17/07/2024
আজ পবিত্র আশুরা
রায়হান আজাদ
আজ পবিত্র ঐতিহাসিক আশুরা। ইসলামে ঘটনাবহুল এবং বরকত ও ফজিলতময় যে কয়টি দিবস রয়েছে তন্মধ্যে আশুরা অন্যতম। আশুরা শব্দটি আরবী ‘আশরুন’ থেকে এসেছে। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় হিজরী সনের প্রথম মাস মুহররমের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে নানাভাবে অবিস্মরণীয় ও মহিমান্বিত এ দিবস সবদিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলমানদের মতো পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্মানুসারীদের কাছেও এ দিবসের গুরুত্ব স্বীকৃত।
পবিত্র আশুরার দিনে মহান আল্লাহ তা‘আলা সাগর, পাহাড়, প্রাণীক‚ল,আসমান-জমিন ও লওহ-কলম সৃষ্টি করেছেন। আবার এদিনেই আরশে আজীমে সমাসীন হয়েছেন। তামাম মাখলুকাত ধ্বংসও হবে কোন এক জুমাবারে মুহররমের দশ তারিখে এই আশুরার দিনে। আল্লাহ পরওয়ারদেগার এ দিনে আদি পিতা হযরত আদম (আ:) কে তার খলিফা নিযুক্ত করেছেন আর জান্নাতে দাখিল ও পৃথিবীতে নির্বাসনের পর মক্কায়ে মুয়াজ্জামার আরাফাত ময়দানে হযরত মা হাওয়ার সাথে পরিচিত করত: দীর্ঘ দিন ক্ষমা প্রার্থনা শেষে দু‘ জনের তাওবা কবুল করেন। পৃথিবীর প্রথম হত্যাকাÐ হাবিল কাবিলের ঘটনাও আশুরার দিনে সংগঠিত হয়। হযরত নূহ (আ:) সদলবলে মহা প্লাবন শেষে জুদী পাহাড়ে অবতরণ করে পৃথিবীকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুলেন এ দিনে। হযরত ইব্রাহীম (আ:) ক্ষমতাশালী মূর্তিপূজারী নমরুদের অগ্নিকাÐ থেকে উদ্ধার, হযরত আইয়ুব (আ:) কুষ্ঠরোগ থেকে মুক্তি, হযরত ইউনুস (আ:) মাছের পেট থেকে পরিত্রাণ এবং ফেরাউনের স্ত্রী হযরত আছিয়া (আ:) শিশুপুত্র মুসা (আ:)কে এ দিনেই গ্রহণ করেন। এ দিনেই হযরত দাউদ (আ:) এর গুনাহ মাফ হয়, কুমারী মাতা বিবি মরিয়ম (আ:) এর গর্ভ হতে হযরত ঈসা (আ:)‘র পৃথিবীতে আগমন ঘটে। এ দিনেই রহমত স্বরূপ আসমান হতে প্রথম বৃষ্টি বর্ষিত হয়। পবিত্র আশুরার দিনেই হযরত সোলাইমান (আ:) তার হাতের আংটি হারিয়ে সাময়িকভাবে রাজ্যহারা হলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে আবার রাজ্য ফিরিয়ে দেন। হযরত ইউসূফ (আ:) তার পিতা ইয়াকুব (আ:) এর সাথে সুদীর্ঘ ৪০ বৎসর পর এ দিনে সাক্ষাৎ লাভ করেন। এই দিনেই হযরত মুসা (আ:) তুর পর্বতে আল্লাহ তা‘আলার সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন এবং তাওরাত কিতাব লাভ করেছিলেন। হযরত মুসা (আ:) তৎকালীন মিশরের বাদশাহ ফেরাউনের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লে এ দিনে তিনি বনী ইসরাঈলকে সাথে নিয়ে নীল নদ পার হয়ে যান আর নদীর মাঝ পথে পানি চাপা পড়ে ফেরাঊনের সলিল সমাধি ঘটে। হযরত ঈসা (আ:) কে আল্লাহ তা‘আলা নিজ অনুগ্রহে এ দিনে আসমানে তুলে নেন। হযরত মুসা ও ঈসা (আ:) এর স্মৃতি বিজড়িত এ দিন ইহুদি-খৃষ্টানদের মাঝেও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের কাছে ১০ মুহররম ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে মহানবীর প্রাণপ্রিয় কন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা (রা:) ও ৪র্থ খলীফা হযরত আলী (রা:) এর পুত্র ইমাম হোসাইন (রা:) সিরিয়ার কুখ্যাত বাদশাহ ইয়াজিদের অসভ্য সেনা বাহিনীর হাতে স্বপরিবারে শাহাদাত বরণ করলে এদিন ঐতিহাসিক কারবালা দিবস হিসেবেও শোকাবহ ধর্মীয় গাম্ভীর্য সহকারে উদযাপিত হয়ে আসছে।
