19/08/2026
“নিরাপদ ঘরেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ: আবু হানিফের জীবন বদলের গল্প”
মোঃ আবু হানিফ (৩৬), ইনডেক্স নাম্বারঃ ২০৭৬৯; বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার হোগলাবুনিয়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের সানকিভাঙ্গা গ্রামের সানকিভাঙ্গা পশ্চিমপাড়া জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন দলের একজন সদস্য।
Green Climate Fund (GCF) এর অর্থায়নে এবং Palli Karma-Sahayak Foundation (PKSF) কর্তৃক কারিগরী সহায়তার মাধ্যমে বাস্তবায়িত “Resilient Homestead and Livelihood Support to the Vulnerable Coastal People of Bangladesh (RHL)” প্রকল্পের আওতায় রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশন (RRF) -এর বাস্তবায়নে দুর্যোগ সহনশীল বসতবাড়ি পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে নতুন করে সংসারটা গোছেতে শুরু করেছে।
আবু হানিফের জীবনটা অন্যদের মত এতটা সহজ-স্বাভাবিক ছিল না। ছোট বেলায় থেকেই তার বাবা অসুস্থ থাকায় পরিবারের হাল ধরতে হয়েছিল তাকে। অভাবের সংসারে স্কুলে যেতে পারেনি তেমন একটা। কোন রকমে নিজের নামটা লিখতে পারে। প্রথম দিকে ভ্যান চালিয়ে, দিন মজুরি করে অসুস্থ বাবা, মা, দুই বোন ও ছোট ভাইকে নিয়ে কোনরকমে টেনে টুনে সংসার চালাতেন। অভাবের সংসারে দুই বোনের বিয়ে দিতে হিমশিম খেতে হয়েছিল তাকে। তারপর কিছুদিনের মধ্যে বাবা মারা যায় আবু হানিফের। এরপর নিজের সংসার হয়। ছোট ভাই তার মাকে নিয়ে আলাদা সংসার পাতে। তারপর বেশ কয়েক বছর কেটে যায়। হানিফের টানা পোড়েন এর সংসারে এই কয়েক বছরে দুই থেকে ৫ সদস্যের হয়ে যায়। তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে জীবন যুদ্ধে দিন পার করতে থাকে। এর মধ্যে পেশা পাল্টিয়ে মাছ ধরার পেশা বেছে নেয় আবু হানিফ। মাঝে মাঝেই গভীর সমুদ্রে এলাকার জেলেদের সাথে দল বেঁধে কয়েকদিনের জন্য মাছ ধরতে যেতে হয় তাকে। ঝড়-বৃষ্টির সময় সমুদ্রে গেলে মনটা পড়ে থাকত বাড়িতে। বুকের মধ্যে আনচান করে উঠত আর মনে হত এইবারই বুঝি মাথার উপর চালটা ঝড়ে উড়ে যায়। অথচ ৫ জনের সংসারের চাহিদা মিটিয়ে একটি নিরাপদ ঘর নির্মাণ করার মতো সামর্থ্য হয়ে ওঠেনি কখনও তার। প্রতিবার বর্ষা এলেই শুরু হতো তার দুঃস্বপ্ন। নড়বড়ে খুঁটি আর ছিদ্রযুক্ত টিনের ছাউনি বেঁয়ে চুঁইয়ে পড়ত পানি। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যেত উঠান, আর ঝড়ের সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোথাও নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার উপায় ছিল না। বড় কোন ঝড়ে প্রতি বছরই ঘর মেরামত করতে তার অল্প আয়ের বড় একটা অংশ খরচ হয়ে যেত। ফলে অর্থনৈতিক টানা পোড়েন লেগেই থাকত সারা বছর জুড়ে।
সানকিভাঙ্গা গ্রামের আরএইচএল প্রকল্পের সানকিভাঙ্গা পশ্চিমপাড়া জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন দল (CCAG) -এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের চিহ্নিত করে। এই প্রক্রিয়ায় আবু হানিফের নাম উঠে আসে। ঘরবাড়ির অভাব, সংসারের টানা পোড়েন তাকে করে তোলে একেবারে অগ্রাধিকার প্রাপ্তদের একজন। দলের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয় আবু হানিফের জলবায়ু সহনশীল একটি ঘর দেওয়া হবে। সকল যাচাই-বাছাই ও সকল প্রক্রিয়া শেষে শুরু হয় ঘর নির্মাণের কাজ। পাকা মেঝে, মজবুত দেয়াল, উঁচু ভীত—সব মিলিয়ে একটি নিরাপদ বাসস্থান তৈরি হয়। শুধু ঘর নয়, তার উঠান উঁচু করে দেওয়া হয়, যাতে জলাবদ্ধতা না হয়। দেওয়া হয় ৩০০০ লিটারের বিশুদ্ধ পানির ট্যাংক, বন্ধু চুলা এবং ১০০ ওয়াটের সৌর বিদ্যুৎ সুবিধা, যাতে রাতে আলো জ্বলে, মোবাইল চার্জ হয়, ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে।
ঘর পাওয়ার পর আবু হানিফ বলেন, ‘আগে বৃষ্টি বা ঝড় শুরু হলেই বুকের ভিতর ভয় কাজ করত। মনে হতো, কখন যেন ঘরের চাল উড়ে যায়। বৃষ্টির পানি ঘরের ভেতর ঢুকে সবকিছু ভিজিয়ে দিত। সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে রাত কাটাতে হতো। এখন আর সেই ভয় নেই। নতুন ঘরটি অনেক মজবুত ও নিরাপদ। উঠান উঁচু হওয়ায় জোয়ার বা অতিবৃষ্টির পানিও ঘরে ঢোকে না। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ট্যাংক থাকায় বিশুদ্ধ পানির চিন্তা করতে হয় না। সৌর বিদ্যুৎ থাকায় রাতে ঘরে আলো জ্বলে, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারে। এই ঘরটি শুধু আমার থাকার জায়গা নয়, এটি আমার পরিবারের নিরাপত্তা ও নতুন করে বাঁচার সাহস দিয়েছে।
আবু হানিফের স্ত্রীও জানান, আগে সামান্য বৃষ্টি হলেই তাদের দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে যেত। ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ত, সন্তানদের নিয়ে কোথায় নিরাপদে থাকবেন—সেই চিন্তায় রাত কাটত। এখন সেই ভয় অনেকটাই কেটে গেছে। নতুন ঘরের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও সৌর বিদ্যুতের সুবিধা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।
নতুন ঘর পাওয়ার পর আবু হানিফের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তার মানসিকতায়। আগে নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ ঘর মেরামত করতে ব্যয় করতে হতো। এখন সেই অর্থ পরিবারের খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা এবং জীবিকার পিছনে ব্যয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। মাছ ধরার পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যতে ছোট পরিসরে অন্য কোনো আয়ের কাজ করার পরিকল্পনাও করছেন।
আবু হানিফ বলেন, ‘আগে মনে হতো, সারাজীবন শুধু ঘর মেরামত আর সংসারের খরচ চালিয়েই জীবন পার করে দিতে হবে। এখন মনে হচ্ছে, আমরাও একটু একটু করে সামনে এগোতে পারব। আমার সন্তানদের জন্য ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখতে পারছি। এই ঘর আমাদের শুধু ঝড়-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করবে না, আমাদের ভবিষ্যৎটাকেও নিরাপদ করবে।