22/01/2026
বিয়ে : পার্টনারশিপ (শারিকানা) নাকি পোশাক?
আমরা যখন বলি, বিয়ে হলো একটি শারিকানা (partnership), তখন এর অর্থ দাঁড়ায়—স্বামী-স্ত্রী সবকিছু সমানভাবে ভাগ করে নেবে। দায়িত্ব, খরচ, দায়বদ্ধতা, অধিকার ও কর্তব্য সবকিছু সমানভাবে তাদের উপর বর্তাবে। এই ধারণাটি মূলত পাশ্চাত্য বা ইসলাম বহির্ভূত চিন্তাধারার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘শরিক’ বা partner শব্দটির ব্যবহার বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে নারী-পুরুষ সমতার আন্দোলনের শুরুর দিকে। এটি মূলত পুঁজিবাদী দর্শন থেকে জন্ম নেওয়া একটি ধারণা, যা বস্তুবাদী জীবনে, বিশেষ করে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও ব্যক্তিগত মালিকানার ক্ষেত্রে বেশি প্রচলিত। পশ্চিমা সমাজে সামাজিক সম্পর্কগুলোও এই পুঁজিবাদী চিন্তা থেকে ‘পার্টনারশিপ’ শব্দটি ধার করেছে।
কিন্তু আমরা মুসলমানরা বিশ্বাস করি না যে বিয়ে একটি পার্টনারশিপ, কিংবা স্বামী-স্ত্রী একে অপরের শরিক। কারণ যদি আমরা ‘শরিক’ শব্দটি অর্থাৎ সবকিছুতে সম্পূর্ণ সমতার ধারণা মেনে নিই, তাহলে তার মানে দাঁড়ায়— পরিবারে দুজন নেতা থাকবে, দু’জনেরই সমান ক্ষমতা থাকবে। এমনকি তারা চাইলে পরিবার পরিচালনায় তৃতীয় কোনো পার্টনারও যুক্ত করতে পারবে।
যার অর্থ হল, দুজনই নিজেদের ইচ্ছামতো জীবন পরিচালনার মানদণ্ড বেছে নিতে পারবে। কারণ সিদ্ধান্তের মালিক তারাই। সংসার গড়ার সময় দুপক্ষই সমানভাবে শ্রম ও অর্থ দেবে, আর বিচ্ছেদ বা তালাকের ক্ষেত্রে সম্পদ, মালামাল এমনকি সন্তানের অভিভাবকত্বও সমানভাবে ভাগ হবে।
এই সব ধারণাই ইসলামী পদ্ধতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে এমন এক ন্যায়ভিত্তিক কাঠামোয় সাজিয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষের সামর্থ্য ও সক্ষমতাকে বিবেচনায় রাখা হয়।
দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে কুরআনের আয়াতগুলো গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখবেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে পোশাক (لباس), ভালোবাসা ( مودة), অনুগ্রহ (رحمة), প্রশান্ত আবাস ( سكن) ও ফসলের ক্ষেত ( حرث) এর মত ধারণা বা দৃষ্টান্তসমূহের ওপর।
এই শব্দগুলো ‘শরিকানা’র অর্থের সঙ্গে একেবারেই ভিন্নতা রাখে। কুরআন কখনো এই সম্পর্ককে ‘পার্টনারশিপ চুক্তি’ বলেনি। বরং একে বলেছে, “মিসাকান গলিজা ( ميثاقا غليظا)”। অর্থাৎ এক দৃঢ় ও গভীর অঙ্গীকার।
‘চুক্তি’ (contract) আর অঙ্গীকার ( মিসাক) এর মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। চুক্তি সহজেই ভেঙে ফেলা যায়, এর একটি শেষ সময় থাকে। কিন্তু ‘মিসাক’ শব্দটি অনেক গভীর। এর অর্থ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এক শক্ত ও মজবুত বন্ধন। এটি ভাঙা কঠিন, ত্যাগ করা কষ্টসাধ্য, এবং এর কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই। আর এই অঙ্গীকার সাধারণ নয়। কুরআন একে বলেছে গলিজা (দৃঢ় ও ভারী)। সুতরাং, বিষয়টি কোনোভাবেই শরিকানার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে আল্লাহ পোশাক হিসেবে বর্ণনা করেছেন, “তারা তোমাদের জন্য পোশাক, আর তোমরা তাদের জন্য পোশাক”। [সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭]
এটাই ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি, পার্টনারশিপ নয়।
পোশাক মানে হলো ঐক্য, পরিপূরকতা, সামঞ্জস্য, সৌন্দর্য, শোভা, আচ্ছাদন, সুরক্ষা, পবিত্রতা, সতীত্ব এবং স্বভাবজাত স্বাভাবিকতা। এই অর্থগুলো পার্টনারশিপ কখনোই পূরণ করতে পারে না।
পোশাকের ভিত্তি হলো নৈকট্য, সহযোগিতা ও একাত্মতা। আর শরিকানার ভিত্তি হলো স্বার্থ, লাভ-ক্ষতির হিসাব। দুটির মাঝে পার্থক্য আকাশ-পাতাল।
এভাবেই ক্বাওয়ামা (দায়িত্বপূর্ণ অভিভাবকত্ব) ও আনুগত্য সবই পোশাকের ধারণার অধীনেই আসে। ক্বাওয়ামা মানে রক্ষণাবেক্ষণ, সুরক্ষা, দায়িত্ব নেওয়া, প্রয়োজন পূরণ করা এবং কল্যানের সিদ্ধান্ত নেওয়া। আর আনুগত্য হবে মারুফ অর্থাৎ ন্যায়সঙ্গত ও কল্যাণকর বিষয়ের মধ্যে।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো ন্যায় ও জু*লুমবিহীনতা। তাদের সম্পর্কের মানদণ্ড নিজেদের খেয়ালখুশির চুক্তি নয়। বরং,আল্লাহ তাআলা কুরআনে যে বিধান দিয়েছেন এবং নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে আদর্শ রেখে গেছেন, সেটিই তাদের পথনির্দেশক।
দাম্পত্য জীবনের আসল ভিত্তি হলো বোঝাপড়া, ত্যাগ, সহযোগিতা ও সওয়াবের আশা। এখানে সম্পর্কের ভিত্তি এটা নয় যে, বিয়ের প্রথম দিন থেকেই কথোপকথন হবে– “এটা আমার অধিকার, ওটা তোমার অধিকার” বা “এটা আমার দায়িত্ব, ওটা তোমার দায়িত্ব।”
অধিকার ও কর্তব্যের আলোচনা আসে তখনই, যখন বিরোধ দেখা দেয়। সম্পর্কের শুরুটা সেগুলোর হিসাব দিয়ে হয় না। শুরুটা হয় বোঝাপড়া, ত্যাগ আর সহযোগিতা দিয়ে।
আজ আমাদের সমাজে বিয়ে নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে। কারণ আমরা পাশ্চাত্য ধারণা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছি এবং কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে সরে গেছি।
আমাদের সন্তানরাও সোশ্যাল মিডিয়া, নাটক ও চলচ্চিত্রে প্রচারিত এমন সব ধারণার প্রভাবে আটকে আছে, যেগুলোর নির্মাতা ও প্রযোজকদের আমাদের দীন ও সংস্কৃতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে তাদের সামনে বিয়ের ধারণা বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর হয়ে আছে।