15/02/2026
১৯৮৭ সাল। আমেরিকান এয়ারলাইন্স তখন নগদ অর্থের সংকটে ভুগছে। তারা একটি দুর্দান্ত অফার নিয়ে এল— ‘AAirpass’। দাম ২,৫০,০০০ ডলার। সুবিধা? ফার্স্ট ক্লাসে সারাজীবন বিশ্বজুড়ে আনলিমিটেড ভ্রমণ। সাথে আরও ১,৫০,০০০ ডলার দিলে পাওয়া যাবে ‘কম্প্যানিয়ন পাস’ বা সঙ্গী নেওয়ার সুবিধা। সব মিলিয়ে ৪,০০,০০০ ডলার।
শিকাগোর ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার স্টিভেন রথস্টেইন (Steven Rothstein) এই অফারটি লুফে নিলেন। তিনি তখন ৩৭ বছর বয়সী এক টগবগে যুবক। তিনি জানতেন, এই বিনিয়োগ তাকে রাজা বানিয়ে দেবে।
শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। রথস্টেইন আকাশকে নিজের ঘর বানিয়ে ফেললেন। তার রুটিন ছিল অদ্ভুত। সকালে শিকাগো থেকে লন্ডনে যেতেন শুধু লাঞ্চ করার জন্য। বিকেলে হয়তো প্যারিসে কফি খেয়ে রাতে বাড়ি ফিরতেন। কখনো কখনো তিনি বাফেলোতে যেতেন শুধু সেখানকার বিখ্যাত স্যান্ডউইচ খেতে।
জুলাই ২০০৪-এ তিনি এক মাসে ১৮ বার ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি কানাডা, লন্ডন, লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউ ইয়র্ক—সব চষে ফেলেছিলেন। তার ছেলে বা মেয়েকে নিয়ে তিনি উইকএন্ডে জাপানে যেতেন, যেন পাশের পাড়ায় যাচ্ছেন।
শুধু তাই নয়, তার ‘কম্প্যানিয়ন পাস’ ব্যবহার করে তিনি এয়ারপোর্টে দেখা হওয়া অচেনা মানুষদের ফ্রিতে ফার্স্ট ক্লাসে নিয়ে যেতেন। কোনো এক মা তার অসুস্থ সন্তানকে দেখতে যেতে পারছেন না? রথস্টেইন তাকে নিজের পাসে নিয়ে যেতেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন আকাশের ‘রবিনহুড’।
আমেরিকান এয়ারলাইন্স প্রথমে খুশিই ছিল। তাদের সিইও রথস্টেইনকে চিঠি দিয়ে ধন্যবাদও জানিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে এয়ারলাইন্সের টনক নড়ল। তারা হিসাব করে দেখল, রথস্টেইন একাই তাদের ২১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৭০ কোটি টাকা) ক্ষতি করেছেন। তিনি ট্যাক্স, ফি এবং মাইলেজ বাবদ এয়ারলাইন্সকে চুষে নিচ্ছেন।
এয়ারলাইন্স ঠিক করল, যেকোনো মূল্যে এই পাস বাতিল করতে হবে। তারা গঠন করল এক বিশেষ ‘রেভিনিউ ইন্টিগ্রিটি ইউনিট’। তাদের কাজ ছিল রথস্টেইনের ভুল ধরা। গোয়েন্দারা তার ফ্লাইট হিস্ট্রি চেক করতে শুরু করলেন।
তারা দেখলেন, রথস্টেইন প্রায়ই দুটি সিট বুক করেন। একটি নিজের জন্য, আরেকটি ‘ব্যাগ রথস্টেইন’ (Bag Rothstein) বা ‘স্টিভেন রথস্টেইন জুনিয়র’ নামে। পাশের সিটটি তিনি ফাঁকা রাখতেন আরাম করার জন্য বা মালপত্র রাখার জন্য। যদিও এয়ারলাইন্স কর্মীরাই তাকে এই ট্রিক শিখিয়েছিলেন, কিন্তু এখন এটাই তার বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে উঠল। তারা এটাকে ‘প্রতারণা’ বা ‘ফ্রড’ হিসেবে চিহ্নিত করল।
১৩ ডিসেম্বর, ২০০৮। শিকাগো ও’হেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। রথস্টেইন এবং তার এক বন্ধু চেক-ইন কাউন্টারে গেলেন। তারা বসনিয়া যাবেন। কাউন্টারের কর্মী রথস্টেইনের হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিলেন। চিঠিতে লেখা ছিল— "আপনার এয়ারপাস বাতিল করা হলো।"
রথস্টেইন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। তিনি বাড়ি ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়লেন এবং টানা কয়েকদিন বের হলেন না। তার মনে হলো তার ডানা কেটে ফেলা হয়েছে। তার আইডেন্টিটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
রথস্টেইন আদালতে মামলা করলেন। কিন্তু এয়ারলাইন্স তাদের বিশাল লিগ্যাল টিম দিয়ে প্রমাণ করল যে তিনি চুক্তির শর্ত ভেঙেছেন। রথস্টেইন হেরে গেলেন। তার ২১ বছরের সাম্রাজ্যের পতন হলো।
আজও আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে স্টিভেন রথস্টেইনের নাম একটি সতর্কবার্তা হিসেবে লেখা আছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ‘আনলিমিটেড’ অফার দেওয়ার আগে কোম্পানিদের দুবার ভাবা উচিত।
স্টিভেন রথস্টেইন এখন মাটিতেই থাকেন, কিন্তু তার স্মৃতিতে রয়ে গেছে সেই ১ কোটি মাইলের মেঘের রাজ্য, যেখানে তিনি ছিলেন অঘোষিত সম্রাট।
Source:
১. Los Angeles Times (মে ০৫, ২০১২) - "The frequent fliers who flew too much".
২. The Guardian (সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯) - "My father had a lifelong ticket to fly anywhere. Then they took it away".
Collected post ✉️