আরবী ‘মুহররম’শব্দের অর্থ নিষিদ্ধ বা পবিত্র। এই মাসে কোন প্রকার ঝগড়া-বিবাদ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ করা শরীয়তে নাজায়েয বা নিষিদ্ধ। যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজগুলো হতে মাসটি পাক-পবিত্র বলে একে মাহে মুহররম তথা ‘পবিত্র মাস’ বলা হয়। রাসুলে আকরাম (সা:) এ মাসে কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ যাত্রায় বের হননি। ইসলাম পূর্ব যুগেও এ মাসে সর্বত্র শান্তি বিরাজ করত। মুহররম, রজব, যিলক্বদ ও যিলহজ্ব- এ চারটি মাসকে আল্লাহ তা‘আলা পরম সম্মানিত ও পবিত্র বলে আল কোরআনে ঘোষণা দিয়েছেন। বর্ণিত হয়েছে “ এর মধ্য থেকে চারটি (মাস) সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন জুলম করো না” (সূরা আত-তাওবাহ:৩৬)। তাই স্বাভাবিকভাবে বুঝা যায়, এসব মাসে নেক আমল করলে সাওয়াবও বেশী হয়।
আমাদের পেয়ারা নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) হিযরতের পর মদিনায় এসে দেখতে পেলেন যে ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে । তারা ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্যের সাথে এদিন পালন করছে । মহানবী (সা:) জানতে পারলেন, তারা হযরত মুসা (আ:) এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য এ দিনকে বেছে নিয়েছে । হুজুরে পাক (সা:) উপলদ্ধি করলেন, হযরত মুসা (আ:) এর সাথে আমাদেরও ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে । তাই তিনি ঐ দিনই রোজা রাখলেন এবং সাহাবীদেরও রোজা রাখতে উপদেশ করলেন। তবে ১০ মুহররমের আগে পরে আরেকটি রোজা বাড়িয়ে দুটি রোজা রাখতে বললেন। ২য় হিজরীতে রমজান মাসের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা নফল হয়ে যায়। তবে রমজানের রোজার পর আশুরার রোজার মর্যাদা এখনও সর্বাধিক। আশুরার রোজা সম্পর্কে হযরত সালমা বিনতে আকওয়া (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আসলাম গোত্রের এক লোককে মহানবী (সা:) এ সংবাদ ঘোষণার দায়িত্ব দিয়ে আশুরার দিন প্রেরণ করলেন যে ‘ যারা আজ রোজা রাখেনি তারা যেন রোজা রেখে নেয়। আর যারা ইতিমধ্যে খাওয়া-দাওয়া করেছে তারা যেন সন্ধ্যা পর্যন্ত খাবার ও পানাহার হতে বিরত থাকে”। (সহীহ মুসলিম)
আশুরার রোজাকে ইহুদিদের রোজা হতে পৃথক করার জন্য নবীজী বলেছেন “তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখ এবং ইহুদিদের থেকে ব্যতিক্রম কর । আশুরার একদিন পূর্বে ও একদিন পরেও রোজা রাখ”। তিনি আশা প্রকাশ করেন, “ আমি আগামী বছর বেঁচে থাকলে নবম দিনেও রোজা রাখব (সহীহ মুসলিম )।
আশুরার দিন রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে মহানবী (সা:) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট আশাবাদী যে তিনি একবছর পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন’। (মুসনাদে আহমদ)
আশুরার দিন দান-খয়রাত বড়ই সাওয়াবের কাজ। হুজুর (সা:) বলেছেন, “যদি কেউ এ দিন অসহায় এতিমের মাথায় হাত বুলায়, ক্ষুধার্তকে আহার দান করে তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতের খাদ্য খাওয়াবেন এবং পবিত্র পানীয় পান করাবেন”। শোহাদায়ে কারবালার মাগফিরাত ও বুলন্দ দরজা কামনায়ও এসব নেক আমল করা যায়।
আসুন, শোহাদায়ে কারবালার উন্নত মর্যাদা ও পরিবার-পরিজনের মাগফিরাত কামনায় আমরা প্রতি বছর মুহররমের ৯/১০ ও ১১ তারিখ দুটি রোজা রাখি এবং বেশী বেশী নফল ইবাদত করি। শোহাদায়ে কারবালার মহান আদর্শকে ধারন করে যাবতীয় সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মিথ্যাকে রুখে দাড়াই। হযরত ইমাম হোসাইন (রা:) এর দৃঢ় প্রত্যয় ও অতুলনীয় আত্মত্যাগের দীক্ষা প্রতি আশুরায় আমাদেরকে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যে কোন আত্মত্যাগের প্রেরণায় উজ্জীবিত করলে আশুরা উদযাপন সার্থক হবে। এ কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
“ ফিরে এলো আজ মুহররম মাহিনা
ত্যাগ চাই, মসিয়া ক্রন্দন চাহি না। ” #