06/06/2026
ধন্যবাদ ড. শফিকুল ইসলাম স্যার, উপসচিব, কেবিনেট ডিভিশন
পে-স্কেল বিষয়ে সিপিডির সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ড. শফিকুল ইসলাম স্যারের বক্তব্যের মূল বিষয়গুলো হুবহু তুলে ধরা হলো, যা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা ও ন্যায্য দাবির প্রতিফলন।
১. ১১ বছর নতুন পে-স্কেল না থাকায় ক্রয়ক্ষমতার ভয়াবহ অবনতি
২০১৫ সালের পর দীর্ঘ ১১ বছর কোনো নতুন পে-স্কেল কার্যকর না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এই সময়ে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অথচ বেতন কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় অনেক কর্মচারী পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
২. বেতন স্থির থাকলেও মূল্যস্ফীতি থেমে থাকেনি
২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এক দশক সরকারি কর্মচারীদের বেতন প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও বাজারে মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০.০৩ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে তা ৮.৫৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে এটি স্পষ্ট যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি না করেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির জন্য সরকারি বেতন বৃদ্ধি একমাত্র কারণ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণ।
৩. অযৌক্তিক মেডিকেল ও টিফিন ভাতা
বর্তমান সময়ে চিকিৎসা ব্যয় যেখানে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে, সেখানে মাসিক মাত্র ১৫০০ টাকা মেডিকেল ভাতা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একইভাবে দৈনিক মাত্র ৬ টাকা টিফিন ভাতা বর্তমান বাজারদরে কার্যত অকার্যকর। এসব ভাতা পুনর্মূল্যায়ন করে বাস্তবসম্মত পর্যায়ে উন্নীত করা সময়ের দাবি এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
৪. আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখায়
বিশ্বের অনেক দেশ নির্দিষ্ট সময় পরপর নতুন পে-স্কেল কার্যকর করে এবং কর্মচারীদের বেতন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সমন্বয় করে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক দফায় বেতন তিন গুণ বা তারও বেশি বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাই একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির অজুহাতে বছরের পর বছর সরকারি কর্মচারীদের বঞ্চিত রাখা কোনো টেকসই বা সুস্থ অর্থনৈতিক মডেল হতে পারে না।
৫. সিপিডির বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার অসঙ্গতি
যদি "সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে"—এই তত্ত্ব সর্বজনীন সত্য হয়ে থাকে, তাহলে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে সিপিডি নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ কোটি ৯ লাখ টাকায় উন্নীত করলো কেন? একই তত্ত্ব তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেনি কেন—এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।
৬. সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেতনে চরম বৈষম্য
বর্তমানে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং বেসরকারি খাতের কর্মকর্তাদের গড় মাসিক বেতন ৮৬ হাজার টাকারও বেশি, যা অনেক ক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ গ্রেড-১ বা সচিব পর্যায়ের মূল বেতনের চেয়েও বেশি। সেখানে মাঠপর্যায়ের একজন সরকারি কর্মচারীকে ১০-১২ হাজার টাকায় সংসার চালাতে বাধ্য করা স্পষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের উদাহরণ।
৭. মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন সরকারি কর্মচারীদের অধিকার
সরকারি চাকরিজীবীরা এই দেশের নাগরিক, করদাতা এবং রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান শক্তি। তাই তাদের জীবনযাত্রার মান দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বেসরকারি খাতের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। বেতন কাঠামোর যৌক্তিক সমন্বয় কোনো বিলাসিতা নয়; এটি তাদের ন্যায্য ও মৌলিক অধিকার।
৮. দীর্ঘদিন বেতন স্থবির থাকলে দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ে
যখন একজন সরকারি কর্মচারী দীর্ঘ সময় ধরে ন্যায্য বেতন বৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত হন, তখন তা তার মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে এবং সততা বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্যই বড় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সৎ কর্মকর্তাদের সৎ থাকার উপযুক্ত পরিবেশ, মর্যাদা এবং বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দুর্নীতির অর্থনৈতিক ক্ষতি মূল্যস্ফীতির ক্ষতির চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
৯. মূল্যস্ফীতির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে হবে
মূল্যস্ফীতির প্রকৃত কারণ হলো দুর্বল বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, উৎপাদন ও আমদানির ঘাটতি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কার্যকর মুদ্রানীতির অভাব। এই মূল সমস্যাগুলো সমাধান না করে শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন আটকে রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এটি একটি অকার্যকর ও খোঁড়া যুক্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উপসংহার
দীর্ঘ ১১ বছর পর ৯ম পে-স্কেলের দাবি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি মূল্যস্ফীতির কারণে হারিয়ে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের দাবি। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য জীবনযাপন নিশ্চিত করা হলে তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত কল্যাণই নয়, প্রশাসনিক দক্ষতা, সেবা প্রদান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ে_স্কেল #পে_স্কেল #সরকারি_কর্মচারী #মূল্যস্ফীতি #অর্থনীতি #বাংলাদেশ #বাস্তবতা