24/02/2026
শোক সংবাদ
আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় লেখক, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং উদীচীর সাবেক সভাপতি ড. সফিউদ্দিন আহমদ আজ আনুমানিক ভোর ৪টা ৪৫মিনিটের সময় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।
তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি ।
ড. সফিউদ্দিন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের মননশীল সাহিত্য ধারার একজন অত্যন্ত নিভৃতচারী কিন্তু শক্তিশালী গবেষক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর কাজের পরিধি মূলত আমাদের শেকড় (লোকসাহিত্য) থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্যের বিবর্তন পর্যন্ত বিস্তৃত।
ড. সফিউদ্দিন আহমেদ কর্মজীবনে দীর্ঘ সময় অধ্যাপনার সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন কৃতি ছাত্র ছিলেন এবং পরবর্তীতে উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল আকাশচুম্বী, বিশেষ করে সাহিত্যকে সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার দক্ষতা তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল।
তাঁর গবেষণার মূল ভিত্তি ছিল তিনটি প্রধান স্তম্ভ:
* রবীন্দ্র গবেষণা: রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ও উপন্যাসের ভেতরের দর্শন এবং গ্রামীণ সমাজের চিত্র তিনি নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
* লোকসাহিত্য: বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি, পালাগান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিফলন সাহিত্যে কীভাবে ঘটে, তা নিয়ে তাঁর মৌলিক কাজ রয়েছে।
* আধুনিক সাহিত্য সমালোচনা: বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ের প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের কাজ নিয়ে তিনি বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করেছেন।
তাঁর বেশ কিছু বই সাহিত্যিক মহলে আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়:
* রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প: সমাজ ও জীবন (রবীন্দ্র গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বই)।
* বাঙালির জাতিসত্তা ও অন্যান্য প্রবন্ধ।
* লোকঐতিহ্য ও সাহিত্য।
* সাহিত্যের রূপকার ও রূপকল্প।
ড. সফিউদ্দিন আহমেদের লেখার ভাষা অত্যন্ত স্বচ্ছ, নির্মেদ এবং যুক্তিনির্ভর। তিনি খুব বেশি অলঙ্কার ব্যবহার না করে তথ্যের সত্যতা ও গভীর বিশ্লেষণের দিকে মনোযোগ দেন। একজন 'চিন্তক' হিসেবে তিনি কেবল সাহিত্যের নান্দনিকতা নয়, বরং সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষের মুক্তি ও চেতনার জাগরণ নিয়ে ভাবতেন।
বর্তমানে যখন চটজলদি বা অগভীর সাহিত্য আলোচনার দাপট বেড়েছে, তখন ড. সফিউদ্দিন আহমেদের মতো গবেষকেরা আমাদের ধ্রুপদী সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে একটি টেক্সটকে ব্যবচ্ছেদ করে তার ভেতর থেকে ইতিহাস ও সমাজকে খুঁজে বের করতে হয়।