানে অসহায়। সাবালিকা মেয়ের সিদ্ধান্ত আইনের কাছে চূড়ান্ত। কিন্তু মানুষের হৃদয় নামক যে অদৃশ্য আদালত সেখানে রায় হয় অন্যরকম; সেখানে রক্তমাংসের সম্পর্কের কাছে প্রেমের জেদ, ধর্মের বদল, সবই নির্মম লাগে।
ঝিনাইদহ আদালত প্রাঙ্গণের সেই নির্দয় দুপুরে প্রেম জিতেছে, কিন্তু হেরে গেছে পিতামাতার স্বপ্ন।
আর সেই দৃশ্য এমনই যে, যে কোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।